Published : 31 Jul 2026, 06:08 PM
চলন্ত গাড়িতে আইফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালে তৈরি হওয়া বমি বমি ভাব বা মোশন সিকনেস কাটাতে নতুন ফিচার নিয়ে হঠাৎ করেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, আইফোনের ‘ভেহিকল মোশন কিউস’ নামের এ ফিচার গাড়িতে যাতায়াতের সময় মানুষের মাথা ঘোরা বা বমি বমি ভাব কমাচ্ছে। নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে ট্রেনে ভিড়ের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে চলাচলের সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যের ফোনের দিকে চোখ পড়ে যায়।
সুরঙ্গের মধ্য দিয়ে ট্রেনটি ঝাঁকুনি দিয়ে ছুটে চলার সময় অদ্ভুত এক দৃশ্য চোখে পড়ে। অনেকের ফোনের পর্দাতেই দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট কিছু বিন্দু নাচা-নাচি করছে।
ঘন ঘন এমন দৃশ্য দেখার পর কৌতুহল চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে জানা গেল, যাদের ফোনে ফিচারটি দেখা যাচ্ছে তাদের সবার মধ্যে একটি বিষয় এক, তারা সবাই যাত্রাপথে ‘মোশন সিকনেস’ বা গতিজনিত শারীরিক অস্বস্তিতে ভোগেন।
‘ভেহিকল মোশন কিউস’ বা বিন্দুর এ নাচ আইফোনের কম পরিচিত একটি ফিচার, যা যাতায়াতকালীন অস্বস্তি কমানোর জন্য তৈরি। আইফোনের অ্যাক্সেলরোমিটার সেন্সর ব্যবহার করে ফিচারটি চালুর পর স্ক্রিনের দুই প্রান্তে কিছু অ্যানিমেটেড বিন্দু ফুটে ওঠে, যা গাড়ি বা ট্রেনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নড়াচড়া করে।
ফিচারটি নিয়ে ব্যবহারকারীদের মতামত মিশ্র হলেও গেল কয়েক মাসে অনেকেই এ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। যাদের গাড়িতে উঠলেই বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরার সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য এসব ডট বা বিন্দু এক জাদুকরী সমাধান হতে পারে।
গতিজনিত অসুস্থতা ও শরীর বিজ্ঞানের সমীকরণ
বিবিসির এ প্রতিবেদনের জন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানা গিয়েছে, যারা মোশন সিকনেস নিয়ে গবেষণা করেন তাদের বেশিরভাগ নিজেরা এ সমস্যায় ভোগেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা’র অধ্যাপক ইমেরিটাস টম স্টফরেগেন ১৯৮০-এর দশক থেকে মোশন সিকনেস নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেছেন, “কোনো ক্রুজ জাহাজে ভ্রমণে গেলে আমি প্রায় ৭২ থেকে ৯৬ ঘণ্টা নিজের বাংকে কাত হয়ে পড়ে থাকি। কিচ্ছু খেতে পারি না, উঠতেও পারি না।”
তবে মোশন সিকনেসের মূল কারণ কী তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যাটি হচ্ছে ‘সেন্সরি কনফ্লিক্ট থিওরি’ বা অনুভূতির দ্বন্দ্ব।
এ তত্ত্ব অনুসারে, মানুষের ভেতরের কান ঠিকই গাড়ির গতি বা নড়াচড়া টের পায় তবে চোখ দেখে আশপাশের স্থির সব বস্তু, যা দেখে মনে হয় তিনি কোথাও যাচ্ছেন না। কানের অনুভূতি ও চোখের দৃশ্যের এ অমিলই দেহে অস্বস্তি তৈরি করে।
এ তত্ত্ব মানতে নারাজ অধ্যাপক স্টফরেগেন। তার ভাষ্য, মূল সমস্যাটি তৈরি হয় মানুষের দেহের ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়ায়। দেহের পেশি ও অন্যান্য অঙ্গ প্রতিনিয়ত অনুমানের চেষ্টা করে আমরা পরবর্তীতে কোন দিকে নড়াচড়া করতে যাচ্ছি। যখনই এ পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব নড়াচড়ার অমিল হয় তখনই দেহ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
বিষয়টি হয়ত ব্যাখ্যা করতে পারে কেন গাড়ির যাত্রীদের বমি ভাব হলেও চালকদের সাধারণত তা হয় না। কারণ চালক নিজেই গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং গাড়ির নড়াচড়া তার জানা থাকে।
