২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

না জানিয়ে লোকেশন ট্র্যাকিং, ৪০ কোটি ইউরো দণ্ড গুগলের

গুগল ব্যবহারকারীদের অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাদের প্রতি মুহূর্তের পদচারণা বা গতিবিধি ট্র্যাক করছিল।

না জানিয়ে লোকেশন ট্র্যাকিং, ৪০ কোটি ইউরো দণ্ড গুগলের

আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশনের এ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মূল সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৮ সালে নরওয়ের ভোক্তা সংস্থার এক অনুসন্ধানের মাধ্যমে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 22 Sep 2026, 06:08 PM

Updated : 22 Sep 2026, 06:08 PM

ব্যবহারকারীর লোকেশন বা অবস্থান ডেটা প্রসেসিংয়ের নিয়মের গুরুতর ব্যত্যয় ঘটিয়ে মোবাইল ফোনে তাদের ট্র্যাকিংয়ের দায়ে প্রযুক্তি কোম্পানি গুগলকে ৪০ কোটি ইউরোর বেশি জরিমানা করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নানা কৌশলে ও কারসাজির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ওপর এ নজরদারি চালিয়ে আসছিল মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, গুগলকে জরিমানা করেছে আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশন বা ডিজিপিসি’। এ জরিমানার পেছনে রয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভোক্তা অধিকার সংগঠনের দায়ের করা একাধিক অভিযোগ।

এসব সংগঠনের জোরালো দাবি ছিল, গুগল ব্যবহারকারীদের অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাদের প্রতি মুহূর্তের পদচারণা বা গতিবিধি ট্র্যাক করছিল।

ভ্রমণপিপাসু বা নতুন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া মানুষের কাছে লোকেশনভিত্তিক বিজ্ঞাপন বেশ পরিচিত ও সুপরিচিত হলেও ইউরোপের সাতটি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের অভিযোগ ছিল, লোকেশন ডেটার এ অযাচিত ও অতিরিক্ত ব্যবহার নাগরিকদের প্রাইভেসির মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।

আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশনের এ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৮ সালে নরওয়ের ভোক্তা সংস্থার এক অনুসন্ধানের মাধ্যমে।

ওই গবেষণায় উঠে এসেছিল, একজন মানুষের লোকেশন বা অবস্থান ডেটা বিশ্লেষণ করে কেবল তার যাতায়াতই নয়, বরং তার ধর্মীয় বিশ্বাস (উপাসনালয়ে যাতায়াত ট্র্যাক করে), রাজনৈতিক ঝোঁক (কোনো রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়া), স্বাস্থ্যগত অবস্থা (হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াত) ও ব্যক্তিগত পছন্দের মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলোর সুক্ষ্ম তথ্যও বের করে নেওয়া সম্ভব।

এ প্রেক্ষাপটে প্রায় ছয় বছর আগে তদন্ত শুরু করেছিল ডিজিপিসি। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, ব্যবহারকারীদের লোকেশন ডেটা বা অবস্থানভিত্তিক তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুগলের কাছে পর্যাপ্ত ও আইনসম্মত কোনো বৈধ ভিত্তি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে দেখা গেছে, গুগল ব্যবহারকারীরা হয়ত ঘুণাক্ষরেও টেরই পাননি যে তাদের লোকেশন ডেটা সুকৌশলে ব্যবহার করে তাদের ওপর প্রভাব ফেলার জন্য বিজ্ঞাপন দেখানো বা তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও নানাবিধ আগ্রহের গোপন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে আয়ারল্যান্ডের ডেপুটি ডেটা প্রোটেকশন কমিশনার গ্রেহাম ডয়েল বলেছেন, “লোকেশন ডেটা এমন ব্যক্তিগত তথ্য, যা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে এমন সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা গুগল নিজে বা অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে একজন ব্যক্তির অবস্থান অনুমান করতে পারে।

“লোকেশন ডেটা মানুষের জন্য যেমন বিভিন্ন সুযোগ ও সুবিধা আনে তেমনই এর অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তির প্রাইভেসি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো ক্ষতিকর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

“এটা অনলাইন সেবাসমূহের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে একইসঙ্গে একজন ব্যক্তি সম্পর্কে অনেক তথ্যও প্রকাশ করে দিতে পারে, যার মধ্যে এমন তথ্যও রয়েছে, যা সহজাতভাবেই একান্ত ব্যক্তিগত।”

ডিজিপিসির এই রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় গুগলের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “মামলাটি আমাদের অতীতের কিছু পলিসি বা নীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যেগুলোকে এরইমধ্যেই আপডেট করা হয়েছে।

“২০১৯ সাল থেকে আমরা আমাদের কার্যপদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছি এবং এমন কিছু শক্তিশালী টুল চালু করেছি, যার মাধ্যমে লোকেশন ডেটা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়েছে।”

নরওয়ের ভোক্তা এজেন্সি ‘ফরব্রুকেরাডেট’-এর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ‘ইউরোপীয় ভোক্তা সংগঠন’ বা বিইইউসি অভিযোগ করেছিল, লোকেশন হিস্ট্রি এবং ওয়েব ও অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি চালু রাখতে গুগল বিভিন্ন ধরনের ‘কৌশল বা কারসাজি’ ব্যবহার করেছিল।

বিইইউসি’-এর ডিজিটাল পলিসির ডিরেক্টর ফিন মিরস্টাড বলেছেন, “আজকের দিনটি অনলাইনে আমাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মানুষকে অবশ্যই বিভ্রান্ত না করে এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে দিতে হবে যে, তারা কিসে সম্মতি দিচ্ছে, যা তারা অন্যথায় কখনই করত না।”

বিইইউসি-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জিওলোকেশন ডেটা বা ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক উপাত্ত ‘ভোক্তা নজরদারির অন্যতম আক্রমণাত্মক রূপ’।

এ রায়কে স্বাগত জানিয়ে বিইইউসি-এর ডিরেক্টর জেনারেল আগুস্তিন রেইনা বলেছেন, “এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যে সময় লেগেছে তা অপরাধের গুরুত্বের তুলনায় বেশি। দেরিতে কার্যকর হওয়া আইন প্রয়োগ না করার সমান ও তা সমানভাবে ক্ষতিকর।”

ডিজিপিসির এই তদন্তে ২০১৮ সালের ২৫ মে থেকে ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে গুগলের ‘ওয়েব ও অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি’, ‘লোকেশন হিস্ট্রি’ ও ‘লোকেশন অ্যাকিউরেসি’ বা অবস্থানের সঠিকতা সংক্রান্ত নানা বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে।

গুগলকে ৪০ কোটি ইউরো জরিমানার পাশাপাশি ডিজিপিসি আগামী ছয় মাসের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেটা সুরক্ষা আইন বা জিডিপিআর-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের ডেটা প্রসেসিং প্রক্রিয়া সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে।

আয়ারল্যান্ডের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ইতিহাসে এটা চতুর্থ বৃহত্তম জরিমানা। ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদর দফতর রয়েছে এমন সব মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টের ওপর পুরো ইইউ জুড়ে নজরদারির মূল দায়িত্ব এই আইরিশ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর রয়েছে।

এর আগে, তারা মেটাকে ১২০ কোটি ইউরো, টিকটককে ৫৩ কোটি ইউরো এবং ইনস্টাগ্রামকে (যা মেটারই মালিকানাধীন) ৪০ কোটি ইউরো জরিমানা করেছিল।

গুগলকে নিয়ে বর্তমানে আরও তিনটি বড় আকারের তদন্ত চলমান রয়েছে, যার সবগুলোই এখন অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে।