Published : 01 May 2026, 02:13 PM
ডুবে যাওয়া এক প্রাচীন জাহাজের গায়ে লেগে থাকা সামান্য কিছু পরাগরেণু দিয়েছে ইতিহাসের ধারণা। বিজ্ঞানীরা দুই হাজার দুইশ বছরের পুরানো রোমান জাহাজের পানিরোধী প্রলেপ পরীক্ষা করে বের করেছেন এর নির্মাণস্থল ও দীর্ঘ যাত্রাপথ।
এ গবেষণা কেবল জাহাজের রহস্যই নয়, বরং দুই হাজার বছর আগের উন্নত প্রযুক্তি ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রাচীন জীবনযাত্রার এক নতুন দুয়ারও উন্মোচন করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে পপুলার মেকানিক্স।

অনেক মানুষের কাছে পরাগরেণু কেবল বিরক্তিকর অ্যালার্জি তৈরিকারী উপাদান। তবে সাম্প্রাতিক এ গবেষণায় প্রাচীন রোমান জাহাজের পানিরোধী আস্তরণ বা পিচের ভেতরে আটকে থাকা শতাব্দী-প্রাচীন পরাগরেণু ব্যবহার করে জাহাজটির ঐতিহাসিক যাত্রাপথ উন্মোচন করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটির যাত্রা ইতালি থেকে শুরু হয়েছিল এবং ক্রোয়েশিয়ার ইলোভিক দ্বীপের কাছে পারজাইন উপসাগরে ডুবে গিয়ে এর সলিল সমাধি ঘটে।
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের এ রোমান জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ ২০১৬ সালে ক্রোয়েশিয়া উপকূলে পাওয়া যায়, যার নাম ‘ইলোভিক-পারজাইন ১’।
জাহাজটি নিয়ে করা নতুন গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ম্যাটিরিয়ালস’ সাময়িকীতে।
এ গবেষণায় জাহাজের কাঠে ব্যবহৃত পানিরোধী প্রলেপ বা আস্তরণের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও পরাগরেণু বিদ্যা একত্র করে গবেষকরা খতিয়ে দেখেছেন, সেই আমলে আঠা তৈরির প্রযুক্তি কীভাবে বিবর্তিত হয়েছিল এবং জাহাজটি ওই সময় কোথায় কোথায় ভ্রমণ করেছিল।
গবেষণার ফলাফল থেকে জাহাজটির দীর্ঘ যাত্রাপথের মানচিত্র মিলেছে। জাহাজটি ইতালিতে তৈরি এবং প্রায় দুই হজার দুইশ বছর আগে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ডুবে যাওয়ার আগে তা পুরো আদ্রিয়াটিক সাগর জুড়ে চলাচল করেছিল।
গবেষকরা বলেছেন, প্রাচীন জাহাজের নকশা ও কাঠ কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও প্রতিটি জাহাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘পানিরোধী আস্তরণ’ নিয়ে গবেষণা এতদিন প্রায় অজানাই ছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছের কষ, বিটুমিন, উদ্ভিজ্জ আলকাতরা, যা অনেক সময় মোম, চর্বি বা খনিজ উপাদানের সঙ্গে মেশানো হত তা জাহাজের কাঠের বিভিন্ন খাঁজ বন্ধ করতে ব্যবহৃত হত। এগুলো কাঠকে পচন, সামুদ্রিক পোকা ও অন্যান্য ক্ষতি থেকেও রক্ষা করত।
১৩শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রসারের ফলে উদ্ভিজ্জ আলকাতরা তৈরির এক বড় শিল্প গড়ে ওঠে। তবে এ ধরনের মিশ্রণ তৈরির ইতিহাস আরও অনেক পুরানো।
প্রাচীন রোমান লেখক ‘প্লিনি দ্য এল্ডার’ পিচ ও মোমের এক মিশ্রণের কথা লিখেছিলেন, যা ‘জোপিসা’ নামে পরিচিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর প্রাচীন এলাকাগুলোতেও এ মিশ্রণের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন।
‘ইলোভিক-পারজাইন ১’ জাহাজটিতেও এ একই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা গেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, এ জাহাজে অন্তত চারটি ভিন্ন স্তরে পানিরোধী প্রলেপ লাগানো হয়েছিল। রাসায়নিক বিশ্লেষণে এগুলো প্রায় একই রকম মনে হলেও, গভীরভাবে পরীক্ষা করে কিছু পার্থক্য মিলেছে।

সংগৃহীত ১০টি নমুনার বেশিরভাগই ছিল উচ্চ তাপে গলানো পাইন জাতীয় গাছের কষ, যা থেকে বোঝা যায় সেই আমলের কারিগরদের এ বিষয়ে যথেষ্ট কারিগরি জ্ঞান ছিল।
তবে একটি নমুনা ছিল একটু ভিন্ন; সেটি ‘জোপিসা’র একটি মিশ্রণ ছিল, যাতে মৌমাছির মোম মেশানো হয়েছিল। ফলে আঠালো কষটি লাগানো অনেক সহজ হত।
তবে গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দেয় পরাগরেণু পরীক্ষা। আঠালো কষের ভেতরে আটকে থাকা পরাগরেণুগুলো গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করেছে, এ প্রলেপটি কোথায় তৈরি বা লাগানো হয়েছিল। তারা সেখানে ভূমধ্যসাগরীয় ঝোপঝাড়ের অলিভ ও হেজেল, ওক ও পাইন বন, উপকূলীয় অ্যাল্ডার ও অ্যাশ এবং পাহাড়ি অঞ্চলের ফার ও বিচ গাছের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন।
পরাগরেণুর এই বিশেষ সংমিশ্রণ থেকে ইঙ্গিত মেলে, জাহাজটি সম্ভবত দক্ষিণ ইতালির বর্তমান ব্রিনদিসি বন্দরের কাছাকাছি কোথাও তৈরি হয়েছিল, যা ছিল রোমান আমলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। এরপর জাহাজটি যখন আদ্রিয়াটিক সাগর পাড়ি দিচ্ছিল তখন বিভিন্ন স্থানে এর মেরামত হয়।
এ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অ্যার্নেল চ্যারি বলেছেন, “এসব প্রলেপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটির জীবন ও সমুদ্রে এর চলাচলের সাক্ষ্য বহন করছে। ওই সময়ের প্রচলিত পদ্ধতি ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তোলে জাহাজটি, বিশেষ করে, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে তারা কীভাবে কাজ করতেন তা এখানে স্পষ্ট।”
রোমান আমলের জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের কোনো লিখিত ইতিহাস না থাকায় চ্যারি বলেছেন, রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও পরাগরেণু বিদ্যা একত্র করে তারা আঠালো প্রলেপগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পেরেছেন।
“এগুলো আমাদের ঐতিহ্যেরই অংশ এবং এদের নিয়ে গবেষণা করলে অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যাবে। এগুলোর মাধ্যমে রাসায়নিকভাবে জাহাজটির ক্ষেত্রে বড় চমক ছিল মোম ও পিচের তৈরি মিশ্রণটি খুঁজে পাওয়া। কারণ অন্য সব নমুনা ছিল কেবল পিচের তৈরি।
তিনি বলেছেন, এ উদাহরণটি পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সে সময়ের কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ের বিষয়টিকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৭০ অব্দে চলাচলকারী এ বাণিজ্যিক জাহাজটি বর্তমানে গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে।
গবেষকরা লিখেছেন, “এই বিশেষ বিশ্লেষণ পদ্ধতি নৌ-প্রত্নতত্ত্বে অনুসন্ধানের নতুন পথ খুলে দিয়েছে।”