২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

ডাইনোসর বিলুপ্তির পরেই পৃথিবীতে বাদুড়ের উদ্ভব ঘটেছিল: গবেষণা

অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর আর সব মহাদেশেই বাদুড়ের বসতি রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর মোট স্তন্যপায়ী প্রজাতির পাঁচ ভাগের এক ভাগের বেশি জুড়েই রয়েছে বাদুড়।

ডাইনোসর বিলুপ্তির পরেই পৃথিবীতে বাদুড়ের উদ্ভব ঘটেছিল: গবেষণা

উড়তে পারে কেবল তিনটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর দলের একটি হচ্ছে বাদুড়। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Sep 2026, 01:48 PM

Updated : 26 Sep 2026, 01:48 PM

বর্তমানে পৃথিবীতে দেড় হাজারেরও বেশি প্রজাতির বাদুড় রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এতদিন এদের বিবর্তনীয় ইতিহাস কিছুটা রহস্যময় ছিল।

বিশ্বের বাস্তুতন্ত্রে বাদুড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছপালা পরাগায়ন, বীজ ছড়ানো ও অনেক পরিমাণে পোকামাকড় খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে উড়তে পারে কেবল তিনটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর দলের একটি হচ্ছে বাদুড়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাদুড়ের জিনোম ও জীবাশ্ম নিয়ে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় যৌথ গবেষণার মাধ্যমে এই রহস্য কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে বকলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

গবেষণার ফলাফলে ইঙ্গিত মিলেছে, ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার পর সংঘটিত গণবিলুপ্তির ঠিক পরপরই আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে ইউরোপে প্রথম এ উড়ুক্কু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উদ্ভব ঘটেছিল। এরপর এরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে ধারণা করা হত, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া বা আফ্রিকায় বাদুড়ের প্রথম উৎপত্তি হয়েছিল।

গবেষকরা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত বাদুড়ের উচ্চমানের জিনোমের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ একত্র করেছেন, যেখানে স্বীকৃত ২১টি পরিবারের ১০৩টি প্রজাতির বাদুড় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদের বিবর্তনীয় ইতিহাস উদ্ঘাটন ও পূর্ণাঙ্গ ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে তারা এ ডেটাকে বাদুড়ের ৪৪টি জীবাশ্ম বিশ্লেষণের সঙ্গে যোগ করেছেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, ওড়ার সক্ষমতার মতো ইকোলোকেশন বা সোনার পদ্ধতি, যা ব্যবহার করে অনেক বাদুড় অন্ধকারে পথ চলে ও উড়ন্ত শিকার ধরে তা-ও বাদুড়ের বিবর্তনের একদম শুরুর দিকেই বিকশিত হয়েছিল।

এ সপ্তাহে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।

গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও স্কটল্যান্ডের ‘সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটি’র জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সোনজা ভার্নেস বলেছেন, “আমার মনে হয়, ওড়ার সক্ষমতা ও ইকোলোকেশন উভয় সুবিধাই নতুন কোনো ক্ষেত্রে প্রবেশ করার দারুণ সুযোগ করে দেয়।

“যেমন, রাতে যখন প্রতিযোগিতা ও শিকারিও কম থাকে তখন শিকার করা সহজ হয়। ওড়ার সক্ষমতা এদের আকাশে নিয়ে গেছে, আর ইকোলোকেশন তাদের রাতের রাজত্ব উপহার দিয়েছে।”

এ গবেষণার আরেক প্রধান গবেষক ও ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন’-এর প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক এমা টিলিং বলেছেন, “ইকোলোকেশন বাদুড়কে নিশাচর হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। ফলে এদের পক্ষে পাখির সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করেই বা দিনের বেলায় সক্রিয় পাখিদের শিকার হওয়া থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।”

গবেষণায় দেখা গেছে, আজ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বড় গ্রহাণু আঘাত হানার প্রায় ১০ লাখ বছর পর ইউরোপে প্রথম বাদুড়ের আবির্ভাব ঘটেছিল।

ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলেই স্তন্যপায়ী প্রাণীরা পৃথিবীর প্রধান ভূ-চারী প্রাণীতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়।

গবেষণার আরেক প্রধান গবেষক ও ‘নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি’র স্টনি ব্রুক ক্যাম্পাসের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী লিলিয়ানা দাভালোস বলেছেন, এর কিছুদিন পরেই বাদুড় আফ্রিকায় পৌঁছে যায়, যা দুটি মহাদেশকে আদিম বাদুড় বিবর্তনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করে।

অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর আর সব মহাদেশেই বাদুড়ের বসতি রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর মোট স্তন্যপায়ী প্রজাতির পাঁচ ভাগের এক ভাগের বেশি জুড়েই রয়েছে বাদুড়।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সবচেয়ে পুরনো বাদুড়ের জীবাশ্মগুলোর বয়স প্রায় ৫ কোটি ২০ বছর। জিনোম ও শারীরিক গঠনের ডেটা বিশ্লেষণ করেই বাদুড়ের উৎপত্তির এই সঠিক সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

