তথ্য যাচাই ছাড়াই চ্যাটবটে কেন আস্থা রাখছে মানুষ?
আগে তথ্য পেতে মানুষ বই, সংবাদপত্র, বিশ্বকোষ বা বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হতেন, যেখানে প্রায়ই ভিন্নতা থাকত ও একাধিক সূত্র মিলিয়ে সঠিক উত্তরে পৌঁছাতে মানুষের প্রচেষ্টা ও বুদ্ধি খাটানোর প্রয়োজন হত।
তথ্য যাচাই না করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের উত্তর মেনে নেওয়ার পেছনে কাজ করছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সহজপ্রবণতা ও যন্ত্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাস।
সহজ ও বিন্যস্ত উত্তরকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার এ ঝোঁক কেবল ব্যক্তিগত ভুল তথ্যের ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, বরং গণতান্ত্রিক সমাজের সার্বিক সচেতনতাকেও হুমকিতে ফেলছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
মনে কোনো প্রশ্ন এলেই মানুষ এখন অনলাইনে তথ্য খোঁজা বা বইয়ের পাতা ওল্টানোর বদলে সরাসরি চ্যাটবটের কাছেই উত্তর চেয়ে বসেছেন। প্রতিবেদন বলছে, বিষয়টি আপনার কাছে পরিচিত মনে হলে জেনে রাখুন, আপনি একা নন।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ কেবল চ্যাটজিপিটিরই সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৯০ কোটি। বড় পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ‘তথ্য অনুসন্ধান’, ‘ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা’ ও ‘লেখালেখির’ কাজের জন্য এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষ কীভাবে শেখে ও তথ্যের সঙ্গে যোগ থাকে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানের পিএইচডি গবেষকরা।
তাদের ভাষ্য, সমাজের ওপর এ অভ্যাসের প্রভাব ঠিক কতটা গভীর তা মানুষ এখনও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি। তথ্য পাওয়ার উপায়, তথ্যের ওপর আস্থা রাখা ও কোনো কিছু শেখার পুরো প্রক্রিয়াতেই বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এআই।
নানা উৎসের ভিড় থেকে ‘সাবলীল একটি উত্তর’
অতীতে যে কোনো তথ্য পেতে মানুষ বই, সংবাদপত্র, বিশ্বকোষ বা বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হয়েছে। এসব উৎসের তথ্যে প্রায়ই ভিন্নতা থাকত ও একাধিক সূত্র মিলিয়ে সঠিক উত্তরের জায়গায় পৌঁছাতে মানুষের নিজস্ব প্রচেষ্টা ও বিচারবুদ্ধি খাটানোর প্রয়োজন হতো।
সেই বিভিন্ন মতামতের পার্থক্যের মাধ্যমেই গড়ে উঠত মানুষের নিজস্ব বিশ্লেষণক্ষমতা।
এরপর এল বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনের যুগ। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তালিকা বা যুক্তির ক্রম দেখাত। এসব তথ্যের খোঁজ দ্রুততার জন্ম দিলেও বিষয়টি স্পষ্ট থাকত যে, যে কোনো প্রশ্নের উত্তরের পেছনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প উৎস রয়েছে।
ব্যবহারকারী প্রথম লিংকে ক্লিক করলেও তার সামনে অন্যান্য বিকল্প দেখার সুযোগ উন্মুক্ত থাকত। তবে এআই চ্যাটবট এসে পুরো ব্যবস্থার রূপ বদলে দিয়েছে।
এখন প্রশ্নের উত্তরে চ্যাটবট একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট ও সাবলীল অনুচ্ছেদ হাজির করছে, যা দেখে মনে হয় উত্তরটি একেবারেই চূড়ান্ত ও মীমাংসিত।
উৎস পরীক্ষার প্রবণতা কমছে?
