Published : 05 May 2026, 10:35 PM
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ছাড়িয়ে গোটা ভারতের রাজনীতিতে ‘ভবানীপুর’ মানেই ছিল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য।
১৯৭০ এর দশকে এই আসন থেকেই পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছিল প্রথম কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে। সুব্রত মুখার্জি কিংবা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো দাপুটে নেতাদের হাত ঘুরে এই আসনটি হয়ে উঠেছিল মমতার তৃণমূলের প্রধান ক্ষমতার উৎস।
কিন্তু গত ৪ মে বাংলার রাজনীতি দেখল এক ঐতিহাসিক পতন। নিজের এক সময়ের ছায়াসঙ্গী ও শিষ্য শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি।
এটি রাজ্য রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মমতার এই অভাবনীয় পরাজয়ের পেছনে যে ৬টি কারণ সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে সেগুলো হল:
১. সরকারবিরোধী হাওয়া
টানা কয়েক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার ফলে সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের যে বিরক্তি তৈরি হয় তাতে নিরাপদ আসনও আর নিরাপদ থাকে না। তেমনটিই হয়েছে মমতার এই আসনেও। ২০২১ সালে যে আসনটি তৃণমূলের জন্য ‘নিরাপদ’ মনে করা হতো, এবার সেখানে সরকারবিরোধী হাওয়ায় ঘরের মাঠেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী।
২. শুভেন্দু অধিকারী ফ্যাক্টর
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাউকে সামনে না আনলেও, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সুকৌশলে শুভেন্দুকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতার খাসমহল ভবানীপুরে লড়াই করার। শুভেন্দু ২০২১ সালেই নন্দীগ্রামে মমতাকে পরাজিত করেছিলেন। সেই পরাজয়ের পর থেকেই একটি বার্তা মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মমতাকে হারানোর ক্ষমতা যদি কারও থাকে, তবে তিনি শুভেন্দু। সেই ভাবমূর্তিই তাকে এবার ভবানীপুরে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
৩. ভোটব্যাংকে ধস ও সাংগঠনিক দুর্বলতা
পরিসংখ্যান বলছে, ভবানীপুরে মমতার জনপ্রিয়তায় ভয়াবহ ধস নেমেছে। ২০২১ সালে যেখানে তিনি ৭২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, ২০২৬-এ তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪২ শতাংশে।
মমতা যখন সারা রাজ্যে নির্বাচনী জনসভা করে বেড়াচ্ছিলেন, তখন বিজেপি ভবানীপুরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এবং বুথে বুথে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেই ভবানীপুরের ৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫টিতে এগিয়ে থেকে বিজেপি বিপদের সংকেত দিয়ে রেখেছিল।
৪. বিজেপির লক্ষ্যভেদী প্রচার
এবার বিজেপি ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে বিকল্প শাসনের রূপরেখা এবং তৃণমূলের ‘ভয়ের রাজনীতি’র বিরুদ্ধে প্রচারণাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, ভোটাররা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে এবং দুর্নীতি ও তৃণমূলের ‘হুমকি সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে খোলাখুলিভাবে কথা বলতে পেরেছে।
৫. এসআইআর প্রক্রিয়া
ভোটার তালিকা স্বচ্ছ করতে এবং ভুয়া ভোটার বাদ দিতে চালানো ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়া ভবানীপুরে মমতার হারের অন্যতম বড় কারণ। অতীতে ভোটার তালিকা নিয়ে কারচুপির যে সংস্কৃতি বাংলায় ছিল, এবার কঠোর নজরদারির ফলে তা আর সম্ভব হয়নি। স্বচ্ছ তালিকার কারণে ভোট কারচুপির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লড়াইটা তৃণমূলের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল। তৃণমূল দাবি করেছিল যে, ভবানীপুরে ব্যাপকহারে ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে সেখানে নির্বাচনী দৌড় হাড্ডাহাড্ডি হয়ে পড়ে।
৬. আরজি কর কাণ্ডের প্রভাব
আরজি কর হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর এটিই ছিল রাজ্যে প্রথম কোনও বড় নির্বাচন।
বিজেপি কৌশলগতভাবে ওই ঘটনায় নিহত চিকিৎসকের মাকে প্রার্থী করে মমতাকে নৈতিকভাবে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়। হাসপাতালের সেই ভয়াবহ ঘটনা আর প্রশাসনের গাফিলতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে গভীর ক্ষোভ ছিল, তার প্রতিফলন ঘটেছে ভোটের বাক্সে।