পাখি ও টেরোসর

পাখির পাশাপাশি ‘টেরোসর’ নামের উড়ুক্কু সরীসৃপ দলটির সঙ্গে যোগ হয়ে বাদুড়ও একমাত্র মেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওড়ার সক্ষমতা পেয়েছে।

গ্রহাণুর আঘাতের পর পাখি বেঁচে গেলেও টেরোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ধারণা করা হয়, টেরোসরদের বিলুপ্তিই নতুন একদল উড়ুক্কু মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্য ফাঁকা প্রাকৃতিক আবাসস্থলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল।

পাখি বা টেরোসরদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামোর ওপর তৈরি বাদুড়ের ডানা রূপান্তরিত অগ্রপদ, যেগুলোর দীর্ঘ আঙুল বড় এক চর্মঝিল্লিকে ধরে রাখে। তবে বাদুড়ের পূর্বপুরুষরা দেখতে কেমন ছিল তা এখনও রহস্য।

এ বিষয়ে অধ্যাপক টিলিং বলেছেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না তবে আমার ধারণা এরা দীর্ঘ আঙুল গজাতে শুরু করা গাছপালাবাসী শ্রু প্রাণীর মতো দেখতে ছিল। এটা কেবল অনুমান, কারণ পুরনো সব জীবাশ্মই আধুনিক বাদুড়ের মতো দেখতে।”

এ ছাড়া ওড়ার সক্ষমতা নাকি ইকোলোকেশন কোনটি আগে বিকশিত হয়েছিল তা-ও এখনও স্পষ্ট নয়। বাদুড় উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির আল্ট্রাসনিক শব্দ তৈরি করে ও বস্তু থেকে ফিরে আসা প্রতিধ্বনি শুনে আশপাশের পরিবেশের মানচিত্র তৈরি করতে ইকোলোকেশন ব্যবহার করে।

প্রাণীর কক্লিয়ার বিবর্ধন ও কানের ভেতরের বিশেষ কাঠামোর মতো শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য দেখে জীবাশ্মেও এ সক্ষমতার প্রমাণ মেলে।

টিলিং বলেছেন, “আমাদের সবচেয়ে পুরনো বাদুড়ের জীবাশ্মগুলোতে ওড়া ও ইকোলোকেশন উভয় ক্ষমতাই দেখা গেছে, যা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করে না।

“আমাদের সবচেয়ে পুরনো ‘প্রাক-বাদুড়’ বা রূপান্তরকালীন জীবাশ্ম খুঁজে বের করে দেখতে হবে, সেগুলোতে ওড়ার বা ইকোলোকেশনের কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল কি না।”

অনেক বাদুড় প্রজাতি আবার রোগব্যাধির বিরুদ্ধে অসাধারণ প্রতিরোধ সক্ষমতা দেখায় ও এদের আকারের তুলনায় ব্যতিক্রমীভাবে দীর্ঘ জীবন পায়। গবেষণাটি এসব বৈশিষ্ট্যের জিনগত ভিত্তি নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার পথ প্রশস্ত করেছে।

গবেষক টি বারেন বলেছেন, “এ গবেষণা একদিন বার্ধক্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত মানব গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

বর্তমান বিশ্বে নানা আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের বাদুড় দেখা যায়, যাদের খাবার ও জীবনযাত্রার ধরনও আলাদা। এর মধ্যে ফিলিপিন্সের জায়ান্ট গোল্ডেন-ক্রাউন ফ্লাইং ফক্স হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাদুড়, যার ছড়ানো ডানা সাড়ে ৫ ফুট পর্যন্ত হয়।

থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের বাম্বি বাদুড় হচ্ছে সবচেয়ে ছোট, যার ডানার বিস্তার প্রায় ৫ ইঞ্চি। অধিকাংশ বাদুড়ই পোকামাকড়ভোজী। অন্যরা ফল, ফুলের মধু, মাছ খায়। আর ভ্যাম্পায়ার শ্রেণির বাদুড় রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে।

ঘোড়াশাল বাদুড়, পাতা-নাকওয়ালা বাদুড়, ইঁদুর-লেজওয়ালা বাদুড়, ত্রিশূল বাদুড়, ভূত-মুখো বাদুড়, মোচওয়ালা বাদুড়, চোষক-পায়ে বিশিষ্ট বাদুড়, হাতুড়ি-মাথা বাদুড় ও কুঁচকানো-মুখো বাদুড়ের মতো হরেক রকমের বৈচিত্র্য রয়েছে এদের মধ্যে।

অধিকাংশ গবেষক বলেছেন, “বাদুড় আমাদের প্রতিনিয়ত অবাক করে। এরা বিবর্তনের অন্যতম সেরা পরীক্ষা।”