১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইসরায়েলে প্রভাব হারাচ্ছে নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’?

একসময় মনে হয়েছিল, সাবেক ও বর্তমান সব মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে ডনাল্ড ট্রাম্পই নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের জন্য তাদের সবচেয়ে কাছের নেতা।

ইসরায়েলে প্রভাব হারাচ্ছে নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’?
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Jul 2026, 03:43 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকে নিজ দেশের রাজনীতিতে নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

যুক্তরাষ্ট্রে জীবনের একটি বড় সময় কাটানোর কারণে সেখানকার রাজনীতি ও জনমনস্তত্ত্ব তিনি বেশ ভালোভাবেই বোঝেন। নিখুঁত মার্কিন উচ্চারণে সাবলীল নেতানিয়াহু এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইসরায়েল ও নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মসূচির পক্ষে টেনেছেন।

একসময় মনে হয়েছিল, সাবেক ও বর্তমান সব মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে ডনাল্ড ট্রাম্পই নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে অনুকূল নেতা। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করতে সম্মত হওয়া প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রত্যাশাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন।

তবে পরবর্তীতে যুদ্ধের গতি থমকে যাওয়া, ইসরায়েলের মতামত ছাড়াই পশ্চিম এশিয়ায় ট্রাম্পের চুক্তি করার প্রবণতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলকে নিয়ে সমালোচনার মুখে এক নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। ইসরায়েলে এখন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্পকার্ড’ হয়ত আগের মতো আর কাজে আসছে না।

ছবি তোলার রাজনীতি ও বাস্তবতা:

এমন এক সময়ে এটি হয়েছে, যখন নেতানিয়াহুকে নিজ দেশে আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তার ওপর ঝুলছে দুর্নীতির মামলা এবং পুরো অঞ্চলে বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত সংঘাতের চাপ।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মঙ্গলবার প্রথম ওয়াশিংটন সফর করেন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর এই সফর ছিল তার জন্য নতুনভাবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার একটি সুযোগ। এর উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের ছবি ছড়িয়ে দিয়ে ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বহাল থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

তবে এই সম্পর্কের ভেতরের সমীকরণ এখন বেশ জটিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন যে,  ইরানে সামরিক অভিযান সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং ইরান সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব। এই যুক্তিতে তিনি ট্রাম্পকে ইরানে যুদ্ধ করতে রাজি করিয়েছিলেন।

কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় দুই নেতার সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হতে শুরু করে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও নেতানিয়াহুকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কারণ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে চরমপন্থি ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতায় নেতানিয়াহুর প্রশ্রয় এবং এক মার্কিন সিনেটরকে বসতিস্থাপনকারীদের বেআইনি আটকের ঘটনায় মার্কিন কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ক্ষোভ জন্ম দিয়েছে।

তার ওপর তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের অমত থাকার পরও ওয়াশিংটন নিজের পথেই হেঁটেছে।

নিউ ইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক কনসাল জেনারেল অ্যালন পিংকাস আল জাজিরাকে বলেন, “নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউজ সফরের পেছনে গভীর রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে। তিনি প্রচার করছেন যে, তার প্রয়াত বন্ধু রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে তিনি সেখানে গেছেন।”

পিংকাস আরও বলেন, “কথিত আছে যে, তাদের আলোচ্যবিষয় ইরান, এফ-৩৫ ও সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য দুটি- প্রথমত: নিজের দেশের সমর্থক ও বিরোধীদের দেখানো যে, ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক ঠিক আছে। আর দ্বিতীয়ত ট্রাম্প আবার নেতানিয়াহুর দুর্নীতির মামলায় তাকে ক্ষমা করার আহ্বান জানাবেন সেই আশা।“

২০২৫ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর বিচারে ট্রাম্পের নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের দিকেই ইঙ্গিত করেন পিংকাস।

নেতানিয়াহু হয়ত আশা করছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সফল বৈঠক তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। তবে তিনি এমন সময় যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন, যখন দেশটিতে তার গ্রহণযোগ্যতা সম্ভবত আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কম।

রিপাবলিকান শিবিরেই বাড়ছে সমালোচনা:

ওয়াশিংটনে এবার নেতানিয়াহুকে যে পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে, তা তার অতীতের যেকোনো সফরের চেয়ে ভিন্ন। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনে ও মার্কিন ডানপন্থিদের মধ্যেও তিনি নিজের সমর্থন হারাচ্ছেন।

জনপ্রিয় পডকাস্টার টাকার কার্লসন এবং রিপাবলিকান পার্টির সাবেক আইনপ্রণেতা মার্জরি টেলর গ্রিনের মতো ব্যক্তিত্বরা প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছেন।

মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অভিযোগ করেন, ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে তার মধ্যস্থতা করা চুক্তিটি পণ্ড করার চেষ্টা করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠকে প্রকাশ্যে সৌজন্য দেখা গেলেও ব্যক্তিগত আলোচনায় ট্রাম্পের মনোভাব ছিল সন্দেহ আর অবিশ্বাসে ভরা।

গত সোমবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রিতে নেতানিয়াহুর আপত্তির কথা উড়িয়ে দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আমরা কাকে কী বিক্রি করব, তা অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে না।”

লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র টিচিং ফেলো ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অহ রন ব্রেগম্যান বলেন, “নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে এখন বেশ বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। ট্রাম্পকে একটি স্বেচ্ছাকৃত যুদ্ধে টেনে আনার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে, যা কৌশলগত দুর্যোগে রূপ নিয়েছে।”

ব্রেগম্যান আরও বলেন, “ভুল বা ঠিক যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই মনে করেন, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যা এড়ানো সম্ভব ছিল। আর সেই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। তাই এখন আর ট্রাম্পসহ কেউই নেতানিয়াহুকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান বা বিচক্ষণ নেতার ভাব দেখানোর সুযোগ দেবে না। সেই সময় শেষ হয়ে গেছে।’

বিদায়ের সুর কি তবে বাজছে?

রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর প্রধান শক্তিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতুলনীয় সম্পর্ক রক্ষা করার দক্ষতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ভিত্তির বড় অংশই তিনি হারিয়েছেন।

ইসরায়েলের জনমত জরিপকারী এবং ১৯৯০-এর দশকে নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক আল-জাজিরাকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অতীত রেকর্ড খুবই ভালো। কিন্তু তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্টও করেছেন।“

তিনি বলেন,  নেতানিয়াহুকে নিয়ে সমালোচনা কেবল রিপাবলিকান পার্টির জাতীয়তাবাদী অংশের নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; দলটিতে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মধ্য ডানপন্থি অংশের অনেক নেতাও এখন তার সমালোচনা করছেন।

বারাকের মতে, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যে দুপক্ষের টানাপোড়েন স্পষ্ট। সর্বশেষ তুরস্কের কাছে  এই যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। তাছাড়া, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছিল। ফলে ট্রাম্প আর খুব বেশি দিন নেতানিয়াহুর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার চালাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

তিনি আরও বলেন, “এমনটিও ঘটতে পারে যে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে একজন মহান যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে প্রশংসা করবেন, তবে একইসঙ্গে বার্তা দেবেন যে, ইসরায়েলে এবার নতুন নেতৃত্বের দিকে এগোনো উচিত। এর পর ট্রাম্প অন্য ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশটির জন্য নতুন একজন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানাতে পারেন।“