Published : 02 Sep 2026, 05:36 PM
মহাবিশ্বের সিংহভাগ জুড়ে থাকা অদৃশ্য ও অধরা পদার্থ ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেতের দেখা পাওয়ার দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
তাদের দাবি, রহস্যময় এক কণার মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন শনাক্তের মাধ্যমে এ ইঙ্গিত পেয়েছেন তারা, যা অধরা এ পদার্থের অস্তিত্ব প্রমাণের পাশাপাশি তা অনুসন্ধানের পথ খুলে দিতে পারে।
প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা পাওয়া ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ৮৫ শতাংশ দখল করে রয়েছে।
একাধিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়েক দশক ধরে সংকেত খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরাসরি এর কোনো অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর তাই, এমন ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
গবেষণায় একটি মাত্র কণার মিথস্ক্রিয়া রেকর্ড করেছেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণ পদার্থের পরিচিত বিভিন্ন সংকেত বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এ মিথস্ক্রিয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি।
আবিষ্কারের পেছনে থাকা বিজ্ঞানীরা বলছেন, একক প্রাপ্তিটি এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো আবিষ্কার হিসেবে ঘোষণার পরিসংখ্যানগত সীমারেখায় পৌঁছায়নি। তবে তা ডার্ক ম্যাটার গবেষণায় এক চোখধাঁধানো অগ্রগতিরই ইঙ্গিত দিয়েছে।
ডিটেক্টরের ভেতরে শক্তির বিনিময়ের ফলে তৈরি আলোর ঝলকানি বা বিশেষ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেই ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করার চেষ্টা চালায় এলজেড
এ সাফল্য পেয়েছে যুক্তরাজ্যের নয়টি ইউনিভার্সিটিসহ ছয়টি দেশের ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের ২৫০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর আন্তর্জাতিক যৌথ দল।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের অধীনে ‘লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি’ পরিচালিত বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ডার্ক ম্যাটার ডিটেক্টর ‘লাক্স-জেপ্লা’ বা এলজেড-এর সংগৃহীত তথ্য টানা দুই বছর ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন গবেষকরা।
এলজেড-এর সংগৃহীত ডেটা থেকে কণার যে মিথস্ক্রিয়াটি মিলেছে তা ‘উইম্প’ বা ‘উইকলি ইন্টারঅ্যাক্টিং ম্যাসিভ পার্টিকেল’-এর কারণে হয়ে থাকতে পারে। এ উইম্প’কেই ডার্ক ম্যাটারের অন্যতম সম্ভাব্য কণা বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টল’-এর ড. স্যাম এরিকসন বলেছেন, “বিজ্ঞানীরা প্রায় এক শতাব্দী ধরে মহাবিশ্বের সিংহভাগ গঠনকারী ডার্ক ম্যাটারকে বোঝার চেষ্টা করছেন। আমরা এ বিশ্লেষণে যা প্রত্যক্ষ করেছি তা কণা হিসেবে ডার্ক ম্যাটারকে বোঝার ক্ষেত্রে প্রথম ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে।”
ড. এরিকসন বলেছেন, “দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার পর পাওয়া এ ফল সত্যিই রোমাঞ্চকর।”
জাপানে অনুষ্ঠিত ‘২০২৬ টিইভি পার্টিকেল অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’ সম্মেলনে বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনার মাধ্যমে এ পর্যবেক্ষণের তথ্য তুলে ধরেছেন ড. এরিকসন।
গবেষণাটি এখন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের বিস্তর পর্যালোচনার জন্য খোলা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক এক সাময়িকীতে প্রকাশের জন্য জমা পড়েছে।
‘ব্রাউন ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক রিক গেটস্কেল বলেছেন, “আমাদের তথ্যে এমন এক স্থানে আমরা ঘটনাটি দেখতে পেয়েছি, যেখানে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি পাওয়ার কথা ও অন্য কোনো সাধারণ সিগনালের প্রভাব খুবই কম। বিষয়টি আমাদের আগ্রহী করে তুলেছে।
“তবে মাত্র একটি ঘটনা দেখে আমরা আগবাড়িয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। আমরা ডার্ক ম্যাটার দেখেছি– এমন দাবি করছি না। তবে আমরা কৌতূহল উদ্দীপক একটি বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি, যা অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতামতের জন্য আমরা উন্মুক্ত করে দিতে চাই।”
ডিটেক্টরের ভেতরে শক্তির বিনিময়ের ফলে তৈরি আলোর ঝলকানি বা বিশেষ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেই ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করার চেষ্টা চালায় এলজেড।
সাধারণ পদার্থ দিয়ে তৈরি অন্য কোনো কণা যেন এই ডিটেক্টরে ভুল সংকেত তৈরি করতে না পারে সেজন্য একাধিক কৌশল নিয়েছে গবেষক দলটি।
মহাজাগতিক রশ্মি এড়াতে ভূপৃষ্ঠের প্রায় এক মাইল গভীরে পাথরের স্তরে যন্ত্রটি বসানো হয়েছে। পাশাপাশি বাইরের নিউট্রন কণা ঠেকানোর জন্য রয়েছে বড় পানির ট্যাংক ও আউটার ডিটেক্টর।
এ ছাড়া কৃত্রিম সিগনাল ও ভুল সংকেত বাদ দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ গণনামূলক সফটওয়্যার। ১০ টন বিশুদ্ধ তরল জেনন ব্যবহার করে পরিচালনা করা এ পরীক্ষাটি এখনও চলমান রয়েছে, যা ‘উইম্প’ কণা খোঁজার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি।
রহস্যময় ঘটনাটি সত্যিই ডার্ক ম্যাটারের কারণে ঘটে থাকলে যে উইম্প কণাটি এটা তৈরি করেছে তার ভর হবে ২০০ গিগাইলেক্ট্রন ভোল্ট, যা একটি প্রোটনের ভরের প্রায় দুইশো গুণ বড়।
পাশাপাশি তা ‘উইম্প’ ও সাধারণ পদার্থের মধ্যকার আন্তঃক্রিয়া সম্পর্কে আগের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে।
পদার্থবিজ্ঞানের কোনো ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আবিষ্কার’ হিসেবে ঘোষণা করতে যে গাণিতিক নিশ্চিতকরণ বা ‘৫-সিগমা’ মানের নির্ভরযোগ্যতা প্রয়োজন হয় এলজেডের ফলাফল এখনও সেই মানদণ্ডে পৌঁছায়নি।
বর্তমানে নতুন বিশ্লেষণটি ‘২.৬ সিগমা’ মানে অবস্থান করছে, যার মানে ঘটনাটি চেনা কোনো সাধারণ সিগনাল দিয়ে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনা শতকরা কেবল ০ দশমিক ৫ ভাগ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আরও নতুন ডেটা পাওয়া গেলে গবেষণার ফলাফল কি আরও দৃঢ় হবে নাকি তা মিলিয়ে যাবে এমনটা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।