১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মার্কিন সেনাদের মোবাইল ভিডিও নিয়ে সতর্কবার্তা, ফোন জমা নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও অনলাইনে শেয়ার হলে ইরান সুবিধা পেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার।

মার্কিন সেনাদের মোবাইল ভিডিও নিয়ে সতর্কবার্তা, ফোন জমা নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার| ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2026, 09:50 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের সতর্ক করে দিয়েছেন ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।

তিনি বলেছেন, সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও অনলাইনে শেয়ার হলে তা ইরানের জন্য আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে হামলার নিশানা করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

এ কারণে ওই অঞ্চলে মোতায়েন কিছু মার্কিন সেনার কাছ থেকে শিগগির মোবাইল ফোন জমা নেওয়া বা জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মোবাইল ফোনে যোগাযোগের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে, তা পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন হাজারো মার্কিন সেনার জন্য সংঘাতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। কারণ, সেনাদের অনেকেই এখনও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং নিজেদের নিরাপদ থাকার খবর জানানোর জন্য নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার মঙ্গলবার একটি চিঠিতে বলেছেন, ইরান সংবাদ প্রতিবেদন ও সাংবাদিকদের অনলাইন পোস্টের মাধ্যমে মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ছবি, ভিডিও ও প্রতিক্রিয়া দেখে তাদের হামলার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা টের পেয়ে যাচ্ছে।

রয়টার্সের হাতে আসা এই চিঠিতে কুপার লেখেন, “এ ধরনের উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সরাসরি ও অনিবার্য মূল্য মার্কিন সেনাসদস্য এবং লক্ষ্যবস্তু হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির মাধ্যমে দিতে হতে পারে।”

তিনি মার্কিন সেনাদের “আভিযানিক নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার” আহ্বান জানিয়েছেন। তবে চিঠিতে নির্দিষ্ট কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেননি ‍কুপার।

কুপারের এই সতর্কবার্তা এমন সময়ে এসেছে, যখন যুদ্ধের খবর, স্যাটেলাইট ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আর মার্কিন সামরিক বাহিনী এমন তথ্য প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, যাতে ইরান মার্কিন সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে না পারে।

পশ্চিম এশিয়ায় বার বার ইরানের হামলার নিশানা হওয়া জর্ডানে অবস্থান করা কিছু মার্কিন সেনাকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের ফোন জমা দিতে বলা হবে বলে  জানানো হয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সূত্র একথা জানিয়েছে।

তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযান পরিচালনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে গোটা অঞ্চলে ফোন জমা নেওয়া বা জব্দ করার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয় বলেও ওই সূত্র উল্লেখ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, এই বার্তা মূলত সেনা সদস্যদের অভিযান পরিচালনার নিরাপত্তা বজায় রাখার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে।

চলতি মাসে অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ১৭ জুলাই জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার সময় মার্কিন এক সেনা ভিডিও ধারণ করছেন এবং সেনারা আশ্রয়ের দিকে দৌড়ে যাচ্ছেন।

কুপার তার চিঠিতে ওই ভিডিওর কথাই উল্লেখ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল একটি মেটা স্মার্ট গ্লাসে, যাতে ক্যামেরা সংযুক্ত ছিল।

তিনি লিখেছেন, এক সেনার মেটা গ্লাসে ধারণ করা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেটিতে দেখা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় সেনা কোথায় এবং কীভাবে একটি বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

কুপারের মতে, মার্কিন বাহিনীর ইলেকট্রনিক জ্যামিংসহ যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন কৌশলের কারণে ইরানের পক্ষে সাধারণত তাদের হামলা কতটা সফল হয়েছে তা জানা সাধারনত কঠিন।

তিনি বলেন, ইরান জানে যে অস্ত্র ছোড়া হয়েছে। কিন্তু তাদের বাহিনী জানে না সেগুলো ৫০ মিটার দূরে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে কিনা, খালি রানওয়েতে আঘাত করেছে কিনা, নাকি সফলভাবে কোনও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। 

তার মতে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হামলা হওয়া স্থানগুলোর বিস্তারিত তালিকা, বিবরণ ও বিশ্লেষণ কার্যত বিনামূল্যে ইরানের জন্য যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করে দিচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এই হতাহতের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বর্তমানে মাত্র তিনজনে একজন মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধ সমর্থন করছে।

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে মার্কিন ঘাঁটির রাডার টাওয়ার, ব্যারাক ও বিমান রাখার স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন তারা।

২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে মার্কিন হামলার বিষয়ে সামরিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

সেনাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হবে?

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মোতায়েন থাকা সেনা সদস্যদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের নিয়ম সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যেমন: অনেক সেনাকেই তাদের ফোন লক করে রেখে দিতে হয়, আবার বিশেষ অভিযান বাহিনীর অত্যন্ত সংবেদনশীল মিশনগুলোতে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হতে পারে।

তবে সেনাদের ফোন জমা নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কিছু সেনার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে তারা পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার দাবি শুনে আসছেন বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, মোবাইল ডিভাইসের কিছু অ্যাপ্লিকেশন, যেমন ফিটনেস অ্যাপ ব্যবহারকারীর অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য প্রতিপক্ষের হাতে গেলে তা সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে কাজে লাগতে পারে।

রয়টার্স মে মাসে জানিয়েছিল, স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস থেকে সংগ্রীহিত এবং বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া সেনাদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্যবহার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগনও সামরিক নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইরানের হামলার দাবি বা মার্কিন সেনাদের আহত হওয়ার পৃথক ঘটনাগুলো নিয়েও তারা অনেক সময় বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

অ্যাডমিরাল কুপার সতর্ক করে বলেছেন, হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেলে তা ইরানকে পরবর্তী হামলা চালানোর সুযোগ করে দিতে পারে। 

তিনি বলেন, বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত তথ্য ইরানি বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিতীয় এবং আরও ভয়াবহ হামলা চালানোর সবুজ সংকেত হয়ে উঠতে পারে।