১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আমেরিকান স্বপ্ন ভঙ্গ, নতুন পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরছেন হ্যারি-মেগান

মার্কিন বিনোদনজগতে নিজেদের জায়গা স্থায়ী করতে না পেরে ফিরছেন তারা।

আমেরিকান স্বপ্ন ভঙ্গ, নতুন পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরছেন হ্যারি-মেগান
লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল সার্ভিস অফ থ্যাঙ্কসগিভিং’শেষে বেরিয়ে আসছেন ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 01:25 AM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

ব্রিটিশ রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে ২০২০ সালে যখন ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমান প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল, তখন তাদের সঙ্গে ছিল রাজকীয় আভিজাত্য। তবে পাঁচ বছরের মাথায় এসে সেই চকচকে ‘আমেরিকান ড্রিম’ এর ইতি টেনে ফের চেনা ভিটাতেই ফিরছেন ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স।

মার্কিন বিনোদনজগতে নিজেদের জায়গা স্থায়ী করতে না পারা এবং বড় বড় বাণিজ্যিক চুক্তিতে একের পর এক ধাক্কা খাওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুন পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরছেন এই রাজদম্পতি।

হলিউডের সূচনা ও প্রাথমিক উন্মাদনা

আর্থিক স্বাধীনতা, নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার খোঁজে লস অ্যাঞ্জেলেস শহর থেকে সামান্য দূরের অভিজাত এলাকা মোন্টেসিটোতে থিতু হন তারা। সেখানে ওপ্রাহ উইনফ্রি, গুইনেথ প্যালট্রো এবং রব লো-র মতো বিখ্যাত তারকারা ছিলেন তাদের প্রতিবেশী। মোন্টেসিটোতে আসার পরপরই পডকাস্ট ও নেটফ্লিক্সের সঙ্গে তাদের কোটি কোটি ডলারের চুক্তি সই হতে থাকে।

২০২১ সালে ওপ্রাহর সঙ্গে বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে মেগান নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই স্বাধীনতাকে ‘মুক্তিকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। হ্যারি পরে জানান, আমেরিকা তার পরিবারকে এমন এক স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা দিয়েছিল যা যুক্তরাজ্যে পাওয়া অসম্ভব ছিল এবং এটিই ছিল সেই জীবন, যা তার মা রাজকুমারী ডায়ানা তার জন্য চেয়েছিলেন।

মার্কেটিং ও জনসংযোগ সংস্থা ‘হলিউড ব্র্যান্ডেড’-এর প্রধান নির্বাহী স্টেসি জোন্স বলেন, "তখন তাদের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। সংবাদ শিরোনাম হওয়া কিংবা মুহূর্তেই সবার নজর কাড়ার জন্য তাদের নামই ছিল যথেষ্ট।"

হ্যারির রাজকীয় গল্প ও বাণিজ্যিক সাফল্য

মার্কিন মুলুকে হ্যারি সাফল্য পেয়েছেন মূলত নিজের রাজকীয় অভিজ্ঞতা ও মা ডায়ানার স্মৃতিকথাকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়ে। ২ কোটি ডলার অগ্রিমে লেখা হ্যারির আত্মজীবনী 'স্পেয়ার' বিশ্বজুড়ে ৬০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়ে যুক্তরাজ্যে দ্রুততম বিক্রি হওয়া নন-ফিকশন বইয়ের ইতিহাস গড়ে। 

এটি প্রচারের অংশ হিসেবে ট্রমা বিশেষজ্ঞ ড. গ্যাবর মতে-র সঙ্গে জনসমক্ষে আলোচনায় নিজের রাজকীয় শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরেন হ্যারি। সেখানে গ্যাবর মতে হ্যারিকে একজন "অত্যন্ত আন্তরিক ও সংবেদনশীল মানুষ" হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি নিজের শৈশবের ট্রমা সন্তানদের মধ্যে যেন ছড়িয়ে না পড়ে, আপ্রাণ সেই চেষ্টা করছেন।

সিডনি সফরে ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান। ফাইল ছবি: রয়টার্স 

সিডনি সফরে ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান। ফাইল

এছাড়াও হ্যারি সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠান 'বেটারআপ'-এর চিফ ইমপ্যাক্ট অফিসার হন এবং ওপ্রাহর সঙ্গে অ্যাপল টিভি প্লাসের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সিরিজ 'দ্য মি ইউ কান্ট সি' প্রযোজনা করেন। 

২০২২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবসে মূল ভাষণও দেন তিনি। তবে রাজকীয় ভাবমূর্তির বাইরে হ্যারি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরিতে কিছুটা হিমশিম খেয়েছেন।

চুক্তির পতন ও মেগানের প্রজেক্ট

শুরুর দিকে স্পোটিফাইয়ের সঙ্গে আড়াই কোটি ডলার এবং নেটফ্লিক্সের সঙ্গে ৬ থেকে ১০ কোটি ডলারের বিশাল চুক্তি সই করে হ্যারি-মেগানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আর্কিওয়েল’। কিন্তু এগুলোর বাণিজ্যিক সফলতা ছিল ক্ষণস্থায়ী। 