কারণ যাই হোক না কেন অনুভূতির এ বিভ্রান্তি অনেকের মনেই তীব্র অস্বস্তি ও বমি ভাব তৈরি করে বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র ক্লিনিক্যাল অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ক্রিস্টেন স্টিনারসন। দেহের ভারসাম্য রক্ষাকারী ‘ভেস্টিবুলার সিস্টেম’ নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি।
স্টিনারসন বলেছেন, “অনুভূতির এ বিচ্যুতিই মানুষকে দিশেহারা বা মাথা ঘোরার অনুভূতি দেয়। সম্ভবত মানববিবর্তনের কোনো বিশেষ খেয়ালের কারণে এ অনুভূতি থেকে তীব্র বমি ভাব তৈরি হয়।”
তার ব্যাখ্যা অনুসারে, বিবর্তনের ধারায় মানুষ হয়ত দিশেহারা বা মাথা ঘোরার অনুভূতিকে বিষাক্ত কিছু খাওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নিতে শিখেছে। ফলে বিষমুক্ত হতে দেহ বমি করে তা বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে।
স্টিনারসন বলেছেন, মানুষ যদি কোনোভাবে দেহকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিতে পারেন, যে আপনি কীভাবে কোনো স্থানের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছেন তবে এ মোশন সিকনেস অনেকটাই কমে আসে।
আইফোনের সেইসব ডট বা বিন্দুও ঠিক এ নীতিতেই কাজ করে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, “এসব বিন্দু আপনাকে শূন্যে বা নির্দিষ্ট স্থানে আপনার গতিপথের স্পষ্ট ধারণা দেয়। ভিজ্যুয়াল ফিডব্যাক বা দৃশ্যমান সংকেত নিয়ে বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এমনটা বেশ কার্যকর হতে পারে।”
যেমন, বাজারে মোশন সিকনেস প্রতিরোধী এক ধরনের অদ্ভুত দেখতে চশমা পাওয়া যায়, যার ভেতরে তরল পদার্থ থাকে। গাড়ি চলার সময় সেই তরল কানের ও চোখের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নড়াচড়া করে। গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব চশমা সত্যিই কাজ করে।
স্টিনারসন বলেছেন, এসব বিন্দু তার নিজের মোশন সিকনেস কমাতেও খানিকটা সাহায্য করেছে।
“সবাই মনে করে আমার ফোনের স্ক্রিনে হয়ত কোনো সমস্যা হয়েছে! তবে এসব ডট সত্যি অসাধারণ।”
ফিচারটি চালু করতে আইফোনের ‘সেটিংস’ অপশনে গিয়ে সেখান থেকে ‘অ্যাক্সেসিবিলিটি’তে যেতে হবে। এরপর সেখানে থাকা ‘মোশন’ ফিচার থেকে ‘ভেহিকল মোশন কিউস’ অপশনটি বাছাই করতে হবে।
ফিচারটি সারাক্ষণ চালু রাখা যায় বা গাড়ি বা ট্রেনের গতি শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার অপশনও বেছে নেওয়া যায়। অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ দিয়েও এমনটা করা সম্ভব। গুগলের পিক্সেল ফোনেও এমন ফিচার আসার গুঞ্জন রয়েছে।
এসব বিন্দুর আকার ও রং পরিবর্তন করা যায়। রং-বেরঙের এসব ডটের কারণে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে চমৎকার আলাপের সুযোগও তৈরি হয়। মোশন সিকনেসে ভোগা অনেকের মতে, ফিচারটি বিশেষ কাজে আসেনি, তবে অনেকের কাছে তা অলৌকিক সমাধানের মতো।
তবে আইফোন ডটের ভক্তরা একটি বিষয়ে একমত, ফিচারটি কেবল তখনই উপযোগী যখন আপনি চলন্ত অবস্থায় ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে মোশন সিকনেসে ভোগেন।
আজকাল স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের প্রায় পুরোটাই দখল করে নিয়েছে। যে অল্প কিছু সময়ে ফোন ব্যবহারের উপায় ছিল না, নতুন প্রযুক্তি সেখানেও প্রবেশের পথ তৈরি করছে।
ব্যাটারির আয়ু বাড়ায় স্ক্রিন জ্বলছে আগের চেয়ে দীর্ঘ সময়। আর ইলন মাস্ক ও তার প্রতিযোগীরা মহাকাশজুড়ে এত স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছেন যে, আগে যেসব দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক ছিল না সেখানেও এখন ওয়াই-ফাই পৌঁছে যাচ্ছে।
গুঞ্জন রয়েছে, অ্যাপল এমন ‘এয়ারপডস’ তৈরিতে কাজ করছে, যাতে ক্যামেরা যোগ থাকবে। ছবি তোলার জন্য নয়, বরং কোনো স্ক্রিন ছাড়াই এআইচালিত ভয়েস টুলকে পথ দেখতে সাহায্য করবে এই ক্যামেরা। ফলে হেঁটে যাওয়ার মতো স্ক্রিনমুক্ত বিরল মুহূর্তগুলোতেও প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।