২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের 'অর্থনৈতিক ডি-ডে' মোকাবেলায় ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘আরেক পরাজয়’ ডেকে আনবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের অর্থমন্ত্রী।

যুক্তরাষ্ট্রের 'অর্থনৈতিক ডি-ডে' মোকাবেলায় ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ ইরান
স্কট বেসেন্ট। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 08:28 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা বা ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ রুখতে তেহরান ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। 

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য "আরেক পরাজয়" ডেকে আনবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিসাদেহ।

বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট'-এর আওতায় নতুন পদক্ষেপগুলো ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার ইতিহাসের "সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান", যার মাধ্যমে তেহরানের আয়ের সব সম্ভাব্য উৎস বন্ধ করে দেওয়া হবে। 

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেসব দেশ, ব্যাংক বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বজায় রাখবে, তাদেরকেও বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।

তেহরানের পাল্টা প্রস্তুতি ও দুই বছরের পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিসাদেহ বলেন, চীন বা রাশিয়া কেউই যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পদক্ষেপ মেনে নেয়নি এবং অন্যান্য বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোও তা প্রতিরোধ করবে।

তিনি বলেন, "সরকার এই পরিস্থিতির জন্য দীর্ঘকাল ধরে অপেক্ষা করছিল এবং এসব ঘটনা মোকাবেলা করতে আমাদের দুই বছরের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং আমরা জানি কীভাবে এই খেলায় জিততে হয়।"

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন চাপ প্রয়োগের জবাবে তেহরান ফের হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব ধরনের তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। 

কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল না করতেও বার্তা দিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু প্রণালী দিয়েই প্রবাহিত হয়।

চীন ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করেছে ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি তেল কেনা দেশ চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়াং জানান, এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপের কৌশল কোনও সমস্যার সমাধান আনবে না এবং বেইজিং নিজের স্বার্থ রক্ষা করবে।

ওদিকে মার্কিন পদক্ষেপের তীব্রতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ডেভিড অক্সলি এই নিষেধাজ্ঞাকে একধরনের "ভেজা পটকা" হিসেবে বর্ণনা করে জানান, ইরানের ৯০ শতাংশ তেল কেনে চীন, যারা অতীতেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানেনি। ফলে স্বল্পমেয়াদে তেলের প্রবাহে এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক আলি ওয়ায়েজ জানান, "চীন সবসময় একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ মনে করে। অন্যদিকে পাকিস্তান, তুরস্ক বা ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাইলেও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।"

বাণিজ্য বন্ধে ট্রাম্পের ফোন ও তেলের বাজারের অস্থিরতা

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় ইরানের ৫টি খাত, ডিজিটাল অ্যাসেট, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জলযানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুরোধ জানাবেন।

সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা আসন্ন নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ।

২০১৫ সালে ওবামা আমলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার শর্তে নিষেধাজ্ঞা তোলার চুক্তি হলেও ২০১৮ সালে ট্রাম্প তা বাতিল করেন। 

চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প কড়া সামরিক হুমকি দিলেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটতে বাধ্য হয়।