Published : 18 Mar 2026, 09:39 PM
গেল মাসের শেষদিন থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে।
এ হত্যাকাণ্ডগুলো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হেনেছে, তাও এমন এক যুদ্ধে যা এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, জাহাজ চলাচলের রাস্তায় বিঘ্ন ঘটিয়ে বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ওমানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে তা ইরানে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় আক্রমণ; এর আগে দীর্ঘদিন ধরে এ দুই পক্ষের মধ্যে ছায়া যুদ্ধ চলেছে, এরপর গত বছর জুনে হয়েছে ১২ দিনের সংঘাত।
সেবারের মতো এবারও সংঘাতের প্রথম দিনই ইরানের একাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করে ইসরায়েল; যার মধ্যে আছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও।
তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো যুদ্ধে নিহত ইরানি কর্মকর্তার তালিকায় নামের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছে রয়টার্স।
সর্বোচ্চ নেতা
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে বৈরিতার মধ্যেই ক্ষমতায় নিজের অবস্থান সুসংহত করেছিলেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিজের বাড়ির প্রাঙ্গণেই পরিবারের আরও অনেক সদস্যসহ মারা যান তিনি।
৮৬ বছর বয়সে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া এই নেতার প্রায় ৪ দশকের শাসনকালকে চিহ্নিত করা যাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে অটুট রাখা ও অঞ্চলজুড়ে ইরানের ক্রমাগত প্রভাববৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।
তবে তার শাসনের শেষ দুই দশক পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনায় তেহরানকে প্রায়ই পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কথা ও কূটনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে খুবই প্রভাবশালী সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি আলি লারিজানি ৬৭ বছর বয়সে মঙ্গলবার তেহরানের পারদিস এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান হামলায় তার ছেলে ও এক সহকারীসহ নিহত হন বলে জানিয়েছে ইরানি গণমাধ্যমগুলো।
রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সাবেক এই কমান্ডার ও পরমাণু আলোচনার সময় পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা লারিজানি প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাও ছিলেন। তিনি ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতির আকার দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আরেক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং ইরানের নিরাপত্তা ও পরমাণু নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ আলি শামখানি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় মারা পড়েন।
সাবেক এ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইরানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইরানের যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধেও ইসরায়েল তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল, সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি।
ইসরায়েল মঙ্গলবার রাতে ইরানের গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকেও হত্যা করে। বুধবার ইরান এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে।
শীর্ষ সামরিক কমান্ডার
এবারের যুদ্ধের শুরুর দিনই তেহরানে হামলায় প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার ইন চিফ মোহাম্মদ পাকপৌর নিহত হন বলে জানায় ইরানি গণমাধ্যমগুলো।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে পূর্বসূরী হোসেইন সালামি নিহত হওয়ার পর ইরানের নেতৃত্ব আইআরজিসির শীর্ষ পদে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাকপৌরকে বসিয়েছিলেন।
একইদিন হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও দীর্ঘদিন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা পদে থাকা আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে। বিমান বাহিনীর সাবেক কমান্ডার ও সশস্ত্র বাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদুলরহিম মুসাভিও ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকের সময় হওয়া হামলায় নিহত হন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা পদে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও নিয়মিতি বাহিনীর (আরতেশ) সাবেক প্রধান হওয়ায় তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর শাখাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতেন এবং নিয়মিত বাহিনীগুলো দেখভাল করতেন।
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির খুবই প্রভাবশালী বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো। রেভল্যুশনারি গার্ডের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তাই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অটুট রাখার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন।
এসব নামের বাইরেও এবারের যুদ্ধে ইরান একাধিক ঊর্ধ্বতন আইআরজিসি কর্মকর্তা, সেনা কমান্ডার ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হারিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এদের সিংহভাগই মারা গেছেন ২৮ ফেব্রুয়ারির শুরুর দিককার হামলায়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের জমায়েতকে নিশানা বানিয়েছিল।