২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

পাকিস্তানের অস্বস্তিকর সত্যগুলোকে সামনে এনেছে হাসপাতালে আগুনে ১৪ শিশুর মৃত্যু

এ ঘটনা জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে দেশটির ইতোমধ্যে মলিন হওয়া ভাবমূর্তিকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

পাকিস্তানের অস্বস্তিকর সত্যগুলোকে সামনে এনেছে হাসপাতালে আগুনে ১৪ শিশুর মৃত্যু

ইসলামাবাদে অবস্থিত ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস’ (পিআইএমএস) হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের একদিন পর, সেখানে প্রাণ হারানো শিশুদের স্মরণে মানুষ ফুল ও মোমবাতি নিয়ে বসে আছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Sep 2026, 07:59 PM

Updated : 26 Sep 2026, 07:59 PM

আগস্টের শেষের দিকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একটি শিশু হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ জন নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনা দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবহেলিত চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ভূমিকার কারণে দেশটির নেতারা প্রায়ই উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলোতে হাজির হচ্ছেন। এটি ইসলামিক বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশটির মর্যাদা আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু এসবের মধ্যেই মর্মান্তিক ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে।

জাপানের অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্ম নিক্কেই এশিয়ায় পাকিস্তানের খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক ফারহান বোখারি জানিয়েছেন, প্রধানত মধ্য ও নিম্নআয়ের রোগীদের ব্যবহার করা ওই হাসপাতালে ঘটা অগ্নিকাণ্ড অভিজাত ও সাধারণ পাকিস্তানিদের জীবনমানের মধ্যকার তীব্র বৈষম্যকে তুলে ধরেছে। গত ২৬ আগস্টের ওই আগুন প্রাথমিকভাবে এয়ার কন্ডিশনারের ত্রুটি থেকে শুরু হয়েছিল বলে জানা যায় আর তা দ্রুত হাসপাতালের নার্সারি ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ইনকিউবেটরে ১৫ জন নবজাতক ছিল। এর মধ্যে মাত্র একটি শিশু বেঁচে যায়।

নিরাপত্তা কর্মীর অনুপস্থিতির কারণে নার্সারির দরজাগুলো তালাবদ্ধ ছিল, তার মধ্যেই উদ্ধারকর্মীরা নবজাতকদের প্রাণ বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যান। এমন খবর প্রকাশের পর এ ঘটনা পাকিস্তানের সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

যদিও পাকিস্তান সরকার রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে থাকা শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করে আর একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেয়, তবুও নিজ জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে দেশটির ইতোমধ্যে মলিন হওয়া ভাবমূর্তিকে এ ঘটনা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জাতিসংঘের সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদনে নাগরিকদের চাহিদার প্রতি পাকিস্তানের মনোযোগ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেশটি ২০১৬ সালের ১৪৭তম স্থান থেকে পিছিয়ে এ বছর ১৬৮তম স্থানে নেমে এসেছে এবং এর ফলে এটি ‘নিম্ন মানব উন্নয়ন’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মূলধারার জনগণের জীবনযাত্রার মানের প্রমাণ হিসেবে মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদনগুলোকে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়।

এই দশকটিতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর আরও অবনতি হয়েছে। দেশটির সর্বশেষ বার্ষিক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় প্রাক্কলন করা হয়েছে যে, গত জুনে শেষ হওয়া বিগত অর্থবছরে পাকিস্তান তাদের ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, অথচ দেশটি একই সময়ে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করেছে এক শতাংশেরও কম সম্পদ।

সমালোচকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ তারা ছয় লেনের সড়কপথের মতো নতুন নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে প্রচুর সম্পদ বরাদ্দ করেছে, অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

একই সময়ে সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৪ শতাংশেরও কম অংশ আয়কর দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত, যা বড় ধরনের কর ফাঁকিকে স্পষ্ট করে তোলে। পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্যে প্রভাবশালী ও উঁচুতলার ব্যক্তিদের আয়কর প্রদানে সম্পূর্ণ বা আংশিক ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপক প্রবণতা প্রায়ই সামনে এসেছে। এটি দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের অন্যতম দুর্বল দিক।

পাকিস্তানের নেতারা বারবার দাবি করেছেন, তারা কর সংগ্রহ ব্যবস্থা সংস্কারে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ পরিস্থিতি বিরাজমান।

গত আগস্টের শেষের দিকের ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দমকল কর্মীদের তৎপরতায় দেরির কারণে নবজাতকদের বাবা-মায়ের পক্ষ থেকেও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এটি দেশজুড়ে উদ্ধার পরিষেবা আধুনিকায়নের আরও একটি ঘাটতিকে সামনে এনেছে। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।

ইসলামাবাদের হাসপাতালের এই শোচনীয় ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশের প্রদেশগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের দেশব্যাপী হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার পর্যালোচনার নির্দেশ দিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু তাদের এ নির্দেশ এখন পর্যন্ত কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই হয়ে রয়েছে। ২৫ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই দেশে অতীতে ঘটে যাওয়া অন্যান্য শোচনীয় ঘটনাগুলোও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কোনো ব্যাপক সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

ধারণা করা হয়, পাকিস্তানের জনসংখ্যার অন্তত এক তৃতীয়াংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা করতে জাতীয় প্রতিরক্ষায় শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে চলেছে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে সর্বশেষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।

পাশাপাশি তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সঙ্গে অশান্ত সীমান্তজুড়ে চলমান সংঘর্ষের কারণে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বোখারি বলেছেন, অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত দুটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, দীর্ঘকাল উপেক্ষিত জনসেবামূলক খাতগুলোর জন্য সম্পদ সংগ্রহে দেশটির আরও বেশি নাগরিককে কর প্রদানে বাধ্য করার জোরালো উদ্যোগ নিয়ে এর আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে হবে।

আর দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পাকিস্তানে দুর্নীতির ওপর গত বছর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তে আসে যে, দুর্নীতির কারণে পাকিস্তান বার্ষিক জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হারায়। আইএমএফ কর্তৃক উদঘাটিত এই দুর্নীতির মাত্রা দেশটির স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সম্মিলিত বার্ষিক ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি অথবা কেবল স্বাস্থ্য খাতের বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় ছয় গুণ।

আইএমএফ-র এই অনুসন্ধানটি পাকিস্তানের জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধান খাতগুলোতে সংকুচিত হতে থাকা সরকারি সম্পদের ওপর সময়োপযোগী আলোকপাত করেছে এবং দুর্নীতি দমনের প্রয়োজনীয়তাকে একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে।

এই হাসপাতাল ট্র্যাজেডি পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের বকেয়া সংস্কার কাজগুলো বাস্তবায়ন না করলে, পাকিস্তানের এই সংকটময় ইতিহাসে এই সর্বশেষ শোচনীয় ঘটনাটিই যে শেষ ঘটনা হবে না, তা স্পষ্ট।