Published : 28 Aug 2026, 05:02 PM
পাহাড়ি ঢল ও কাদার স্রোত নিমিষেই গিলে নিয়েছে ভিটেমাটি, চোখের সামনে স্বজনদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে প্রমত্তা নদী।
নেপালে তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবারের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় মারা গেছেন অন্তত ৪৬৯ জন, এখনও নিখোঁজ শত শত মানুষ।
ঢলের গতিবেগ ও আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, ভূ-বিজ্ঞানীরা প্রথমে এটিকে বড় ধরনের ভূমিকম্প বলে ভুল করেছিলেন।
সেই ধ্বংসস্তূপ ও কাদার স্রোত থেকে যারা অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের মনে এখন কেবলই প্রিয়জন হারানোর গভীর ক্ষত আর সেই নারকীয় ধ্বংসলীলার শিউরে ওঠার মতো স্মৃতি।
বিবিসি ও কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বেঁচে ফেরা সেইসব মানুষের গল্প।
‘চোখের সামনে ভেসে গেল পরিবার’
নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা কল্পনা মল্লার কণ্ঠে স্বজন হারানোর হাহাকার। বিবিসিকে তিনি বলেন, “আমার চোখের সামনেই পরিবারের সবাইকে বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল।”
বাবা, মা, বোন ও বোনের সন্তানদের বাঁচানোর কোনো সুযোগই ছিল না জানিয়ে কল্পনা বলেন, "এই প্লাবন আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। কেবল আমি আর আমার ছেলে ঘরের ছাদে উঠে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়েছি।"
তার ছেলে সুগম মল্লা জানান, মায়ের হাত টেনে ধরে তিনি তাকে রক্ষা করেন। বিপদের মুহূর্তে যোগাযোগের জন্য নিজের মোবাইল ফোনটি বোনের কাছে দিয়েছিলেন সুগম, কিন্তু এখন সেটি আর বাজছে না।
সুগম বলেন, “আমার ভয় হচ্ছে, বোন হয়তো ভেসে গেছে।”
আরেক বাসিন্দা গোমা পণ্ডিত হারিয়েছেন তার গবাদিপশু ও আবাদি জমি।
তিনি বলেন, “আমার সব মোষ ও গবাদিপশু ভেসে গেছে। ১০ বস্তা সরিষা, টন কে টন ভুট্টা আর ধান, সব শেষ। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।”
কাঠমান্ডুর টিইউ টিচিং হাসপাতালের সামনে এখন নিখোঁজ স্বজনদের ছবি হাতে ব্যাকুল মানুষের ভিড়।
স্বামীর ছবি ফোনে দেখিয়ে রাম কুমারী শ্রেষ্ঠ বলেন, “তিনি গাড়ি চালানোর কাজে রসুয়া গিয়েছিলেন। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত কথা হয়েছে। সকালে আর তাকে ফোনে পাচ্ছি না, ফোন বন্ধ।”
একই হাসপাতালে নিজের ছোট ভাই, চাচাতো ভাই, চাচা ও বন্ধুর খবরের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মণি শ্রেষ্ঠ বিশ্ব। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় শেষবারের মত তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার।
রসুয়া স্যাফ্রুর ট্রেকিং গাইড সোনাম দর্জি অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। বুধবার সকাল ৮টায় তিনি গ্রাম ছেড়ে কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু পথেই শুনতে পান গ্রামে ঢল নেমে আসার বিকট শব্দ।
“শব্দটা ঠিক ভূমিকম্পের মত ছিল,” বলেন সোনাম। পরে ছবিতে নিজের বাড়িটি গুঁড়িয়ে যেতে দেখেন তিনি। তার বোন দেচেন তামাং, ভগ্নিপতিসহ বহু স্বজন এখনও নিখোঁজ।
বোনকে জীবিত পাওয়ার জন্য আকুল প্রার্থনা করছেন সোনাম। তিনি বলেন, “১০ শতাংশ সম্ভাবনা হলেও আমরা আশা ধরে রেখেছি, হয়ত বোনকে খুঁজে পাওয়া যাবে।”
তিমুরে সীমান্তের রসুয়া কাস্টমস অফিসের এজেন্ট রাজু বুধাথোকির জন্য বুধবার সকালটি হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কের মুহূর্ত। সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজের কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন তিনি।
ত্রিশূলি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রাজু বলেন, “হঠাৎ পুরো পাহাড় এমনভাবে কেঁপে উঠল যেন শক্তিশালী ভূমিকম্প হচ্ছে। ঘরবাড়ি কাঁপছিল। কী হচ্ছে ভাবার সময় ছিল না। গায়ের কাপড়ে জীবন বাঁচাতে দৌড় দিলাম।”
কাছের একটি পুলিশ পোস্টের তারের বেড়া ডিঙিয়ে পালানোর সময় তার হাত কেটে যায়। পেছনে ফিরে দেখেন, তিমুর বাজারের একের পর এক ঘরবাড়ি প্রমত্তা নদীর কাদার স্রোতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ৫০০ মিটার ওপরে পাহাড়ি বনে উঠে শেষ পর্যন্ত জীবন রক্ষা করেন তিনি।
রাজু বলেন, “বন থেকে নিচে তিমুরের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল আর কখনো এ জীবন ফিরে পাব না। মনে হচ্ছিল পুরোটা একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।”
কাস্টমস প্রতিনিধি প্রকাশ গৌতমের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বলেন, “হঠাৎ বিকট শব্দ হল। নিমিষেই পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ায় ঢেকে অন্ধকার হয়ে গেল।”
প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ানোর সময় বাম পায়ের আঙুলে গুরুতর চোট পান প্রকাশ। তবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই মানুষের কাছে সেই আঘাত সামান্য।
তিনি বলেন, “চোট কোনো বিষয় নয়, অন্তত বেঁচে তো আছি। ওপরের বন থেকে দেখছিলাম কাদার পানিতে লাশের পর লাশ ভেসে যাচ্ছে। চোখের সামনে সুন্দর তিমুর কাদা ও বালুর মরুভূমিতে পরিণত হল।”
দিনভর উদ্ধার না পাওয়ায় বুধবারের রাতটি বনেই কাটাতে হয় প্রকাশ ও অন্যদের। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেওয়া প্যাকেটের নুডলস খেয়ে রাত পার করেন।
বৃহস্পতিবার সকালে হেলিকপ্টারে করে বিদুরে পৌঁছে দেওয়ার পর তিনি অনুধাবন করেন, একটি নতুন জীবন পেয়েছেন।
পাহাড়ের ঢালে আছড়ে পড়া
দোলাখার তুলসী বাহাদুর ভাণ্ডারী জানান, পাহাড় থেকে নেমে আসা কালো কাদার তোড় তাকে প্রচণ্ড শক্তিতে ছুড়ে ফেলে পাহাড়ি ঢালের দিকে।
"পাহাড়ের ঢালটি ধাক্কা না সামলালে আমি স্রোতে ভেসে যেতাম," বলেন তিনি।
এদিকে আহত স্বজনদের দেখভাল করতে ব্যস্ত রাম কুমার রানা জানান, পালানোর সময় অনেক শিশু আতঙ্কিত হয়ে কাদার মধ্যে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলেছে। পরে হেলিকপ্টারে করে সবাইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বসতি আর চোখের সামনে স্বজনদের হারিয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য তাড়া করে ফিরছে বেঁচে ফেরাদের। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া তাদের স্বস্তি দিলেও দিয়ে গেছে আজীবন বয়ে বেড়ানোর মত গভীর শোক ও হতাশা।