Published : 02 Sep 2026, 03:28 PM
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনে বিনিয়োগের আকর্ষণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে চড়া শুল্ক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এবং আকৃতির দিক থেকে ছোট হওয়ার কারণে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য খুব বেশি সুবিধাজনক নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের বাজারকেই স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে বেছে নিচ্ছে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রায় দেড় দশক আগে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উদারীকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক গতি পায়। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করেন।
ভারতে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি জাপানের বিখ্যাত ‘শিনকানসেন’ প্রযুক্তিতে মুম্বাই ও আহমেদাবাদের মধ্যে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে কেবল সরকারি উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বর্তমানে বেসরকারি জাপানি কোম্পানিগুলোই ভারতের বাজারে ব্যবসা প্রসারে মুখ্য ভূমিকা রাখছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রথম আনুষ্ঠানিক দিল্লি সফরের সময় জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ১২৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
এসব বিনিয়োগ সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে করা হবে।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছেন, জাপান নির্ধারিত সময়ের আগেই ভারতে ১০ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে।
শুধু যে বড় বড় জাপানি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে আসছে তা নয়, পাশাপাশি দেশটির মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও (এসএমই) ভারতীয় বাজারে নজর দিচ্ছে।
সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার জন্মস্থান এবং জাপানের অন্যতম প্রধান ম্যানুফ্যাকচারিং হাব ‘হামামাতসু’ শহর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ‘হামামাতসু ইন্ডিয়া কমিটি’ গঠন করেছে। শহরটির ছোট ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে ভারতে ব্যবসা বাড়াতে পারে তা খতিয়ে দেখাই এই কমিটির কাজ।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তোশিরো নিশিজাওয়া সম্প্রতি লিখেছেন, “এটি জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতন্ত্র বাজার বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের প্রতিফলন। এটি নীতিনির্ধারকদের পরিচালিত চীন থেকে ভারতে ভূ-রাজনৈতিক স্থানান্তর নয়, বরং বাণিজ্যিকভাবে চালিত পুঁজির পুনর্বিন্যাস।”
তবে জাপানি কোম্পানিগুলো একযোগে চীন ছেড়ে যাচ্ছে না। বরং তারা ‘বেশ কয়েক বছর ধরে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমাচ্ছে’ বলে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লোয়ি ইনস্টিটিউটের ভারতবিষয়ক বিভাগের প্রধান শ্রুতি পাণ্ডালাই।
তিনি বিবিসিকে বলেন, চীন সম্পর্কিত ঝুঁকির বিরুদ্ধে এক ধরনের সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে ভারত। একই সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অগ্রাধিকার এবং ভারতের উৎপাদন খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে ক্রমবর্ধমান মিল তৈরি হয়েছে। এর ফলে টোকিওতে উল্লেখযোগ্য রাজনীতিতে পালাবদল সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
পান্ডালাইয়ের ভাষায়, “দুই দেশের প্রতিটি নতুন সরকারের আমলে লক্ষ্যমাত্রা কমে না গিয়ে বরং বেড়েছে। এর মানে হলো, সম্পর্কটি কেবল শীর্ষনেতাদের কূটনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দুই দেশের আমলাতন্ত্র, করপোরেট এবং কৌশলগত পরিকল্পনার গভীরে শিকড় গেড়েছে।”
বৈদেশিক বিনিয়োগের ঘাটতিতে থাকা ভারতের জন্য জাপানের এই বিপুল বিনিয়োগ অত্যন্ত সময়োপযোগী।
চীনের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নয়া দিল্লির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘমেয়াদে জাপান-ভারত সহযোগিতার ফলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদন খাতে ভারতের চীনের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সহযোগিতার পূর্ণ সুযোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম স্ক্রলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রত্নশ্রী বসু লিখেছেন, “জাপান এখনো চীনের উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে ভারতের সম্পৃক্ততা তুলনামূলকভাবে কম হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে তা এখন যথেষ্ট শক্তিশালী।”
তিনি আরও লিখেছেন, “এই অর্থে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগকে সীমিত করে। কারণ এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ক্ষতি হতে পারে অথবা চীনের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিশোধের মুখে পড়তে হতে পারে।”
এছাড়া ভারতে ব্যবসা পরিচালনা করার জটিলতাও একটি বড় বাধা।
কর সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘদিনের পরিচিত সমস্যা।
সম্প্রতি জাপানের এক সাবেক মন্ত্রী ভারতের বুলেট ট্রেন প্রকল্পে বিলম্বের জন্য প্রকাশ্যে নয়া দিল্লিকে দায়ী করে বলেন, “ভারত কেবল নিজের স্বার্থ দেখছে এবং বারবার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে।”
যদিও ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দুই দেশের এই মতপার্থক্যকে দ্রুত সামনে এনে চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিই প্রমাণ করে যে বেশ কিছু বড় অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করলেও জাপানি বিনিয়োগের গতি বজায় রাখতে ভারত সরকারকে দ্বিগুণ তৎপরতায় কাজ করতে হবে, বিশেষ করে অন্যান্য উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক মূলধন আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে যখন দেশটি কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে।