Published : 19 May 2026, 12:17 PM
আদালতে মুখোমুখি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নির্মাতা চ্যাটজিপিটি প্রধান স্যাম অল্টম্যান। ওপেনএআইয়ের মালিকানা ও আদর্শ নিয়ে দুই সাবেক বন্ধুর এ নজিরবিহীন আইনি লড়াই রূপ নিয়েছে এক চরম তিক্ততায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে তিন সপ্তাহ ধরে চলা এ মামলায় একদিকে যেমন উঠে এসেছে সিলিকন ভ্যালির ক্ষমতাধরদের অহংকার, গোপন ডায়েরি আর প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে উন্মোচিত হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বের পর্দার আড়ালের এক অদ্ভুত ও বিব্রতকর বাস্তবতা।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, অল্টম্যান ও ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মাস্কের আনা ‘দাতব্য কোম্পানি চুরির’ অভিযোগটি কতটা সত্যি তা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে নয় সদস্যের একটি জুরি বোর্ড।
সোমবার থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে। মামলার রায় যা-ই হোক না কেন, ওপেনএআইয়ের ভেতরের ইতিহাস ও প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা পর্দার আড়ালে কীভাবে চলেন তা বোঝার জন্য মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেদের পক্ষে যুক্তি প্রমাণ করতে দুপক্ষের আইনজীবীরাই ব্যক্তিগত টেক্সট মেসেজ, ইমেইল, ডায়েরির পাতাও আদালতের সামনে হাজির করেছেন।
সিলিকন ভ্যালির নামী-দামী সব তারকা এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সাত্যিয়া নাদেলা ও মাস্কের সন্তানদের মা শিভন জিলিসও।
অল্টম্যান ও মাস্ক দুজনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের তীব্র জেরার মুখে পড়েছেন, যেখানে তারা দুজনই একে অপরের কাছে নির্ভরযোগ্যতা হারিয়েছেন।
এ বিচার প্রক্রিয়াটি যেমন দুই প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ারের জন্যই বেশ কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, তেমনই স্পষ্ট করেছে, তাদের ভেতরের শত্রুতা কতটা তিক্ত রূপ নিয়েছে।
মাস্কের মামলার মূল অভিযোগ, অল্টম্যান, ওপেনএআই ও কোম্পানিটির প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান এ এআই কোম্পানিটির শুরুর দিকের একটি চুক্তি ভঙ্গ করেছেন, যেখানে ২০১৫ সালে অলাভজনক কোম্পানি হিসেবে ওপেনএআই যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে তারা এটিকে লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করেছেন।
মাস্কের দাবি, অল্টম্যান তাকে ধোঁকা দিয়েছেন; সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাকে প্রলুব্ধ করে তার আর্থিক সহযোগিতা নেওয়ার পর অল্টম্যান নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য কোম্পানিটিকে ভিন্ন পথে খাটিয়েছেন। মাস্কের এ মামলায় অল্টম্যান ও ব্রকম্যানের বিরুদ্ধে ‘দাতব্য তহবিলের বিশ্বাসভঙ্গ’ ও ‘অন্যায় করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলাটি যত এগিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা মাস্কের এসব অভিযোগ নিয়ে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। সবার বক্তব্য মিলিয়ে ওপেনএআইয়ের ইতিহাসের দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে।
প্রথম চিত্রে দেখা যায়, অধৈর্য হয়ে মাস্ক নিজেই এমন এক কোম্পানি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, যেটি একসময় লাভের মুখ দেখবে বলে তিনি জানতেন।
আর দ্বিতীয় চিত্রে দেখা মেলে, অল্টম্যান ক্ষমতার লোভে মত্ত ছিলেন ও সেই ক্ষমতা পাওয়ার জন্য যাকে প্রয়োজন তাকেই ধোঁকা দিয়েছেন।
মাস্কের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওপেনএআই। তাদের দাবি, লাভজনক হিসেবে কোম্পানিটিকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা সম্পর্কে মাস্ক কেবল অবগতই ছিলেন না, বরং তিনি নিজেই কোম্পানির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন।
এরপর ২০১৮ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে কোম্পানি ছেড়ে চলে যান ও পরবর্তীতে ‘এক্সএআই’ নামে ওপেনএআইয়ের এক প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি গড়ে তোলেন। ওপেনএআই মাস্ককে এআইয়ের দৌড়ে হেরে যাওয়া একজন ‘হতাশ পরাজিত ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি এ মামলার মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন।