স্পোটিফাই প্ল্যাটফর্মে সেরেনা উইলিয়ামস ও মারাইয়া ক্যারির মতো তারকাদের নিয়ে মেগানের ১২ পর্বের পডকাস্ট 'আর্কিটাইপস' প্রচারের পর ২০২৩ সালে উভয় পক্ষ সমঝোতার মাধ্যমে আলাদা হয়ে যায়।

নেটফ্লিক্সের সঙ্গে হওয়া ১০ কোটি ডলারের চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হলে তা একটি সাধারণ ‘ফার্স্ট-লুক’ চুক্তিতে রূপ নেয়, যার অর্থ তাদের নতুন কোনো প্রজেক্ট থাকলে তা মূল্যায়নের প্রথম সুযোগ পাবে নেটফ্লিক্স। 

সান্টা ইনেজ পর্বতের নয়নাভিরাম পটভূমিতে তাজা স্ট্রবেরি তোলা আর খামারের পোষা মুরগির দৃশ্য সম্বলিত মেগানের লাইফস্টাইল ও রান্নার শো 'উইথ লাভ, মেগান' এমি মনোনয়ন পেলেও দুই সিজনের পরই বাতিল হয়ে যায়। এমনকি মেগানের নিজস্ব লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘অ্যাজ এভার’-এর থেকেও চলতি বছরের শুরুতে নিজেদের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করে নেয় নেটফ্লিক্স।

ব্যবসায়িক ব্যর্থতার পাশাপাশি তাদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আর্কিওয়েল’-এ কর্মীদের উচ্চ হারে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও তাদের ভাবমূর্তিতে আঘাত হানে। সাবেক কয়েকজন কর্মী নিজেদের রসিকতা করে ‘সাসেক্স সারভাইভারস ক্লাব’ বলে অভিহিত করতে শুরু করেন। হ্যারি-মেগানের ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে যুক্তরাজ্যে ফেরার খবরকে কটাক্ষ করে প্রভাবশালী মার্কিন ট্যাবলয়েড নিউ ইয়র্ক পোস্ট শিরোনাম করে, ‘সিংহাসনে প্রত্যাবর্তন, আমেরিকার দীর্ঘ জাতীয় দুঃস্বপ্নের অবসান’।

বিশেষজ্ঞদের চোখে ‘ব্র্যান্ড সংকট’

ব্র্যান্ড ও মার্কেটিং বিশ্লেষকদের মতে, বারবার অবস্থান পরিবর্তনই তাদের ব্যবসায়িক ভাবমূর্তির মূল ক্ষতি করেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিংয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু স্টিফেন বলেন, "শুরুর দিকে তারা বিপুল মনোযোগ আকর্ষণ করে তা থেকে আয় করতে পারলেও একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্র্যান্ড তৈরিতে সফল হননি। সমাজসেবা, বিনোদন ও লাইফস্টাইলের মধ্যে কাজ ছড়িয়ে পড়ায় ব্র্যান্ডের মূল লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে গেছে।"

অন্যদিকে ব্র্যান্ড বিশেষজ্ঞ সুসান ফোর্নিয়ার মনে করেন, রাজপরিবারের সদস্য থেকে রাজপরিবারের সমালোচক, এরপর কন্টেন্ট প্রস্তুতকারক এবং সবশেষে লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার এই ঘনঘন পরিবর্তন সাধারণ দর্শকের আস্থা কমিয়েছে। রাজপরিবারের বিষয়ক পডকাস্টার কিনসি স্কোফিল্ড কটাক্ষ করে বলেন, "মেগান মূলত রাজকীয় ভাবমূর্তি ভাঙিয়ে চা আর জ্যাম বিক্রি করছিলেন।"

যুক্তরাজ্যে নতুন শুরুর পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যে ফিরলেও হ্যারি-মেগান যে রাজপরিবারের কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করবেন না, তা নিশ্চিত। তবে বিনোদন ও ব্যবসা থেকে একেবারেই পিছিয়ে যাচ্ছেন না তারা।

বিবিসি জানতে পেরেছে, পরিচালক গাই রিচির নতুন নেটফ্লিক্স কমেডি সিরিজ 'দ্য জেন্টলমেন'-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য মেগানের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিয়ের পর অভিনয়ে এটিই হবে মেগানের প্রথম বড় ফেরা।

পাশাপাশি, ইংল্যান্ডের অভিজাত 'কটসওল্ডস' অঞ্চলে থিতু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সেখানে ব্রিটিশ গ্রামীণ আবহে হাতে তোলা ব্ল্যাকবেরি দিয়ে জ্যাম বানানোর মতো নানা বৈচিত্র্য এনে মেগান তার লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘অ্যাজ এভার’-কে বিশ্ববাজারে নতুন রূপ দিতে পারেন বলে মনে করছেন ফ্যাশন ডিরেক্টর লরা স্টোলফ।

তবে অধ্যাপক অ্যান্ড্রু স্টিফেনের মতে, "যুক্তরাজ্যে ফেরা তাদের ব্র্যান্ড পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু শুধু ঠিকানা বদলালেই ব্র্যান্ডের অবস্থান পাল্টায় না; পাল্টাতে হয় নিজেদের কাজ ও আচরণ দিয়ে।