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের বাস্তব ধরণ পর্যালোচনা করেছে, যেখানে উঠে এসেছে, গুগল সার্চের ফলাফলের ওপর এআই সামারি বা সারসংক্ষেপ তুলে ধরার সময় ব্যবহারকারীদের আসল সোর্স বা মূল ওয়েবসাইটে ঢোকার হার প্রায় অর্ধেক কমেছে, যা ১৫ শতাংশ থেকে নেমে কেবল আট শতাংশে দাঁড়ায়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এআই সারসংক্ষেপের ভেতরে থাকা বিভিন্ন সোর্স লিংকে মানুষ ক্লিক করে কেবল এক শতাংশ সময়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্নটির তাৎক্ষণিক উত্তর পেয়ে গেলে ব্যবহারকারীরা আর মূল উৎস যাচাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না।
অথচ বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষ যখন কোনো বিষয়ের ওপর ভিন্ন বা পরস্পরবিরোধী তথ্য পড়েন তখন তাদের মনে রাখার সক্ষমতা বা মেমোরি রিকল সেই তথ্যের চেয়ে বহুগুণ বাড়ে, যা কেবল একমুখী বক্তব্য তুলে ধরে।
এদিকে, রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ‘ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৬’-এর তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১০ শতাংশ মানুষ সংবাদের জন্য প্রতি সপ্তাহে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছেন। আর ৩৫ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সিদের ক্ষেত্রে এই হার ১৬ শতাংশ।
চিন্তার বিষয় হচ্ছে, চ্যাটবট ব্যবহারকারীদের মধ্যে কেবল ৪২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা নিয়মিত বা প্রায়শই চ্যাটবটের দেওয়া সোর্স লিংকগুলোতে ক্লিক করে আসল সংবাদটির সত্যতা বা উৎস পরীক্ষা করেন।
সহজ সমাধানই মানুষের সত্য মনে হয়
ফ্যাক্ট-চেকিং বা সত্যতা যাচাই না করেই মানুষ কেন এআই চ্যাটবটের ওপর অন্ধের মতো ভরসা করে? মানুষের তথ্য প্রক্রিয়ার ধরন নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, যে কোনো তথ্য বুঝতে বা গ্রহণ করতে যতটা সহজ হয় মানুষের কাছে তা তত বেশি সত্যি মনে হয়। আগের ধারণা, বারবার একই তথ্য দেখা ও কোনো কিছু পড়ার সহজলভ্যতা এ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা তৈরি করতে ভূমিকা রাখে।
কোনো লেখা যদি কেবল সহজভাবে পড়া যায় এমন উজ্জ্বল রঙের ফন্টে ছাপা হয় তবে পাঠক সেটাকেও বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন। চ্যাটবটের উত্তর তাৎক্ষণিক, পরিচ্ছন্ন, আত্মবিশ্বাসী ও অতিরিক্ত কোনো পরিশ্রম ছাড়াই পাওয়া যায়, যা তথ্যটিকে একদম সত্য বলে মেনে নিতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতায় প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া, কেবল একটিমাত্র নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে, বিশেষ করে যখন উত্তরদাতা হিসেবে স্বনামধন্য ও নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত কোনো উৎস কাজ করে এআই চ্যাটবট। বিভিন্ন উৎসের তথ্যের মধ্যে ভিন্নতা বা মতভেদ মানুষের মনে অস্বস্তি তৈরি করে।
বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ নানা ধরনের উত্তরের মুখে পড়লে তারা একটিমাত্র নির্দিষ্ট উত্তরের ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখায় ও একাধিক উৎসের জটিল উত্তরের ওপর তাদের আস্থা কমে যায়, সেই একাধিক উৎসের তথ্যটি যদি অপেক্ষাকৃত নির্ভরযোগ্যও হয়ে থাকে তবুও এমন হয়।
১০টি ভিন্ন উৎসের তথ্য কেবল একটি অনুচ্ছেদে রূপ নিলে তথ্যের সংঘাত বা পার্থক্য পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যায় না, বরং তা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
