Published : 02 Nov 2025, 11:53 AM
বর্তমানে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি। প্রথমে ‘এ হাউজ অফ ডাইনামাইট’ নামে এক সিনেমা অক্টোবরে গোটা বিশ্বজুড়ে স্ট্রিমিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে নেটফ্লিক্সে এক নাম্বার হিটে পরিণত হয়। ওস্কারজয়ী পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো পরিচালিত এ সিনেমাটি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে, কারণ এটি দেখিয়েছে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও সরকারি সংস্থা আকস্মিক এক পারমাণবিক আক্রমণ ঠেকায়।
সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পরই বাস্তবে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার এ ঘোষণা এসেছে রাশিয়ার পারমাণবিক-শক্তিচালিত অস্ত্রের সাম্প্রতিক পরীক্ষার পর। তবে অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল রোমাঞ্চকর, কারণ ১৯৯২ সালের পর একটিও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
৩৩ বছর বা আরও ভালো করে বললে পাঁচটি পূর্ণ প্রেসিডেন্টের সময়কালে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রে। এর আগে, দেশটি কয়েক দশক ধরে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ করে এর শক্তি, বিস্ফোরণের পরিধি, তাপ ও বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় প্রভাব, তেজস্ক্রিয় এবং আরও নানা দিক পরীক্ষা করেছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা ছিল ট্রিনিটি, যেটি হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোতে। এটি ম্যানহাটন প্রকল্পের অংশ ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন জে. রবার্ট ওপেনহাইমার ও জেনারেল লেসলি গ্রোভস। এ পরীক্ষার কেবল এক মাসের মধ্যেই জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়।
আজ পর্যন্ত সশস্ত্র যুদ্ধে একবারই ব্যবহার হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে ঘটেছিল। তবে তারপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ বহু পারমাণবিক বিস্ফোরণ করেছে বৈজ্ঞানিক ও সামরিক পরীক্ষার জন্য।
যুক্তরাষ্ট্র এসব পরীক্ষা এমন জায়গায় করেছে, যেখানে ঘনবসতি নেই। অনেক পরীক্ষা আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমে, বিশেষ করে নেভাদায় হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক বিস্ফোরণের স্থান হয়ে ওঠে। এ ছাড়া, প্রশান্ত মহাসাগরে কাছেও অনেক পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ পারমাণবিক পরীক্ষা হয়েছে ভূগর্ভে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি পারমাণবিক পরীক্ষা করেছে। এরপর ১৯৫১ সালে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও ১৬টি পরীক্ষা করেছে দেশটি।
১৯৯২ সালে সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে, এরই মধ্যে দেশটি মোট ১ হাজার ৫৪টি পারমাণবিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু, বিশেষ করে প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো, ট্রিনিটি পরীক্ষার মতোই একশ ফুট উঁচু টাওয়ারে বোমা স্থাপন করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
অন্যান্য পরীক্ষা মাটির কাছাকাছি ছিল, আবার কিছু পরীক্ষা হয়েছিল বার্জ বা বেলুনে বোমা বেঁধে আকাশে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। অনেক পারমাণবিক বোমা প্লেন থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল, যা বায়ুতে বা এয়ারবার্স্ট হিসাবে বিস্ফোরিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর সময় নতুন পদ্ধতিরও খোঁজ করেছে, যেমন সমুদ্রের নিচে ও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বিস্ফোরণ ঘটানো। বিষয়টি দেখতে যে, পারমাণবিক বোমা মহাকাশে বিস্ফোরিত হলে কী ঘটতে পারে। এ ধরনের একটি পরীক্ষার নাম ‘স্টারফিশ প্রাইম’, যা প্রশান্ত মহাসাগরের ২৫০ মাইল উচ্চতায় হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন বা আইএসএস একই উচ্চতায় পৃথিবীর কক্ষপথে ঘোরে।
এরপর পরিবেশ বা বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ কমিয়ে আনতে ভূগর্ভে পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৬৩ সালে দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ‘লিমিটেড টেস্ট ব্যান ট্রিটি’ বা এলটিবিটি চুক্তিতে সই করে। এ চুক্তিতে পৃথিবীর উপরিভাগে যে কোনো ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৬৩ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে সব ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরীক্ষা ভূগর্ভে করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এসব পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, আলাস্কা ও মিসিসিপিতে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু সময় পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দেন। পরে ১৯৯৬ সালে ‘কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট ব্যান ট্রিটি’ বা সিটিবিটি’তে স্বাক্ষর করে এ স্থগিতাদেশকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন আরেক সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। যুক্তরাষ্ট্রের শেষ পারমাণবিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯২ সালে নেভাদায়।