Published : 24 Aug 2026, 05:06 PM
ইরানের বাণিজ্য সহযোগীদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন 'অর্থনৈতিক ডি-ডে' বা আর্থিক আক্রমণের হুমকির কড়া জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটনের এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ অব্যাহত থাকলে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে তারা।
দীর্ঘ দিন ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলায় ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জোরদার হওয়ার মুখে ইরানের সাধারণ মানুষের সংকট গভীর হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের জনগণের উদ্দেশে পেজেশকিয়ান বলেন, "এই সমস্যাগুলোর জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা বর্তমানে এক পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।"
প্রেসিডেন্ট যখন দেশবাসীকে সতর্ক করছেন তখন ওয়াশিংটনকে কঠোর বার্তা দিয়েছে তেহরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, "এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ যদি চলতে থাকে, তবে হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের কোনো অংশ থেকে আর এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।"
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞায় সহায়তাকারী কোনো দেশকে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হিসেবে গণ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এর আগে ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এ প্রকাশিত এক মতামত কলামে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট লেখেন, “ভোর হতেই শুরু হবে এক অর্থনৈতিক ডি-ডে, যা (যুক্তরাষ্ট্রের) কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান।”
ওয়াশিংটন বিশেষ করে চীনকে ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনা বন্ধ করে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ ইরানের রপ্তানি করা তেলের সিংহভাগই আমদানি করে চীন। দেশটির আমদানি করা তেলের প্রায় অর্ধেকই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে।
তবে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা বা চাপ প্রয়োগে নয়, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সংকটের সমাধান সম্ভব।
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি কোনো নতুন সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি, তবে ছয় মাস ধরে চলা তাদের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কার্যকর কোনো আলোচনাও চলছে না। জুনে সুইজারল্যান্ডে শেষবারের মতো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় সামরিক সামর্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলা ও হুমকির কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানি পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের মূল যে লক্ষ্য নিয়েছিল, তার বর্তমান সুনির্দিষ্ট অবস্থা ঠিক কী, তা এখনো অজানা।
উভয়পক্ষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ওমান আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার তেহরানে গিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির।
আর সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি ও বিকল্প নতুন নৌপথ চালু নিয়ে আলোচনা করতে মঙ্গলবার তেহরান যাচ্ছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ বদর আল বুসাইদি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি এই সফরের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও ওমান, দুই দেশেরই উপকূলীয় জলসীমা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমান সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে এলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দেশটিতে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন।
বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা আর হামলায় জর্জরিত ইরানে নিত্য দুর্ভোগের কারণে ফের গণঅসন্তোষ উসকে দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির কর্মকর্তারা, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির রাজনৈতিক বৈধতাকে নতুন করে সংকটে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। অপরদিকে মার্কিন বাহিনীর ১৮ জন সেনা নিহত ও সাড়ে সাতশরও বেশি আহত হয়েছে।