এআই কোম্পানিটি আরও জোর দিয়ে বলেছে, তাদের লাভজনক শাখাটি এখনও অলাভজনক বোর্ডের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়, যাকে তাদের আইনজীবীরা বারবার বিশ্বের অন্যতম বড় ‘দাতব্য কোম্পানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মাস্ক আদালতে অল্টম্যান ও ব্রকম্যানের অপসারণ, ওপেনএআইয়ের লাভজনক রূপান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল এবং এর লাভজনক শাখা থেকে ১৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অলাভজনক কোম্পানিতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জুরি বোর্ড যদি ওপেনএআই’কে দোষী সাব্যস্ত করে তবে এ রায় কোম্পানির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ এ বছরের শেষদিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে শেয়ার বাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে ওপেনএআই।
মাস্কের মেজাজ হারানো ও প্রস্থান
এ মামলার প্রথম হাই-প্রোফাইল সাক্ষী ছিলেন স্বয়ং মাস্ক। শুনানির প্রথম সপ্তাহেই তার আইনজীবী তাকে কাঠগড়ায় ডাকেন। অল্টম্যানের বিরুদ্ধে নিজের আনা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে মাস্ক টানা তিন দিন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ সময় মাঝেমধ্যেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ও হতাশা থেকে গলার আওয়াজ উঁচিয়ে কথা বলেন।
টেসলা সিইও’র প্রধান আইনজীবী স্টিভেন মোলোর সহজ ও অনুকূল প্রশ্নের মাধ্যমে মাস্কের সাক্ষ্য দেওয়া শুরু হয়। মোলো মাস্ককে তার কর্মজীবন পুনর্ব্যক্ত করার ও ওপেনএআইয়ের শুরুর দিনগুলো নিয়ে নিজের গল্প বলার সুযোগ করে দেন।
মাস্কের ভাষ্যমতে, কোম্পানিটি যে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পেরেছিল তার মূল কারণ ছিলেন তিনি নিজেই। তার দাবি, গুগল নিরাপদ এআই তৈরি করতে পারবে না এমন ভয় থেকেই মানবজাতির কল্যাণে নিজের স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠার মূল ভাবনা জন্ম নেয় তার মধ্যে।

ওপেনএআই নিয়ে তার স্বপ্ন চতুর অল্টম্যানের কারণে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। কারণ অল্টম্যান কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে লাভের আশায় এর দাতব্য উদ্দেশ্যকে বিসর্জন দিয়েছেন।
মাস্ক বলেছেন, “ওরা এ মামলাটিকে অনেক জটিল করে তোলার চেষ্টা করবে। তবে বিষয়টি আসলে খুব সহজ। একটি দাতব্য কোম্পানিকে চুরি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটাই আমার স্পষ্ট কথা।”
তবে ওপেনএআইয়ের প্রধান আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট যখন মাস্ককে জেরা করা শুরু করেন তখনই সাক্ষ্যের মোড় ঘুরে যায়। স্যাভিট একের পর এক ক্ষুরধার প্রশ্নে মাস্ককে চেপে ধরেন, যেখানে ওপেনএআইয়ের লাভজনক ব্যবসা চালুর পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি ঠিক কী এবং কবে জেনেছিলেন তা জানতে চান।
বিচারক মাস্ককে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে উত্তর না দেওয়ার জন্য সতর্ক করেন। একপর্যায়ে মাস্ক বেশ বিরক্ত হয়ে ওঠেন ও স্যাভিটের প্রশ্নগুলোকে “আপনি কি আপনার স্ত্রীকে পেটানো বন্ধ করেছেন?” এ ধরনের ফাঁদ-প্রশ্নের সঙ্গে তুলনা করেন। এ কারণে বিচারকের কাছ থেকে মাস্ককে তিরস্কারও শুনতে হয়।
মাস্ক স্যাভিটকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আপনার প্রশ্নগুলো সহজ নয়। এগুলো মূলত আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য সাজানো হয়েছে।”
মামলার বাকি অংশগুলোতে মাস্ক আর আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। বিচারক ইভন গঞ্জালেস রজার্সের নির্দেশ ছিল, প্রয়োজনে আবারও সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য মাস্ক যেন প্রস্তুত থাকেন। তবে সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক কূটনৈতিক সফরে চীনে গিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার মামলার সমাপনী বক্তব্যে ওপেনএআইয়ের আইনজীবী বলেছেন, “মাস্ক আজ এখানে নেই। তবে আমার মক্কেলরা আছেন। মাস্ক আদালতে এসেছিলেন স্রেফ একজন সাক্ষীর জন্য, আর সেই সাক্ষী হলেন স্বয়ং মাস্ক। এখন তিনি অজ্ঞাত কোথাও আছেন।”
