Published : 21 Dec 2025, 12:02 PM
চীনের অনলাইন মার্কেটপ্লেস ডোউইনে জ্যান্ত কাঁকড়া বিক্রি করেন গাও জিং। নভেম্বরে তার কাছে এক ক্রেতা ছবি পাঠান। সেই ছবি অনুসারে, বেশিরভাগ কাঁকড়া নাকি আগেই মারা গেছে, দু’টি আবার পথেই পালিয়েও গেছে।
ছবির সঙ্গে বাড়তি প্রমাণ হিসাবে একটি ভিডিও ফাইলও আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে আঙুল দিয়ে মৃত কাঁকড়া নাড়ানোর দৃশ্য। কিন্তু গাও জিংয়ের চোখে খটকা। কী যেন ঠিক মিলছে না।
তিনি বলেন, “আমাদের পরিবার ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাঁকড়া চাষ করে। পা আকাশমুখী চিৎ হয়ে থাকা মৃত কাঁকড়া আমরা কখনো দেখিনি।” আরও অদ্ভুত ছিল লিঙ্গের হিসাব। এক ভিডিওতে দুইটি পুরুষ ও চারটি স্ত্রী কাঁকড়া, আরেকটিতে তিনটি করে। একটি কাঁকড়ার আবার পা ছিল নয়টি!
গাও জিং পুলিশে অভিযোগ করেন। তদন্তে ভিডিও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। অনলাইনে শেয়ার করা এক নোটিস অনুযায়ী, অভিযুক্ত ক্রেতাকে আট দিনের জন্য আটকও করা হয়।
চীনা সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, এ ধরনের অসংখ্য এআইভিত্তিক ভুয়া রিফান্ড দাবিতে এই প্রথম আইনের আশ্রয় নিতে পারলেন বিক্রেতা।
চীনের ইকমার্সে রিফান্ড জালিয়াতির নতুন ধরন সামনে এসেছে। এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে পণ্য নষ্ট হওয়ার দাবি তুলে অর্থ ফেরত নিচ্ছে ক্রেতারূপী একদল প্রতারক।

তাজা খাবার, সাজসজ্জার কম দামের পণ্য আর ভঙ্গুর সামগ্রীই এই প্রতারণার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট ওয়্যার্ড।
চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাপ ‘রেডনোটে’ একাধিক বিক্রেতা ও কাস্টমার সার্ভিস কর্মী অভিযোগ তুলেছেন। কেউ বলছেন, কেনা চাদর নাকি টুকরো টুকরো, কিন্তু ছবিতে শিপিং লেবেলের চীনা অক্ষরের মাথামুণ্ড বোঝা দায়। আরেক ঘটনায় কফি মগের ছবিতে ফাটল দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সিরামিক মগের ফাঁটল দেখে চোখ কপালে উঠল বিক্রেতার।
“এটা সিরামিক কাপ, বোর্ড কাগজ নয়। সিরামিক কাপে ফাটলের চেহারা ছেড়া পেপার বোর্ডের মতো হল কীভাবে?”
বিক্রেতারা বলছেন, এমন ভুয়া ক্ষতির ছবি বেশি আসে তাজা মুদিপণ্য, কম দামের সৌন্দর্যপণ্য আর সিরামিক কাপের মতো ভঙ্গুর সামগ্রীতে। এসব ক্ষেত্রে রিফান্ড দিতে গিয়ে অনেক সময় বিক্রেতা আর পণ্য ফেরত চান না। ফলে প্রতারণার সুযোগ বাড়ে।
এই সমস্যা শুধু চীনেই নয়। নিউ ইয়র্কভিত্তিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ কোম্পানি ফোর্টারের হিসাবে, চলতি বছরের শুরু থেকে রিফান্ড দাবিতে এআই দিয়ে বদলানো ছবির ব্যবহার ১৫ শতাংশের ওপরে বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়েই বাড়ছে।
ফোর্টারের প্রধান নির্বাহী মাইকেল রেইটব্লাট বলেন, “২০২৪ সালের মাঝামাঝি এই ধারা শুরু হয়েছে। গত এক বছরে ইমেজ জেনারেশন টুল সহজলভ্য হওয়ায় ভুয়া দাবির গতি বেড়েছে।”
তার মতে, প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে দেখার সময় সামনের সারির কর্মীদের হাতে থাকে না। তাই এআইয়ের সব খুঁত ধরা সম্ভবও হয় না।
রেইটব্লাট বলছেন, সংগঠিত চক্রও এই কৌশল ব্যবহার করছে। এক ঘটনায় ভুয়া ফাটল ও ডেন্ট দেখানো এআই সম্পাদিত ছবির ভিত্তিতে ১০ লাখ ডলারের বেশি রিফান্ড দাবি জমা পড়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবেদনগুলো পাঠানো হয়েছে, সঙ্গে আইপি ঠিকানা বদলে পরিচয় লুকিয়েছে দাবিদার চক্র।
কিছু বিক্রেতা আবার এআই দিয়েই লড়াই করছেন। এক চীনা খেলনা বিক্রেতা দেখান, কীভাবে তারা রিফান্ডের ছবি এআই চ্যাটবট দিয়ে বিশ্লেষণ করান। তবে এই টুলগুলো এখনো নিখুঁত নয়। উপরন্তু, চ্যাটবট সন্দেহজনক লেবেল করলেও প্ল্যাটফর্ম সব সময় বিক্রেতার পক্ষে যায় না। রেইটব্লাটের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মগুলো রিটার্ন নীতিতে কড়াকড়ি আনতে পারে, যা সৎ বিক্রেতাদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।
এর আগে চীনের অনলাইন বাজারের অভিযোগ ছিল একেবারে উল্টা। বিক্রেতারা পণ্যের ছবি এআই দিয়ে তৈরি করছেন বলে ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের ভাষায়, অনলাইনে কেনাকাটা জুয়ার মতো হয়ে গেছে। বাস্তবে যে পণ্য আসে, ছবিতে দেখানো মানের সঙ্গে তার মিল থাকে না।
ভিন্নমুখী দুটো ধারার মূল সমস্যা আসলে একই। ইকমার্সের সাফল্য নির্ভর করে বিশ্বাসের ওপর। এআই সহজলভ্য হওয়ায় সেই বিশ্বাস ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এআই ওয়াটারমার্কের মতো সুরক্ষা সহজেই মোছা যায়।
ফলে, মানুষের জন্য তৈরি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে নতুন যাচাই নিয়ম, বদল বা রিফান্ড নীতি বা এআইনির্ভর প্রতারণার দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন সমাধার বের করতে হবে।