এর ফলে কোনো উত্তর আরও নির্ভুল হয়েছে বলেই যে মানুষের নিশ্চিতবোধ বাড়ছে তা নয়, বরং উত্তরের পেছনের আসল বিতর্ক ও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আড়াল হয়ে গেছে বলেই মানুষ তা সহজে মেনে নিচ্ছে।
যন্ত্রের ওপর ‘নিরপেক্ষতার’ বিশ্বাস
এআই চ্যাটবটের ওপর বিশ্বাসের আরেকটি মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে, যেটিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘মেশিন হিউরিস্টিক’, অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্কের এমন এক স্বভাব, যা ধরে নেয় যন্ত্র সব সময়ই নিরপেক্ষ ও এর কোনো নিজস্ব উদ্দেশ্য বা গোপন এজেন্ডা নেই।
এআই চ্যাটবটের উত্তর শতভাগ নির্ভুল হলে এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগের বিশেষ কারণ থাকত না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এগুলো একেবারেই নির্ভরযোগ্য নয়।
ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন ও বিবিসি’র যৌথ পরিচালনায় ১৮টি দেশ ও ১৪টি ভাষার ওপর চালানো সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের দেওয়া প্রায় অর্ধেক সংবাদভিত্তিক উত্তরের মধ্যেই কোনো না কোনো গুরুতর ভুল ছিল।
ভুল উৎসের তথ্য দেওয়া ছিল সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা। এ ছাড়া, একটি বড় অংশে ছিল বিভ্রান্তিকর ও আংশিক তথ্য, মেয়াদউত্তীর্ণ বিবরণ বা এআইয়ের নিজস্ব মনগড়া তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’।
এর সঙ্গে মূল উৎস যাচাই না করার প্রবণতাকে মেলালে দেখা যায় মানুষ এমন এক সমাজ তৈরি করছে, যা ভুল তথ্যে ভরা, অথচ তারা নিজেদের দারুণ তথ্যসমৃদ্ধ মনে করছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর মূল্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক। ভুল তথ্যে চালিত নাগরিক সমাজ মানেই ভুল পথে পরিচালিত এক জনমত বা ভোটার গোষ্ঠী। ফলে নিজেদের সামাজিক ভবিষ্যৎ ও নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সঠিক তথ্য পাওয়া জরুরি।
অভ্যাসে আনুন সচেতন পরিবর্তন
এ সমস্যার সমাধান কী? এআই নিঃসন্দেহে অসাধারণ প্রযুক্তি। আর, মানুষকে এমন সুবিধাজনক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করতে বলা আর মোটর গাড়ি (বা ইভি) ছেড়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে বলা একই কথা। ফলে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসের সঙ্গে একটি সচেতন অভ্যাস যোগ করা।
প্রথম ধাপ হিসেবে, কোনো তথ্য চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নেওয়ার এই যে মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা তা সম্পর্কে মানুষের নিজেদের সচেতন হতে হবে, যা এআই ব্যবহারের সময় তারা কী কী ভুল করতে পারেন তা বুঝতে সাহায্য করবে।
দ্বিতীয়ত, চ্যাটবটের দেওয়া কোনো উত্তরকে তথ্যের ‘শেষ বিন্দু’ না ভেবে কেবল ‘প্রথম সূত্র’ বা ইঙ্গিত হিসেবে দেখা। চ্যাটবট কোনো উত্তর দেওয়ার পর সেখান থেকেই কেবল শেখার বা জানার আসল প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত, শেষ নয়।
চ্যাটবটের কাছে তথ্যের আসল উৎস জানতে চাওয়া উচিত এবং তা নিজে যাচাই করে নিন। একাধিক ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখুন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসল সত্য লুকিয়ে থাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের বিশ্লেষণের মধ্যে, চ্যাটবটের তৈরি করা দু-এক লাইনের সুবিন্যস্ত জবাবে নয়।