মক্কেলের এমন অনুপস্থিতির জন্য মাস্কের আইনজীবী আদালতে বেশ লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চান।
অল্টম্যানকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলা ব্যক্তিদের দীর্ঘ তালিকা
মামলার শুরুতে মাস্কের সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর মাস্কের আইনজীবীরা বেশ কিছু ভিডিও জবানবন্দি পেশ করেন এবং একের পর এক সাক্ষীকে কাঠগড়ায় ডাকেন।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এমনটা প্রমাণ করা যে, ওপেনএআইয়ের কাজকর্মের ক্ষেত্রে অল্টম্যান মোটেও একজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। কোম্পানির বেশ কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিতে আসেন। তাদের ২০২৩ সালের সেই নাটকীয় পাঁচ দিনের ঘটনাটি পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল। ওই সময় ওপেনএআইয়ের বোর্ড অল্টম্যানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল ও পরবর্তীতে এক ক্ষমতার লড়াইয়ের পর তিনি আবার দায়িত্বে পুনর্বহাল হন।
এ অংশটি ‘দাতব্য তহবিলের বিশ্বাসভঙ্গ’ সংক্রান্ত মামলার খুঁটিনাটি আইনি প্রশ্নের ওপর খুব বেশি জোর দেয়নি। তবে বিচার প্রক্রিয়ার এ পর্যায়টি অল্টম্যানকে একজন ‘প্রতারক’ হিসেবে বারবার আদালতের সামনে নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ওপেনএআইয়ের সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মিরা মুরাতি অল্টম্যানের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, তিনি প্রায়ই “একজনের কাছে এক কথা বলতেন ও অন্যজনের কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলতেন।”
অন্যদিকে, সাবেক বোর্ড সদস্য নাতাশা ম্যাককলি অভিযোগ করেছেন, অল্টম্যান তার নেতৃত্বের মাধ্যমে বারবার কোম্পানিতে ‘সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি’ তৈরি করতেন।
ওপেনএআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ইলায়া সুটস্কেভারকেও মাস্কের আইনজীবী মোলো তার আগের জবানবন্দি ও অল্টম্যানের অসততা নিয়ে নিজের উদ্বেগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
মোলো প্রশ্ন করেন, “আপনি বোর্ডকে বলেছিলেন যে অল্টম্যানের মধ্যে ‘অনবরত মিথ্যা বলা, নিজের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করা ও তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার স্থায়ী প্রবণতা’ রয়েছে, তাই না?”
উত্তরে সুটস্কেভার বলেছেন, “হ্যাঁ।”
সুটস্কেভার, ম্যাককলি ও মুরাতি তারা সবাই ২০২৩ সালে অল্টম্যানকে কোম্পানি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন এবং পরবর্তীতে সবাই কোম্পানিটি ছেড়ে গেছেন।
মামলার শেষ সপ্তাহে অল্টম্যান নিজেই যখন কাঠগড়ায় দাঁড়ান তখন তিনি প্রথমে ওপেনএআইয়ের ইতিহাস ও এতে মাস্কের সম্পৃক্ততা নিয়ে নিজের কথা তুলে ধরেন।
অল্টম্যান যুক্তি দিয়েছেন, মাস্ক ছিলেন একজন জটিল ও খামখেয়ালী সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যিনি নিজের উগ্র শাসনশৈলী দিয়ে কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিতেন এবং নিজের জন্য ক্ষমতা খুঁজতেন। একপর্যায়ে মাস্ক কোম্পানির ওপর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ চেয়েছিলেন এবং এমন প্রস্তাবও দিয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর এই কোম্পানির ক্ষমতা যেন তার সন্তানদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মাস্কের সেই বহুল চর্চিত উক্তি ‘প্রতিদ্বন্দ্বীরা এক দাতব্য কোম্পানি চুরি করেছে’ এ বিষয়টিকেও নিশানা করেছেন অল্টম্যান। তার দাবি, ওপেনএআই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দাতব্য কোম্পানি গড়ে তুলেছে এবং মাস্কই তা ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন।
অল্টম্যান বলেছেন, “এই যে বলা হচ্ছে ‘আপনি দাতব্য কোম্পানি চুরি করতে পারেন না’, আমিও একমত যে চুরি করা যায় না, বরং মাস্ক নিজেই এটিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন।”
জেরার সময় মাস্কের আইনজীবী আবারও অল্টম্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং নিজের চরিত্র নিয়ে সাবেক সহকর্মীদের দেওয়া আগের নেতিবাচক বিভিন্ন বক্তব্য পড়ে শোনান।
মাস্কের আইনজীবী প্রশ্ন করেন, “যাদের সঙ্গে আপনি ব্যবসা করেছেন সেসব মানুষ আপনাকে বারবার ছলনাকারী ও মিথ্যাবাদী বলেছে, তাই নয় কি?”
