Published : 22 Feb 2026, 02:40 PM
অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের তুমুল চাপের মুখে কিউবার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও চিকিৎসকরা ভেনেজুয়েলা ছাড়ছেন।
বিষয়টি সম্বন্ধে জ্ঞাত ১১টি সূ্ত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলা-কিউবা, লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী এ বাম ঘরানার জুটিটি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের মুখেই এ ঘটনা ঘটছে।
যে কারণে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও এখন তার সুরক্ষার দায়িত্ব ভেনেজুয়েলার দেহরক্ষীদের হাতেই সঁপেছেন বলে জানিয়েছে চারটি সূত্র।
অথচ তার পূর্বসূরী দুই প্রেসিডেন্ট—গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অপহৃত নিকোলাস মাদুরো ও প্রয়াত উগো চাভেজ, দুজনই তাদের নিরাপত্তার জন্য কিউবার বিশেষ বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ৩২ কিউবানকে হত্যা করে বলে কিউবার সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে।
এই ৩২ সেনা ও দেহরক্ষীরা ছিলেন ২০০০-এর দশকের শেষদিকে হাভানা ও কারাকাসের মধ্যে যে নিবিড় নিরাপত্তা চুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছি তারই অংশ। ওই চুক্তির আওতায় কিউবার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীরা ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী ও খুবই প্রভাবশালী গোয়েন্দা ইউনিট ডিজিসিআইএমের সর্বত্র ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। সরকারবিরোধী তৎপরতা দমনে এই ডিজিসিআইএম-ই ছিল মূল ভূমিকায়।
“চাভিস্তা সরকারের টিকে থাকার জন্য কিউবার প্রভাব অপরিহার্য ছিল,” বলেছেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ও ভেনেজুয়েলা বিশেষজ্ঞ আলেহান্দ্রো ভেলাসকো।
এখন ডিজিসিআইএমের ভেতরেও কিছু কিউবান উপদেষ্টাকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলার সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনেক কিউবান চিকিৎসাকর্মী ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিমানে করে ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় ফিরেছেন বলে জানিয়েছে দুটি সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রদ্রিগেজের নির্দেশেই ওই কিউবানরা ভেনেজুয়েলা ছেড়েছেন বলে দাবি করেছে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন পার্টির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র। এ কিউবানদের ভেনেজুয়েলার নতুন সরকারই দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে, নাকি তারা নিজের তাগিদেই ভেনেজুয়েলা ছেড়েছেন, অথবা হাভানাই তাদের ডেকে পাঠিয়েছে কিনা অন্য সূত্রগুলো এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানাতে পারেনি।
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনী ও গোয়েন্দা ইউনিট থেকে কিউবানদের সরিয়ে দেওয়ার খবর আগে জানা যায়নি, বলছে রয়টার্স।
ভেনেজুয়েলা-কিউবা বন্ধুত্বের অবসান চান ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে উৎখাত করার আগে, চাভেজ আমলের কল্যাণমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে হাজার হাজার কিউবান চিকিৎসক, নার্স ও খেলাধুলার প্রশিক্ষক ভেনেজুয়েলায় কাজ করতেন। এর বিনিময়ে ভেনেজুয়েলা কিউবায় তেল পাঠাত।
জানুয়ারিতে কারাকাসে মার্কিন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কিউবা-ভেনেজুয়েলার এ নিরাপত্তা সম্পর্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
“ভেনেজুয়েলার বিপুল অর্থ ও তেলের ওপর কিউবা অনেক বছর ধরে বেঁচে ছিল। এর পরিবর্তে কিউবা ভেনেজুয়েলার শেষ দুই স্বৈরশাসককে ‘নিরাপত্তা সেবা’ দিয়েছিল, কিন্তু আর সেটি হবে না,” ১১ জানুয়ারি ট্রুথ সোশালে এমনটাই লিখেছিলেন ট্রাম্প।
কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ভেনেজুয়েলার এখনকার নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খুবই ভালো।
“রদ্রিগেজের নিজের স্বার্থও যে আমাদের মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ওয়াশিংটন তা বিশ্বাস করে,” বলেছেন তিনি।
হাভানার কমিউনিস্টশাসিত সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিস্তৃত কৌশল রয়েছে, তার অংশ হিসেবেই তারা কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্কে ছেদ ঘটাতে চাইছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ওয়াশিংটন কিউবায় ভেনেজুয়েলার তেল পাঠানোতেও অবরোধ দিয়ে রেখেছে, যা ক্যারিবীয় দ্বীপটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।
“যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিউবার সঙ্গে কথা বলছে, দেশটির নেতাদের একটি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত,” বলেছেন ওই কর্মকর্তা।
