‘কোনও যাত্রীকে মরতে দিতে পারতাম না’, মোদীকে ফ্লাইদুবাইয়ের সেই পাইলট
ভিডিও কলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘বীর’ পাইলট স্মিত মাচ্ছারের সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশংসা করেছেন।
ককপিটে সহ-পাইলটের প্রাণঘাতী আক্রমণের শিকার হয়েও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন ফ্লাইদুবাই ফ্লাইটের সেই সাহসী ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার।
আকাশে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ তিনি জানান, কেবল নিজের জন্য নয়, উড়োজাহাজে থাকা অন্য সব যাত্রীকে তিনি কিছুতেই মরতে দিতে পারতেন না।
বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজের ককপিটে মারামারির ঘটনার পর শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক ভিডিও কলে কথা বলার সময় স্মিত মচ্ছার এভাবেই নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন ।
মোদীকে সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “ওই সময়ে আমি নিজের জীবনের জন্য লড়াই করছিলাম। আমি এতটাই জখম হয়েছিলাম যে, মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল যে, আমি যদি কিছু না করি তবে অন্য সবাই মারা যাবে।"
“আমি ১৭ বছর ধরে বিমান চালাচ্ছি এবং গত ১১ বছর ধরে ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছি। চোখ বন্ধ রাখলেও আমি হুবহু বুঝতে পারি উড়োজাহাজের ভেতরে কী ঘটছে। যখন আমি নিচে পড়ে গিয়েছিলাম, তখনও আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে উড়োজাহাজটি খাড়াভাবে নিচের দিকে নামছে," বলেন ক্যাপ্টেন মাচ্ছার।
তিনি বলেন, "আমি আহত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিলাম, কিন্তু ভেতর থেকে ককপিটের দরজা খোলার জন্য শেষবারের মতো একবার চেষ্টা করার কথা নিজেকে বললাম।"
“এরপর কোনওভাবে ককপিটের দরজা খুলে দেই। আর সবাই তখন ভেতরে ঢোকে। আমি নিজের জীবন বাঁচাতে লড়ছিলাম। কিন্তু সঙ্গে এও জানতাম যে, আমি অন্যদেরকে মরতে দিতে পারি না।”
গত বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাই এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটি যাত্রার আড়াই ঘণ্টার মাথায় ১৭,০০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে যায়।
ককপিটের দরজা খুলে যাওয়ার পরই যাত্রী এবং বিমানকর্মীরা মিলে হামলাকারীকে কাবু করেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিয়ে নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ করান।"
আহত স্মিত ও তার কো-পাইলটকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্মিতকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে।
উড়োজাহাজের ঘটনা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকার পাশাপাশি যাত্রী ও ক্রুদের প্রত্যেকের অবদানকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন পাইলট স্মিত।
তার কথায়, “যাত্রী ও বিমানকর্মীরা সবাই সমান ভূমিকা পালন করেছিলেন।” আর বিপদের ওই সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র হনুমান চলিশা পড়ছিলেন বলেও জানিয়েছেন এই ভারতীয় পাইলট।
কথা বলতে বলতেই কেঁদে ফেলেন স্মিত। তা নিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এও বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে ফোনে কথা বলবেন সেটি ভাবতে পারেন নি।
পাল্টা আশ্বস্ত করেন মোদীও। তিনি বলেন, “আপনি আমার কাছে আবেগপ্রকাশ করবেন না তো কার কাছে করবেন। আপনি আজ এমন কাজ করেছেন যে দেশ আপনার কাজে গর্বিত, কৃতজ্ঞ। বিশ্বজুড়ে সবাই চাইছে একবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে।”
“আপনার দীর্ঘায়ু কামনায় গোটা দেশ। আপনি বীর, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। আপনি সমস্ত যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আপনি বিরাট বড় কাজ করেছেন। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, অহিংসা কী, তা আপনি দেখিয়েছেন। গোটা দেশ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
রক্তাক্ত অবস্থায় উড়োজাহাজ বাঁচিয়ে গোটা বিশ্বের কাছেই এখন ‘বীর’ ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর। প্রাণঘাতী হামলার পর এখন তিনি আশঙ্কামুক্ত। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।
'সৌদি আরব প্রশাসন হামলায় অভিযুক্ত কো পাইলটকে আরব আমিরাতের হাতে তুলে দিয়েছে। ‘ফ্লাইদুবাই’-এর অভিযুক্ত কো পাইলটকে এখন জেরার কাজ চালাবে তারাই।
সূত্র: এনডিটিভি, বিবিসি
