বিশ্বে ‘প্রথম’ এআই এজেন্ট এবার হ্যাকিং চালাল সরকারি সাইটে
“এই অননুমোদিত অ্যাক্সেস বা প্রবেশাধিকার নিয়েই আমরা উদ্বিগ্ন। এর সার্বিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হলেও ঘটনাটি গুরুতর।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যেই ওপেনএআইয়ের তৈরি এআই এজেন্ট অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এক পোর্টালে হ্যাকিং চালিয়েছে, যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম কোনো সরকারি সংস্থায় এআই হ্যাকিংয়ের ঘটনা।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওই স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের ঘটনার কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবেনিজ।
বুধবার নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গেল জুনে ‘সার্ভিসেস অস্ট্রেলিয়া’ পরিচালিত ‘মেডিকেয়ার পোর্টাল’-এর উন্মুক্ত ও গোপন উভয় ধরনের ডেটাতেই অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিল ওই এআই এজেন্টটি।
ওই সময় এআই এজেন্টটি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মারলেস বলেছেন, গবেষণার অংশ হিসেবে এজেন্টটি আরও তিনটি অস্ট্রেলীয় ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছিল এবং সেগুলোর সঙ্গে ‘একজন নাগরিক যেভাবে যোগাযোগ করে’ সেভাবেই অনুমোদিত উপায়ে কথা বলেছিল।
মেডিকেয়ার পোর্টাল থেকে তথ্য চাওয়ার পর সিস্টেম তা দিতে যখন অস্বীকৃতি জানায় ‘তখন এআই এজেন্টটি কার্যত সেই মেডিকেল পোর্টালটি হ্যাক করে ও যেভাবেই হোক সেই তথ্য সংগ্রহ করেছে’।
“এই অননুমোদিত অ্যাক্সেস বা প্রবেশাধিকার নিয়েই আমরা উদ্বিগ্ন। এর সার্বিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হলেও ঘটনাটি গুরুতর।”
প্রধানমন্ত্রী আলবেনিজ বলেছেন, ঘটনার কয়েক মাস পর গত ১০ সেপ্টেম্বর পাবলিক মেইলবক্সে ইমেল পাঠিয়ে ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়া সরকারকে জানায় ওপেনএআই।
সরকারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ করতে কোম্পানির এত দীর্ঘ সময় নেওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মারলেস।
প্রধানমন্ত্রী আলবেনিজ বলেছেন, “আজ আমি ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি ও এ ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার চরম উদ্বেগের কথা তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছি।”
পাশাপাশি, সরকারকে পুরো বিষয়টি জানাতে কোম্পানির ‘অনেক দেরি হয়েছে’ বলেও অল্টম্যানকে বলেছেন তিনি।
বিবৃতিতে ওপেনএআই বলেছে, তারা ঘটনাটি এখনও তদন্ত করে দেখছে। তবে এখন পর্যন্ত রোগীর কোনো ব্যক্তিগত রেকর্ডে প্রবেশ করা হয়েছে– এমন কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।
কোম্পানিটির প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু সরকারি ওয়েবসাইট ও পরিষেবা থেকে তাদের ‘বিভিন্ন মডেল উত্তর খোঁজার চেষ্টা করার সময়’ এ ঘটনা ঘটেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটে এআইয়ের অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনায় সরকারি সফটওয়ার নেটওয়ার্কে বড় কোনো আপস বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবেনিজ।
তবে এ বিষয়ে তদন্ত এখনও অব্যাহত রয়েছে।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কানাডা, স্পেন ও জার্মানিসহ ২১টি দেশের সঙ্গে মিলে উন্নত এআই মডেলের ওপর ‘জরুরি বৈশ্বিক সুরক্ষা বলয়’ বা গার্ডরেল তৈরির আহ্বান জানিয়ে যৌথ এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করার একদিনের কম সময়ের মধ্যেই এ তথ্য প্রকাশ করলেন আলবেনিজ।
বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতারা অনিয়ন্ত্রিত এআই বিকাশের ভয়াবহ বিপদ নিয়ে সতর্ক করেছেন।
ও বিষয়টিকে ‘অভিনব হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করে কানাডীয় গবেষক ও ‘এআই গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত ও স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেলের সহ-সভাপতি ইয়োশুয়া বেঞ্জি বলেছেন, এআইয়ের ‘বিপদগুলো বাস্তব ও আসন্ন’।
জাতিসংঘে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বৈঠকে বলেছেন, বেইজিংয়ের মতে এআইয়ের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ধারাবাহিক উন্নতি, জরুরি প্রতিক্রিয়া ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জরুরি।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাজ্য।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সাধারণ পরিষদের ভাষণে এআই সংক্রান্ত বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত সুর শোনা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মুখে। মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এআইয়ের ওপর নতুন কোনো নিয়ন্ত্রণের বিরোধী ও প্রয়োজন হলে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই এতে হস্তক্ষেপ করবে।
ট্রাম্প বলেছেন, “আমরা বিচার বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টির ওপর নিবিড় নজর রাখব।”
তিনি এআইয়ের বিপদ সম্পর্কিত সাম্প্রতিক সতর্কবাণীগুলোকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, “শিল্প বিপ্লবের চেয়েও বড় হতে যাওয়া কোনো বিষয়ের বিকাশকে আমি গলা টিপে হত্যা করব না।”
তিনি বলেছেন, মার্কিন সরকারের নথিপত্রগুলোতে এখন থেকে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স শব্দটি ব্যবহার করা হবে।
হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা মাইকেল ক্র্যাটসিওস নিরাপত্তা পরিষদের বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন, “যে প্রযুক্তি আপনি বোঝেন না তা আপনি শাসন করতে পারবেন না।
“এই সংস্থা ও এর মতো অন্যান্য কোম্পানির উচিত ঘরোয়া সক্ষমতা বাড়াতে সর্বোত্তম অনুশীলনগুলো শেয়ার করার দিকে মনোযোগ দেওয়া, কোনো বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো তৈরি করা নয়।”
