১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রযুক্তির বিবর্তনে জাপানে হারিয়ে যাচ্ছে আইকনিক ফ্লিপ ফোন

এগুলোর নান্দনিকতাও ছিল আকর্ষণীয়; উজ্জ্বল রং ও বিদেশি চাবির রিং ঝোলানোর সুবিধাও ছিল এসব ফোনে।

প্রযুক্তির বিবর্তনে জাপানে হারিয়ে যাচ্ছে আইকনিক ফ্লিপ ফোন

গারা-কেই ফোনের সঙ্গে জাপানি সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ছবি: এআই

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 13 Oct 2026, 02:47 PM

Updated : 13 Oct 2026, 02:47 PM

গেল কয়েক বছরে ফ্লিপ ফোন বা ভাজ করা যায় এমন মোবাইল আর আগের মতো দেখা যায় না। পুরানো মোটোলা ও রজার বা ক্ল্যামশেল ডিজাইনের সেই সোনালী দিনগুলো এখন অতীত।

তবে জাপানের এক অনন্য ও স্বকীয় প্রযুক্তিগত পরিবেশের কারণে সেখানে এসব ফোন দশকের পর দশক ধরে টিকে ছিল।

প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘গারা-কেই’ বা ‘গ্যালাপাগোস কেইতাই’ হচ্ছে জাপানের সেই অদ্ভুত ফিচার ফোন, যেগুলোতে বোতামওয়ালা কিবোর্ড রয়েছে।

বড় পর্দার স্মার্টফোনের যুগেও এগুলো সহজে হার মানেনি। ‘গ্যালাপাগোস’ বলতে প্রশান্ত মহাসাগরের সেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘কেইতাই’ মানে ‘পোর্টেবল’ বা বহনযোগ্য।

একসময় জাপানের মোবাইল অপারেটররা এসব হ্যান্ডসেট এত পরিমাণে বিক্রি করেছিল যে, কিওসারার মতো ব্র্যান্ডগুলো ক্ল্যামশেল ডিজাইনের সঙ্গে অ্যান্ড্রয়েড ও ফোরজি সংযোগ যোগ করে ‘গারাহো’ হাইব্রিড ফোন তৈরি করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

তবে ভোক্তাদের অভ্যাসে এখন পরিবর্তন আসছে। জাপানে ‘ডোকোমো’র এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালে মোবাইল ব্যবহারকারীদের ৯০ শতাংশের হাতে ছিল স্মার্টফোন ও ২০২৫ সালের মধ্যে সেই হার দাঁড়ায় ৯৮ শতাংশে।

গবেষণা কোম্পানি ‘এমএম রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের প্রথম অর্ধবার্ষিকীতে দেশটির ফিচার ফোনের চালান ২৫ শতাংশেরও বেশি কমে চার লাখ ইউনিটের নিচে নেমে এসেছে।

এ বছরের মার্চে দেশটির বাকি থাকা থ্রিজি ডেটা পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ধীরগতির পতন আরও দ্রুততর হওয়ার মুখে রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী এসব ‘গারা-কেই’ ফোন কেন ও কীভাবে বিলুপ্তির পথে পা বাড়াল?

জাপানে ফ্লিপ ফোন কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল?

অনেকের মতে, গারা-কেই ফোনের সঙ্গে জাপানি সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য বাজারের জন্য তৈরি সাধারণ ফ্লিপ ফোনের তুলনায় এগুলোর বৈশিষ্ট্য উন্নত ছিল।

টেকসই বডি ও চমৎকার ট্যাকটাইল কিবোর্ডের পাশাপাশি এসব ফোনের অনেকগুলোতেই ‘ওয়ান-সেগ’ টিভি সম্প্রচার দেখা যেত ও অ্যাপলের নেমড্রপ-এর বহু আগেই ইনফ্রারেড ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে কনট্যাক্ট বা যোগাযোগের তথ্য শেয়ার করা যেত।

এ ছাড়া, এগুলোর নান্দনিকতাও ছিল আকর্ষণীয়; উজ্জ্বল রং ও বিদেশি চাবির রিং ঝোলানোর সুবিধাও ছিল এসব ফোনে।

