Published : 14 Sep 2026, 06:25 PM
হিমবাহ গলে যাওয়ার গতি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ায় এবং হিমবাহসৃষ্ট হ্রদগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলে নজরদারির ঘাটতি বাড়তে থাকায় হিমালয় এক বিপজ্জনক চরম সীমার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। নেপাল ও তিব্বতে স্মরণকালের অন্যতম প্রলয়ঙ্করী বন্যার পরপরই এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হল। ওই বন্যায় ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি স্পষ্ট করে তুলেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরামর্শদাতা সংস্থা ‘সিস্টেমিক’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের হিমবাহগুলো বর্তমানে এক দশক আগের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুতগতিতে বরফ হারাচ্ছে।
প্রতিবেদনটি ‘ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভ’ এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং এতে কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র’ (ইসিমোড) ও ভারতের ‘জি বি পন্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব দ্য হিমালয়ান এনভায়রনমেন্ট’-এর কারিগরি সহায়তাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়- উদ্বেগের বিষয় হল, সমগ্র হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলজুড়ে থাকা আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টির ওপর নিয়মিত ও বিস্তৃত নজরদারি চালানো হচ্ছে।
বিবিসি লিখেছে, নজরদারির এই বিশাল ঘাটতি একটি গুরুতর বিষয়। কারণ, ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। হিমবাহ গলে সরে যাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে পাথর ও বরফের অস্থিতিশীল বাঁধের পেছনে নতুন হ্রদ তৈরি হয়। এসব হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে গেলে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
একইসঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে স্থায়ীভাবে জমে থাকা ভূগর্ভস্থ বরফ স্তর গলে গিয়ে পাহাড়ি ঢালকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যা একের পর এক প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভারত ইতোমধ্যে এই বিপর্যয়ের মাত্রার প্রমাণ পেয়েছে। দেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১৮ শতাংশ হিমালয় অঞ্চলভুক্ত হলেও, ভারতের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর প্রায় ৩৫ শতাংশই ঘটে থাকে এই পর্বতমালায়।
গত বছরের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে চিহ্নিত ১৮৯টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে ৫৬টিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথা গত জুলাইয়ে ভারতের সংসদকে জানায় সরকার।
ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন বর্তমানে হিমালয়ের নদী অববাহিকা জুড়ে ১০ হেক্টরের চেয়ে বড় এমন ২ হাজার ৪৮৫টি হিমবাহ হ্রদের ওপর নজর রাখছে।
হিমবাহের বরফ গলে সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে কী মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার ভয়াবহ উদাহরণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই দেখেছে ভারত।
২০২৩ সালে সিকিমে এমনই এক হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৭০ জন নিহত হন এবং সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে ঋষিগঙ্গা ও ধৌলীগঙ্গা উপত্যকায় একইভাবে প্লাবনে ২০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
তবে এই বিপদ কেবল আকস্মিক বন্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, হিমালয়ের নদী ব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান ভিত্তি।
ইসিমোডের হিসাব অনুযায়ী, চলতি শতকের মাঝামাঝি সময়ে অধিকাংশ নদী অববাহিকায় বরফগলা পানিপ্রবাহ সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পর হিমবাহ সংকোচনের কারণে পানির প্রবাহ দ্রুত কমতে থাকবে।
প্রতিবেদন মতে, গম, ধান, চা, জলবিদ্যুৎ ও তীর্থযাত্রানির্ভর অর্থনীতির ওপর ভর করে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হিমালয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল।
অথচ এই বিশাল অর্থনৈতিক মূল্যের মাত্র ৫ শতাংশ ধরে রাখতে পারে স্থানীয় পাহাড়ি রাজ্যগুলো।
‘লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্স’ এর গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর চেয়ারম্যান লর্ড নিকোলাস স্টার্ন সতর্ক করে বলেন, কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও অবকাঠামোর ভিত্তি হিমালয় বা ‘তৃতীয় মেরু’ পরিবেশগত মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, হিমালয়ের বরফ গলনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী সমতলের ইটভাটা ও কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া। বরফ ও তুষারের ওপর জমে থাকা কালো ধোঁয়ার কণা সূর্যের আলো থেকে বেশি তাপ শোষণ করে। ফলে হিমবাহ গলার গতি বেড়ে যায়।
গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের তুলনায় কালো কার্বন নিয়ন্ত্রণ এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলো সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে।
সিস্টেমিকের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও গবেষণার প্রধান লেখক আরুশি চোপড়া বলেন, "হিমালয় এক সংকটসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা এখন ঝুঁকির মুখে আছে।” তিনি বলেন, "এক দশক আগের তুলনায় হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে।"
বিপর্যয় এড়াতে চোপড়া কালো কার্বন নিঃসরণ কমানো, হিমবাহের ওপর নজরদারি বাড়ানো, দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি জোরদার করা এবং পাহাড়ে পর্যটন পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনাসহ ১০টি অগ্রাধিকারমূলক প্রস্তাব তুলে ধরেছেন প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের হিমালয় অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটক ভ্রমণ করেন। গবেষকদের মতে, পর্যটনের লক্ষ্য কেবল পর্যটকের সংখ্যা সর্বোচ্চে নিয়ে যাওয়া হওয়াটা উচিত নয়। বরং এর এমন এক অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা উচিত, যার বড় অংশই স্থানীয়ভাবে থেকে যায় এবং উন্নয়নে পুনরায় বিনিয়োগ করা যায়।
সমন্বিত পর্বত উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (ইসিমোড) মহাপরিচালক পেমা গিয়ামৎসো বলেন, ঝুঁকি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।
দুর্যোগ কোনও সীমান্ত মানে না এবং কোনও একক দেশের পক্ষে একা এসব মোকাবেলা করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে সীমান্তপারের নজরদারি, ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়াতে যৌথ বিনিয়োগ এখন জরুরি হয়ে উঠছে।
এসব উদ্যোগ কেবল মানুষের জীবন রক্ষার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি বাঁচানোর জন্যও অপরিহার্য।