১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে ১৬৪

এ ভূমিকম্পে কেঁপেছে প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামা।

কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে ১৬৪
ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন স্থানীয়রা। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Aug 2026, 12:49 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

কলম্বিয়ায় স্মরণকালের শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

ধসে পড়া ভবনের নিচে আরও অনেকে আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

দেশটির ভূতাত্ত্বিক পরিষেবা সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে চোকো প্রদেশে ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৪; কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০৩ কিলোমিটার গভীরে। পশ্চিম কলম্বিয়ায় শত শত মাইল বিস্তৃত এলাকায় ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়।

মৃতদের অনেকেই কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের শহর পেরেইরার বাসিন্দা। আশপাশের শহর এবং ভালে দেল কাওকা অঞ্চলও ভূমিকম্পে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার গ্রামের কাছে। তবে স্থানীয় মেয়র লেওন ফাবিও মারিন মোনকাদা জানিয়েছেন, সেখানে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অলৌকিকভাবে কেউ হতাহত হননি।

কলম্বিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যাপিটাল সিটিজ সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ৪৮০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার (৩৪ মাইল) দূরে পেরেইরা শহরেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার দোসকেব্রাদাসে ধসে পড়া একটি ভবন পরিদর্শন করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা। ছবি: রয়টার্স

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার দোসকেব্রাদাসে ধসে পড়া একটি ভবন পরিদর্শন করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা

বিবিসি লিখেছে, শহরটির প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে একটি ভবন ধসে পড়েছে। অনেক মানুষ যেখানে জড়ো হয়েছেন; ঘটনাস্থলের ভিডিওতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ ও ধুলা দেখা গেছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কেবল মহানগর এলাকায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৬৫টি ভবন ধসে পড়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ভবনে মানুষ আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শহরের কিছু এলাকায় মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে।

পেরেইরা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে কালি শহরে ৩২টি ভবন ধসে পড়েছে।

২৯ বছর বয়সী ড্যান কাটলার লন্ডনের বাসিন্দা। সঙ্গীর সঙ্গে দীর্ঘ ভ্রমণের অংশ হিসেবে তিনি প্রায় দুই মাস ধরে কলম্বিয়ায় রয়েছেন এবং বর্তমানে কালিতে আছেন।

ভূমিকম্পে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর তিনি বিবিসিকে বলেন, “আমি এরকম কখনো অনুভব করিনি।”

তিনি বলেন, “আমরা পায়জামা পরেই দৌড়ে বাইরে চলে যাই। হোটেলের কাঠামোর বড় কোনো ক্ষতি হয়নি, তবে দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং রং ও প্লাস্টার খসে পড়েছে।”

ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধানে নীরবতা বজায় রাখার আহ্বান জানাতে দুই মুষ্টি উঁচিয়ে ধরেছেন এক উদ্ধারকর্মী। ছবি: রয়টার্স

ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধানে নীরবতা বজায় রাখার আহ্বান জানাতে দুই মুষ্টি উঁচিয়ে ধরেছেন এক উদ্ধারকর্মী

মানিজালেস, কুইবদো, মেডেলিন এবং চোকো ও ভালে দেল কাওকা অঞ্চলজুড়েও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। মানিজালেসে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন।

অ্যাঞ্জেলিকা আভিলা নামের একজন বিবিসিকে বলেন, তিনি মানিজালেসের একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ভূমিকম্পের সময় দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়।

তিনি বলেন, “সবাই চিৎকার করছিল... আমি পাশের ভবনগুলো থেকে ধুলা বের হতে দেখেছি এবং দেয়াল থেকে ইট খসে পড়ছিল।”

মানিজালেসের সাংবাদিক ও আবহাওয়াবিদ লুইস ফেলিপে মোলিনা ভূমিকম্পের সময় তার বাড়িতে ছিলেন। তার অবস্থান ছিল ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে।

তিনি বলেন, অতীতে ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার কারণে শহরটিতে ‘ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণের খুব কঠোর বিধিমালা’ রয়েছে। ফলে তার ভবনটি ভূমিকম্পের ধাক্কা মোকাবিলা করতে পেরেছে।

তিনি বিবিসিকে বলেন, তার বুক শেলফের সাড়ে চারশ বইয়ের বেশিরভাগই ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে নিচে পড়ে গেছে। তখন কাচ ভাঙার শব্দ আর মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।  

তার ভাষায়, “এটা ছিল ভয়াবহ ও আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা।”

ভূমিকম্পের পর কালিতে এ ভবন ধসে পড়ায় ভেতরের কক্ষগুলো বাইরে থেকে দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। ছবি: রয়টার্স

ভূমিকম্পের পর কালিতে এ ভবন ধসে পড়ায় ভেতরের কক্ষগুলো বাইরে থেকে দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে

দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরাসহ কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

রাজধানী বোগোতায় গাছপালা ও ট্রাফিক বাতিগুলো প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত শহরের অবকাঠামোর গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামা পর্যন্ত ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে জোড়া ভূমিকম্পে ৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে কলম্বিয়ায় এ ভূমিকম্প আঘাত হানল।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করেছেন। এর ফলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে, যার মধ্যে বাজেট পুনর্বণ্টনের ক্ষমতাও রয়েছে।

শুক্রবারই দায়িত্ব নেওয়া নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে এমন এক ঘটনা হাজির হয়েছে, যা তার রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, দেড় হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা।

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা।

ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা যখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ‘সহায়তা করতে প্রস্তুত’ রয়েছেন। 

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, উদ্ধার অভিযানে ইইউর কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হচ্ছে।

এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে কলম্বিয়ার জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন এবং উদ্ধারকাজে কর্মী ও সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্রায় ৭ মাত্রার কাছাকাছি কম্পন অনুভব করেছেন।

সংস্থাটি জানিয়েছে, সোমবারের ভূমিকম্পটির মতো গভীর ভূমিকম্প সাধারণত পৃথিবীপৃষ্ঠের কাছাকাছি সংঘটিত ভূমিকম্পের তুলনায় কম বিপজ্জনক।

তবে এগুলো এমনভাবে শক্তি নির্গত করতে পারে, যা ভবনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ ধরনের ভূমিকম্পের পর আফটারশকের সংখ্যা কম হলেও সেগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী হতে পারে।