অধিকাংশ গারা-কেই ফোনে থ্রিজি সমর্থন ছিল, যা কম ডেটা খরচ করে এমন হালকা অ্যাপগুলোর জন্য উপযোগী। এতে থাকা এমবেডেড চিপের সাহায্যে ট্রেনের ভাড়া ও মুদি দোকানের বিল পরিশোধ করা যেত।

এসব কারণে কম খরচের চুক্তিতে পাওয়া এসব ফোন জাপানে জীবনযাত্রার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানিও নস্টালজিয়া বা পুরনো দিনের স্মৃতির প্রতি আকর্ষণ ও জেন-জি প্রজন্মের ফ্লিপ ফোনের প্রতি ঝোঁককে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

আসছে নতুন ‘লাইট ফ্লিপ’ কোনো গারা-কেই ফোন না হলেও এটা এমন ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে তৈরি, যারা বিভ্রান্তিমুক্ত একটি ফ্লিপ ফোনের অভিজ্ঞতা চান।

কিওসারা ও শার্পের ঐতিহ্যবাহী গারা-কেই ফোনগুলো ইবে’র মতো অনলাইন স্টোরে কেনার জন্য পাওয়া যায়। তবে এগুলোর বেশিরভাগেরই আমেরিকার নেটওয়ার্ক ক্যারিয়ারগুলোর সঙ্গে কাজ করার মতো সঠিক ফোরজি এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যান্ড নেই।

জাপানে কেন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে ফ্লিপ ফোন?

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের তথ্য অনুসারে, জাপানে ডোকোমো’র থ্রিজি মোবাইল ইন্টারনেট বা ‘আই-মোড’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক ও চার শতাধিক ফোন মডেল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ সিদ্ধান্তের ফলে কেবল মোবাইল ফোনই নয়, বরং জাপানের গাড়ি ন্যাভিগেশন সিস্টেম ও বিভিন্ন ভেন্ডিং মেশিনের কার্যক্রমও ব্যাহত হবে।

এর আগে, যথাক্রমে ২০২২ ও ২০২৪ সালে ‘এইউ’ ও ‘সফটব্যাংক’ তাদের থ্রিজি সেবা বন্ধ করে দিয়েছিল। এবার ডোকোমোর এই ঘোষণা ‘গারা-কেই’ বা ঐতিহ্যবাহী ফ্লিপ ফোনের ভাগ্যে চূড়ান্ত ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।

জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা এই পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি বড় কারণ।

‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে দেশটির জনসংখ্যার ২৯ শতাংশেরই বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার বেশি। ফলে এমন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, যা বয়স্ক নাগরিকদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

এ ছাড়া, বয়স্কদের মধ্যে হাজার হাজার ‘একাকী মৃত্যু’ বা ‘লোনলি ডেথ’-এর ঘটনা হয়ত সেলুলার প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জাপানের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।

প্রযুক্তিগত শিক্ষার হার বাড়াতে ‘জাপান টুডে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোকিও প্রশাসন ২০২১ সালে প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে তিন হাজার স্মার্টফোন বিতরণ করেছিল।

এদিকে, জেন-জি প্রজন্মের কিছু ব্যবহারকারী মনোযোগের পরিধি বাড়াতে ফিচার ফোনের দিকে ঝুঁকলেও ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাইলে তাদের অনেকেরই শেষ পর্যন্ত স্মার্টফোনেই ফিরে যেতে হবে।

ডোকোমো এই অনিবার্য পরিবর্তনকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে ও দোকানে বসেই স্মার্টফোন ব্যবহারের নিয়ম শেখানোর জন্য বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করছে।

ওয়েব ব্রাউজিং ও স্পর্শভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের এই পাঠ নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি বা ‘ডুমস্ক্রোলিং’-এর কবলে পড়ার ও পকেটের এসব ছোট কম্পিউটারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থেকেই যায়।

তবে এর মধ্য দিয়ে জাপানে এমন এক প্রজন্মের যুগ সমাপ্তি ঘটছে, যারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একসময় ফিচার ফোনের বোতাম ছুঁয়েই বড় হয়েছিল।