১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হামাসের হামলার দেড় সপ্তাহ আগেই নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট

তবে সেই বার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজ দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরকে অন্ধকারে রেখেছিলেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি দৈনিক ‘হারেৎজ’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

হামাসের হামলার দেড় সপ্তাহ আগেই নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Sep 2026, 10:10 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগেই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি ফোন করে সতর্ক করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ।

তবে সেই বার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজ দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরও অন্ধকারে রেখেছিলেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের দৈনিক ‘হারেৎজ’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ঢুকে  ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের হামলার কয়েকদিন আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ৪৫ মিনিটের এক ফোনালাপে বিন জায়েদ স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, বড় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, গাজার (তৎকালীন) হামাস প্রধান ইয়াহইয়া সিনওয়ার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে 'জিলজাল' বা ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের কিছু করার ছক কষছেন।

এ ধরনের কিছু ঘটলে তা কেবল রক্তই ঝরাবে না, বরং গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং আব্রাহাম চুক্তিও ধসিয়ে দিতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে নেতানিয়াহুকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিতে বলেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট।

তবে সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নেতানিয়াহু ছিলেন নির্বিকার। আমিরাত এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত এর সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে হারেৎজ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ওই তথ্য পাওয়ার পরও সময়মতো কোনও ব্যবস্থা নেননি। এমনকি আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনকলের বিষয়টিও নেতানিয়াহু তার সবচেয়ে উর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরকে জানাননি।

নেতানিয়াহু বরং আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, হামাস মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ঝামেলা পাকাতে পারে এবং যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইসরায়েল পুরোপুরি প্রস্তুত।

পরবর্তীতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র পরিচালক উইলিয়াম বার্নসকেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই ফোনালাপের কথা জানিয়েছিলেন বিন জায়েদ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ওই আগাম বার্তা পাওয়ার পরও নেতানিয়াহু বিষয়টি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীন গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত, মোসাদ কিংবা সেনাপ্রধান কাউকেই জানাননি।

হারেৎজ জানায়, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে শিন বেত ও হামাসের মধ্যে একটি গোপন আলোচনার পথ তৈরি হয়েছিল, যার মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক বন্দি বিনিময় চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে এসেছিল।

তবে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, ইসরায়েলের নতুন জোট সরকারের উগ্রপন্থি সহযোগীদের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে কিংবা হামাসের সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে ভয় অথবা গণমাধ্যমে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখেন। ওই সময়ে ইসরায়েল দেশের ভেতরে বিদ্রোহ সামাল দিতেও ব্যস্ত ছিল।

ওদিকে দিনের পর দিন চুক্তির জন্য অপেক্ষায় থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন হামাস প্রধান সিনওয়ার সেপ্টেম্বরে ওই যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেন  এবং এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠান যে, তিনি “ভয়াবহ এক অভিযানের” পরিকল্পনা করছেন।

১৫ সেপ্টেম্বর সিনওয়ারের এই সতর্কবার্তার কথা শিন বেতের তৎকালীন প্রধান রোনেন বার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে জানান।

এর দুদিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বার সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল বড় সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। তিনি গাজা সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো ও আগাম প্রতিরোধের সুপারিশ করলেও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

আমিরাতের পর মিশরের গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেলও ফোন করে নেতানিয়াহুকে একই ধরনের বড় অভিযানের আগাম খবর দিয়েছিলেন। কিন্তু কামেলকেও একইভাবে আশ্বস্ত করে এড়িয়ে যান নেতানিয়াহু।

এমনকি ১ অক্টোবরের নিরাপত্তা বৈঠকে আমিরাত বা মিশরের পক্ষ থেকে আসা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনকলের কথা বেমালুম চেপে যান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।

অবশেষে ৭ অক্টোবর সকালে ইসরায়েল সীমান্ত পেরিয়ে বিধ্বংসী আক্রমণ চালায় হামাস, জিম্মি করা হয় বহুজনকে। জিম্মি উদ্ধার প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার এক বছর পর, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসে সেই পুরোনো গোপন যোগাযোগ চ্যানেলটি ফের চালু করতে বাধ্য হয় ইসরায়েল।

এদিকে হারেৎজের এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনকে “পুরোপুরি মিথ্যা” বলে দাবি করেছে নেতানিয়াহুর কার্যালয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওই সময়ে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নেতানিয়াহুর কোনও কথাই হয়নি এবং তিনি কোনো সতর্কবার্তাও পাননি।

তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসতেই ইসরায়েলের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নফতালি বেনেট চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘জেরুজালেম পোস্ট’কে বলেন, “নেতানিয়াহু আমাদের অন্ধের মতো এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি বহু বছর ধরে হামাসকে পুষেছেন এবং প্রত্যক্ষ সতর্কবার্তা সত্ত্বেও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন।  “এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ দায় নেতানিয়াহু কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না,” বলেন বেনেট।