ইউক্রেইন যুদ্ধে যেতে না চাইলে নির্যাতন-হত্যার শিকার হচ্ছে রুশ সেনারা
রাশিয়ার কমান্ডারদের নিজ সেনাদেরই হত্যা ও নির্যাতনের ভয়াবহ নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম ভার্স্তকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
ইউক্রেইন যুদ্ধে লড়তে অস্বীকৃতি জানানো সেনাদের নির্যাতন ও হত্যা করছেন রাশিয়ার কমান্ডাররা। এমনই অভিযোগ উঠে এসেছে স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম ভার্স্তকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
এর মধ্য দিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর ভেতরের এক সহিংস চিত্রই সামনে এসেছে, যেখানে অবাধ্য হলেই সেনাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে কিংবা তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মঘাতী মিশনে পাঠানো হচ্ছে।
সেনা সদস্য, নিহতদের আত্মীয়স্বজনের সাক্ষ্য, ফাঁস হওয়া ভিডিও ও সরকারি অভিযোগের রেকর্ডের ভিত্তিতে ভার্স্তকা জানিয়েছে,তারা ১০১ জন রাশিয়ান কমান্ডারকে শনাক্ত করেছে, যারা তাদের নিজ সহকর্মীদের হত্যা, নির্যাতন বা মারাত্মক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত।
ভার্স্তকা অন্তত ১৫০ জনের মৃত্যু যাচাই করতে পেরেছে। তবে তারা বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেই তাদের ধারণা।
ইউক্রেইনে রাশিয়ার পুরোদস্তুর আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই রুশ সেনাদের নিজেদের পক্ষের গুলিতে নিহত হওয়া কিংবা তাদের পিছু হটতে বাধা দেওয়ার খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক্রেমলিন অবশ্য বরাবরই রাশিয়ার সেনাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। তারা উল্টো ইউক্রেইনের সেনাবাহিনীতে এমন সমস্যা ব্যাপক বলে জোর গলায় দাবি করেছে।
কিন্তু ভার্স্তকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত ও প্রমাণসমৃদ্ধ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেইনে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানো রুশ সেনাদের ‘এক্সিকিউশন শুটার’ দিয়ে গুলি করে হত্যা করাতেন অনেক সেনা কমান্ডার।
তাদের মৃতদেহ নদীতে বা অগভীর গর্তে ফেলে দেওয়া হত। পরে নথিতে তাদেরকে ‘যুদ্ধে নিহত’ হিসেবে দেখানো হত। কিছু কমান্ডার আহত বা পিছু হটা সেনাদের ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে কিংবা বিস্ফোরক ছুড়ে তাদেরকে হত্যা করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কমান্ডাররা নিজ সেনাদের ওপর ড্রোন থেকে গ্রেনেড ফেলার নির্দেশ দিয়েও হত্যা করেছেন, যাতে তা শত্রুপক্ষের হামলা হিসাবে দেখানো যায়।
ভার্স্তকা আরও জানায়, অনেক সেনাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে মারা হয়েছে। অবাধ্য সেনাদেরকে লোহার খাঁচায় ফেলে রাখা, পানিতে চুবানো, ঘন্টার পর ঘণ্টা কিংবা দিনের পর দিন মারধর করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে সেনাদের বাধ্য করা হত একে অপরের সঙ্গে প্রাণঘাতী লড়াই লড়তে, অনেকটা ‘গ্ল্যাডিয়েটর স্টাইলে’। রুশ সেনাদের পর্যবেক্ষণকারী ইউক্রেইনীয় পর্যবেক্ষকরা এমন একটি ঘটনার ভিডিও গত মে মাসে প্রকাশ করেন।
তাতে দেখা যায়— খালি গায়ে দুই সেনা একটি গর্তের ভেতরে লড়ছেন। আর পেছন থেকে এক কর্মকর্তা বলছেন, “যে আগে মেরে ফেলবে, সে গর্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।”
কোনও এক সেনা নিস্তেজ হয়ে পড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত “তাকে মেরে ফেল, এখনও কেন অপেক্ষা করছ?”-- এমন সব বিদ্রুপ চলতেই থাকে।
ভার্স্তকার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কমান্ডাররা জুলুম করে অর্থ আদায় করতেন। আত্মঘাতী মিশন থেকে সেনারা রেহাই পেতে চাইলে তাদেরকে ঘুষ দিতে হত। যারা দিতে পারত না বা দিতে অস্বীকৃতি জানাত তাদেরকে হত্যা করা হত।
সেনাদেরকে আত্মঘাতী মিশনে পাঠিয়ে মেরে ফেলা হত। শত্রুপক্ষের গুলির মুখে রুশ সেনাদেরকে কোনওরকম হাতিয়ার ছাড়াই হেঁটে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন কমান্ডাররা।
প্রথমে এসব ঘটনা মূলত কারাগার থেকে নিয়োগ করা দোষী-সাব্যস্ত সাবেক সেনাদের মধ্যে সীমিত ছিল, কিন্তু এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে নিয়মিত বাহিনীতেও।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “অপরাধীদের দায়মুক্তি আর সাবেক কয়েদিদের অন্তর্ভুক্তি রুশ সেনাবাহিনীতে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।”
অভিযুক্তদের বেশিরভাগই ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী মধ্যপর্যায়ের কর্মকর্তা, যারা আগের রুশ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন বা পেনাল ব্যাটেলিয়ন থেকে এসেছেন। তাদের প্রায় কারও বিরুদ্ধেই এখনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযুক্ত ১০১ জনের মধ্যে ৬০ জনেরও বেশি কমান্ডারের বিস্তারিত তথ্য জোগাড় করতে পেরেছে ভার্স্তকা। এত বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও এই কমান্ডারদের কাউকেই কোনও জবাবদিহি করতে হয়নি।
রুশ সামরিক কৌঁসুলির দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে ভার্স্তকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন সেনা সদস্য ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ২৯ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে।
এর মধ্যে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ ছিল নিজেদের ঊর্ধ্বতনদের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে।
রাশিয়ার সামরিক কৌঁসুলির কার্যালয়ের এক সূত্র ভার্স্তকা-কে জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের তদন্তে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আছে।
“তারা বলে, তদন্ত করলে অভিযান ব্যাহত হবে। তার মানে, অভিযোগ যতই গুরুতর হোক, এই কর্মকর্তারা পুরোপুরি দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন,” বলেন তিনি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
