১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঝড়ের ১২ দিন পরও বিদ্যুৎবিহীন যুক্তরাষ্ট্রের শহর, ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের মামলা

যদিও তাণ্ডব স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিট, কিন্তু এর মারাত্মক প্রভাব দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ভোগাচ্ছে।

ঝড়ের ১২ দিন পরও বিদ্যুৎবিহীন যুক্তরাষ্ট্রের শহর, ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের মামলা
পরিস্থিতি মোকাবেলায় অনেকে জেনারেটর কিনতে বাধ্য হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 03:08 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সাবেক শিল্পনগরী গ্যারিতে বিধ্বংসী ঝড় আঘাত হানার পর ১২ দিন পার হয়ে গেলেও ঘটেনি বিদ্যুৎ সংকটের অবসান। অন্ধকার আর দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন শহরটির হাজার হাজার বাসিন্দা। 

পচনশীল খাবার ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, ১১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের মিডওয়েস্ট অঞ্চলে হঠাৎ আছড়ে পড়া শক্তিশালী ঝড়, বন্যা ও টর্নেডোর কারণে শিকাগো ও ইন্ডিয়ানাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়। মিশিগান হ্রদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত গ্যারি শহরে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫৯ কিলোমিটারে (৯৯ মাইল) পৌঁছেছিল।

যদিও তাণ্ডব স্থায়ী হয়েছিল মাত্র পাঁচ থেকে ১০ মিনিট, কিন্তু এর মারাত্মক প্রভাব দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০ হাজার বাসিন্দার এই শহরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই বিপর্যয় শহরের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক ও দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় পেট্রল পাম্পও বন্ধ থাকছে। ছবি: রয়টার্স

বিদ্যুৎ না থাকায় পেট্রল পাম্পও বন্ধ থাকছে

ঝড় আঘাত হানার পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'নর্দান ইন্ডিয়ানা পাবলিক সার্ভিস কোম্পানি' (নিপস্কো) ৩ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি গ্রাহকের সংযোগ সচল করলেও এখনও প্রায় ৩০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিহীন। প্রথম কয়েকদিন পাম্প, সুপারমার্কেট ও ফার্মেসি বন্ধ থাকায় খাদ্য সংকটে পড়া মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন'।

সড়কবাতি বন্ধ থাকায় রাতে পুরো শহর অন্ধকারে ডুবে থাকে। লিফট বন্ধ থাকায় এক হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে সিঁড়ি দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে নামতে হয়েছে বলে খবর। 

৭৭ বছর বয়সী টেরি ডুবোইস জানান, বন্ধুদের আনা শুকনো খাবার খেয়ে ও পাওয়ার ব্যাংকে ফোন চার্জ দিয়ে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তিনি। টেরি বলেন, "আমার পুরো জীবনে এমন ঝড় দেখিনি। মনে হচ্ছিল বাতাসের এক বিশাল দেয়াল আছড়ে পড়েছে।"

তবে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। 

উঠানে বারবেকিউয়ে খাবার রান্না করার সময় ডেমন্ড পম্পি বলেন, "গোসল করা বা ফ্লাশ করার মতো স্বাভাবিক বিষয়গুলো কতটা কঠিন তা বিদ্যুৎ না থাকলে বোঝা যায়। তবে আমাদের একটি বিশেষত্ব হলো, আমরা যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারি।"

চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। ছবি: রয়টার্স

চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে

আরেক বাসিন্দা কাইল অ্যালেন তার ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবার সেবা নিশ্চিত করতে জেনারেটর কিনেছেন, যা দিয়ে আপাতত তাদের দিন চলছে। তবে সবার সামর্থ্য একরকম না। 

শাতিয়া হার্ডিন বলেন, "রাতে গরমে ছটফট করতে হয়, শিশুদের সামলাতে হয়। অনেক প্রবীণ মানুষের অক্সিজেন মাস্কের জন্য বিদ্যুৎ দরকার। প্রতিদিন এভাবে 'সারভাইভাল মোডে' থাকা সম্ভব নয়।"

বিদ্যুৎ লাইনের ওপর থাকা গাছের ডালপালা না ছাঁটার অভিযোগে নিপস্কোর বিরুদ্ধে যৌথ মামলা (ক্লাস-অ্যাকশন লস্যুট) দায়ের করেছেন বাসিন্দারা। 

মামলাকারী জ্যাক টিপোল্ড জানান, ঝড়ের সময় তিনি ডেন্টাল ক্লিনিকে ছিলেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরও তার সবকটি দাঁত তোলার কাজ শেষ করা হয়। 

কিন্তু এরপর বিদ্যুৎ না থাকায় ফার্মেসি থেকে কোনো ব্যথানাশক ওষুধ না পেয়েই তাকে বাড়ি ফিরতে হয় আর টানা ৪৮ ঘণ্টা চরম যন্ত্রণায় কাটাতে হয়। তবে নিপস্কো অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে আদালতে লড়বে বলে জানিয়েছে।

ইন্ডিয়ানার গভর্নর মাইক ব্রাউন এত দীর্ঘ বিলম্বের কোনো অজুহাত হতে পারে না উল্লেখ করে দ্রুত কেন্দ্রীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ফেমা) মাধ্যমে দুর্যোগ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। ধর্মীয় নেতারাও এক হয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন। 

নিপস্কো জানিয়েছে, অতিরিক্ত কর্মী নামিয়ে বুধবারের মধ্যে সংযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়া দিন দিন আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। ফলে এমন দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বিপর্যয় ভবিষ্যতে আরও নিয়মিত সংকট হয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েছে।