যেভাবে নিউট্রিনো ধরার নতুন পথ দেখিয়ে নোবেলজয়ী হালসেন
দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে বিশাল পর্যবেক্ষণকেন্দ্র বানিয়ে মহাবিশ্বের উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ খুলেছেন ফ্রান্সিস হালসেন।
দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র এক আলোর ঝলক কীভাবে মহাবিশ্বের দূরবর্তী প্রান্তের খবর দিতে পারে, সেই পথ দেখিয়েছেন ফ্রান্সিস হালসেন। এই কাজের স্বীকৃতিতেই চলতি বছরের পদার্থবিদ্যার নোবেল পেয়েছেন বেলজিয়ান-আমেরিকান এই কণা পদার্থবিদ।
হালসেনের মূল ধারণাটি ছিল, দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল বরফকে বিশাল এক নিউট্রিনো শনাক্তকারী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এর এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে নোবেল কমিটির প্রকাশ করা বিজ্ঞপ্তিতে।
নোবেল কমিটির ভাষায়, আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে তার নির্ণায়ক অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
শুরু যে ভাবনা থেকে
নিউট্রিনো এমন এক ধরনের অতি ক্ষুদ্র কণা, যা প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই সহজে মিথস্ক্রিয়া করে না। অসংখ্য নিউট্রিনো প্রতিনিয়ত পৃথিবী ও আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যায়, কিন্তু আমরা তা বুঝতেই পারি না।
তবে খুবই বিরল ক্ষেত্রে একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর কেন্দ্রকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। তখন তৈরি হয় সামান্য আলোর ঝলক। উপযুক্ত সেন্সর দিয়ে সেই আলো শনাক্ত করা গেলে নিউট্রিনোর উপস্থিতি জানা সম্ভব।
হালসেন ১৯৮৮ সালে প্রথম দক্ষিণ মেরুতে এই পদ্ধতিতে নিউট্রিনো শনাক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তার ভাবনা ছিল, বরফের ভেতরে সেন্সর বসিয়ে নিউট্রিনোর তৈরি করা আলোর ঝলক শনাক্ত করা যেতে পারে।
দক্ষিণ মেরুর বরফ এ কাজের জন্য কয়েকটি সুবিধা দেয়। বরফ অত্যন্ত স্বচ্ছ হওয়ায় আলোর ঝলক শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ কম এবং এলাকাটি ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল। সেখানে ভূমিকম্পও হয় না।
হালসেনের পরিকল্পনা অন্য গবেষকদেরও আগ্রহী করে তোলে। কয়েক বছরের মধ্যেই বরফের মধ্যে সেন্সর বসিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর সেই ধারণা থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে বিশাল আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
কেন এত বড় পর্যবেক্ষণকেন্দ্র দরকার
মহাবিশ্ব থেকে আসা অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো খুবই বিরল। তাই একটি বা কয়েকটি সেন্সর দিয়ে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন। পর্যাপ্ত সংখ্যক নিউট্রিনোর সঙ্গে পরমাণুর সংঘর্ষ ধরতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বরফ।
এই প্রয়োজন থেকেই আইসকিউবকে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে তৈরি করা হয়। বরফের গভীরে বসানো হয় অসংখ্য আলোক শনাক্তকারী সেন্সর। এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালে।
এরপর হালসেনের পরিকল্পনা বাস্তবে ফল দিতে শুরু করে। গবেষকেরা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে থাকেন। কয়েক বছর পর তারা নিউট্রিনোর এমন তথ্য প্রকাশ করেন, যেগুলো আমাদের সৌরজগতের অনেক দূরের মহাজাগতিক উৎস থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অন্য একটি কারণে। মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক কণা উৎস থেকে কণাগুলো বিপুল শক্তি নিয়ে ছুটে আসে। এসব উৎস কোথায় এবং সেখানে ঠিক কী ধরনের প্রক্রিয়া চলছে, তার অনেকটাই এখনো রহস্য।
উচ্চশক্তির নিউট্রিনো সেই রহস্য উন্মোচনে বিশেষভাবে কার্যকর। অন্য অনেক কণার মতো নিউট্রিনো চলার পথে দিক পরিবর্তন করে না বা শক্তি হারায় না। ফলে যে জায়গায় নিউট্রিনো তৈরি হয়েছে, সেখানকার তথ্য প্রায় সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছে দিতে পারে এটি।
নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ
আইসকিউবের মাধ্যমে পাওয়া এসব নিউট্রিনোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের কোন ধরনের ভয়াবহ পরিবেশে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো তৈরি হয়, তা বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের পুরোনো কিন্তু অজানা ঘটনাও সামনে আসতে পারে।
পদার্থবিদ্যার নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স বলেন, “ফ্রান্সিস হালসেন গবেষক ও প্রকৌশলীদের একটি আন্তর্জাতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা আমাদের একটি অসাধারণ যন্ত্র দিয়েছেন। তার অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি নতুন ধরনের পথ তৈরি করেছে।”
অর্থাৎ, হালসেনের নোবেল শুধু একটি নিউট্রিনো শনাক্তের জন্য নয়। কয়েক দশক আগে দক্ষিণ মেরুর বরফ নিয়ে করা একটি বৈজ্ঞানিক ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়া এবং সেই যন্ত্রের মাধ্যমে মহাবিশ্বের দূরবর্তী উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ তৈরিই তাকে এই স্বীকৃতির জায়গায় নিয়ে এসেছে।