তেল অবরোধের নিন্দা এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ প্রতিহতের অঙ্গীকার করা কিউবার সরকার বলেছে, তারা সমান শর্তে সংলাপে বসতে রাজি।
এসব বিষয়ে রয়টার্স মন্তব্য চাইলেও কিউবা বা ভেনেজুয়েলার সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। দুই দেশ অবশ্য প্রকাশ্যে তাদের সম্পর্ক আরও মজবুত করার অঙ্গীকার নিয়মিতই ব্যক্ত করে যাচ্ছে।
সাবেক এক মার্কসবাদী গেরিলার মেয়ে রদ্রিগেজ ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মাদুরোর দীর্ঘদিনের মিত্র এবং ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট পার্টির প্রভাবশালী সদস্য। তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবেও কিউবা সরকারের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, বলেছে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সূত্র।
কারাকাসে গত ৮ জানুয়ারি মার্কিন হামলায় নিহতদের ফুল দিয়ে স্মরণের এক অনুষ্ঠানেও ডেলসি রদ্রিগেজকে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজের পাশে দেখা গেছে।
“সাহসী ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি আমরা কিউবার গভীরতম সংহতি প্রকাশ করছি। হাস্তা লা ভিক্তোরিয়া সিয়েম্ফ্রে (সর্বদা বিজয়ের পথে),” কিউবান বিপ্লবের অন্যতম নেতা চে গ্যেভারার কালজয়ী উক্তি উচ্চারণ করে সেদিনের অনুষ্ঠানে এমনটাই বলেছিলেন ব্রুনো রদ্রিগেজ।
জানুয়ারিতেই ফোনে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেলের সঙ্গে কথা বলার পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছিলেন, দুই দেশ ‘একতাবদ্ধ’ রয়েছে।
একই ফোনের পর দিয়াস-কানেল বলেছিলেন, কিউবা ‘ভ্রাতৃত্ববোধের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার অব্যাহত রাখতে’ বদ্ধপরিকর।
“নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে তাদেরকে যে এরকম বিবৃতিতে দিতে হচ্ছে তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোঝেন,” বলেছেন হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা।
কিউবান নিরাপত্তা বাহিনীর সবাই ভেনেজুয়েলা ছাড়ছেন?
কিউবার সরকারের চিন্তা-ভাবনা সম্বন্ধে অবগত একটি সূত্র বলেছে, জানুয়ারিতে মার্কিন হামলায় আহত সেনারা কিউবায় ফিরে এলেও অন্যরা এখনও ভেনেজুয়েলায় কাজ করে যাচ্ছে। অনেক কিউবান চিকিৎসকও ভেনেজুয়েলায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল স্থগিত ও ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট জটিলতায় ছুটি কাটাতে কিংবা মিশন সমাপ্ত হয়ে যাওয়া চিকিৎসকদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজে বিঘ্ন ঘটেছিল বলে জানুয়ারির শুরুর দিকে জানায় কিউবার রাষ্ট্রপরিচালিত সংবাদ মাধ্যম।
৩ জানুয়ারি মার্কিন হামলার সপ্তাহখানেক পর থেকে সেসব ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়েছে, বলা হয় ওই প্রতিবেদনগুলোতে।
বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত এক মার্কিন সূত্র বলছে, ভেনেজুয়েলায় কিউবানদের উপস্থিতি কমে এলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা পর্যবেক্ষণে ছদ্মপরিচয়ে থাকা অনেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাই দেশটিতে থেকে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জো বাইডেনের আমলে আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোর জোট অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসে (ওএএস) মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা ফ্রাঙ্ক মোরার মতে, রদ্রিগেজ ‘খুবই সাবধানে পা ফেলছেন’।
“পরিস্থিতি শান্ত হওয়া পর্যন্ত, ক্ষমতায় নিজের প্রভাব নিষ্কন্টক হওয়া পর্যন্ত কিউবানদের দূরে রাখতে চাইছেন তিনি, সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে নয়,” বলেছেন তিনি।
কিছু কিউবান সামরিক উপদেষ্টা এখনও ভেনেজুয়েলায় কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্বন্ধে জানেন এমন চারটি সূত্র।
ইউএনইএস নামে পরিচিত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও কিউবান অধ্যাপকরা পড়ানো অব্যাহত রেখেছেন, জানিয়েছেন এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা।
ভেনেজুয়েলায় কিউবান নিরাপত্তা উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা জন পলগা-হেচিমোভিচ বলেছেন, কিউবান গোয়েন্দা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা কারাকাসে এখনও বিদ্যমান, কেননা সেখানো এখনও মাদুরোর অনুগতরাই ক্ষমতায় রয়েছে।
“কিউবানরা মাদুরোকে রক্ষা করতে পারেনি, কিন্তু চাভিস্তা সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে তারাই মূল ভূমিকায় রয়েছে। অভ্যুত্থান ঠেকাতে তারা দুর্দান্ত কাজ করেছে,” বলেছেন মেরিল্যান্ডে মার্কিন নৌ একাডেমির অধ্যাপক পলগা-হেচিমোভিচ।