জবাবে অল্টম্যান বলেছেন, “আমি মানুষকে এমনটা বলতে শুনেছি।”

‘অপেশাদারদের আখড়া’, মাস্কের সঙ্গী ও ব্যক্তিগত ডায়েরি
মাস্ক ও অল্টম্যানের বাইরেও জুরিরা ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট ব্রকম্যান, মাইক্রোসফটের সিইও নাদেলা ও কোম্পানিটির সাবেক বোর্ড সদস্য শিভন জিলিসের বক্তব্য শোনেন। জিলিস পরবর্তীতে মাস্কের সঙ্গী হন। তাদের প্রত্যেকের বক্তব্যই এ মামলার সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত তৈরি করেছে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান ব্যবসায়িক পার্টনার মাইক্রোসফট। ওপেনএআইয়ের বিশ্বাসভঙ্গে প্ররোচনা ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে মাইক্রোসফটও এ মামলায় অভিযুক্ত।
সেই সূত্রে সোমবার মাইক্রোসফটের সিইও নাদেলা কাঠগড়ায় দাঁড়ান। তিনি ওপেনএআইয়ের উন্নয়নে নিজের ভূমিকার কথা বলেছেন। পাশাপাশি এক মন্তব্যে তিনি ২০২৩ সালে অল্টম্যানকে বহিষ্কারের চেষ্টা করা বোর্ড সদস্যদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, নিজেদের সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেনি তারা এবং পুরো কোম্পানিকে এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
নাদেলা সাক্ষ্যে বলেছেন, “আমার দৃষ্টিতে এমনটি ছিল অপেশাদারদের এক ধরনের আখড়া। আমি খুব শঙ্কিত ছিলাম যে, সব কর্মী হয়ত একযোগে চাকরি ছেড়ে চলে যাবে।”
এদিকে, ব্রকম্যানকে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠার শুরুর দিনগুলোতে লেখা তার এক ব্যক্তিগত ডায়েরি নিয়ে কঠিন জেরার মুখে পড়তে হয়। সেই ডায়েরিতে লেখা ছিল, “আর্থিক দিক থেকে, কী করলে আমি ১০০ কোটি ডলারের মালিক হতে পারব?”
মাস্কের আইনজীবীরা এ ডায়েরিটিকে স্বার্থান্বেষী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও তাদের মক্কেলকে (মাস্ক) ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে ওপেনএআই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন, খামখেয়ালী চিন্তাভাবনার দলিল হিসেবে দাবি করেছেন, যা কিছুই প্রমাণ করে না। তবে কারণ যাই হোক, ব্রকম্যান তার ব্যক্তিগত ডায়েরি এভাবে সবার সামনে আসুক তা মোটেও চাননি।
ব্রকম্যান বলেছেন, “এমনটা কষ্টদায়ক। এগুলো সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত লেখা যা বিশ্ববাসীকে দেখানোর জন্য ছিল না। তবে এর মধ্যে এমন কিছু নেই যার জন্য আমি লজ্জিত।”
মামলাটি আরও বেশি ব্যক্তিগত রূপ নেয় যখন শিভন জিলিস কাঠগড়ায় দাঁড়ান। তিনি মাস্কের চার সন্তানের মা ও নিউরালিংক-এর একজন নির্বাহী। ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, ওপেনএআইয়ের বোর্ডে থাকার সময় তিনি মাস্কের গোপন তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করেছেন; বিলিয়নেয়ার মাস্কের সঙ্গে নিজের প্রেমের সম্পর্ক গোপন রেখে তিনি মাস্কের কাছে তথ্য পাচার করতেন।
জিলিস অবশ্য মাস্কের জন্য কোনো গুপ্তচরবৃত্তি করার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
জিলিসের সাক্ষ্য চলাকালীন একপর্যায়ে আইনজীবীরা ২০২৩ সালের এক টেক্সট মেসেজ সামনে নিয়ে আসেন, যা জিলিস ও তার এক বান্ধবীর মধ্যে আদান-প্রদান হয়েছিল। এমনটি ছিল সেই সময়ের ঘটনা যখন মাস্কের নিজস্ব এআই কোম্পানি শুরুর বিষয়টি জানাজানি হয় এবং জিলিস ওপেনএআইয়ের বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেন।
মামলার অন্যান্য অনেক প্রসঙ্গের মতোই এটিও বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি নেতাদের ভেতরের এক অদ্ভুত বাস্তবতার ঝলক দেখায়।
জিলিস টেক্সট করেছিলেন, “মাস্কের উদ্যোগের কথা এখন সবাই জেনে গেছে।”
বান্ধবী উত্তরে লেখেন, “ধ্যাত! তুমি ঠিক আছ তো?” জিলিস জবাব দিয়েছিলেন, “তোমার সন্তানদের বাবা যখন এক প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি চালু করে ওপেনএআই থেকেই কর্মী নেওয়া শুরু করবে তখন আসলে আর কিছুই করার থাকে না।”