‘কানেক্টেড বল’ থেকে অফসাইড: কাতার বিশ্বকাপের প্রযুক্তিগুলো
প্রতিটি স্টেডিয়ামের ৪২টি ব্রডকাস্ট ক্যামেরার মধ্যে আটটি ক্যামেরা সুপার স্লো মোশন এবং চারটি ক্যামেরা আল্ট্রা স্লো মোশন ভিডিও ধারন করে।
প্রযুক্তি আর ফুটবলের যাত্রাপথকে সমান্তরাল বলে মানে ফুটবল বিশ্বের মোড়ল ফিফা; সংস্থাটির সে দাবির প্রমাণ মিলছে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ।
আডিডাসের তৈরি অফিশিয়াল ম্যাচ বলের ভেতরে লুকানো মোশন সেন্সর থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের ওপর উড়তে থাকা ড্রোনের ভিডিও ফিড হয়ে আসা তথ্য-উপাত্ত কার্যত ম্যাচের ফলাফলই বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ফিফা বলছে, পিচের ভেতরে বাইরে ভক্তদের অভিজ্ঞতা আরও ‘সুমধুর’ করতেই কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ প্রযুক্তির এ সর্বজনীন উপস্থিতি; যদিও সৌদি আরবের সঙ্গে ম্যাচের পর সম্ভবত ফিফার এই আওয়াজ সহজ ভাবে নিতে পারছেন না আর্জেন্টাইন ভক্তরা।
বলের মধ্যেই সেন্সর:
এবারের বিশ্বকাপের জন্য ‘আল রিহলা’ নামের বল বানিয়েছে আডিডাস। এর ভেতরে আলাদা মোশন সেন্সর বসিয়ে দিয়েছে স্পোর্টসওয়্যার নির্মাতা কোম্পানিটি; সেন্সর বলের মাঝখানে ধরে রাখার জন্য আছে বিশেষায়িত সাসপেনশন সিস্টেম।
তবে, প্রযুক্তি বাজারে প্রচলতি আর দশটি মোশন সেন্সরের মতো নয় আল রিহলার সেন্সর; প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার করে ম্যাচ চলাকালীন বলের গায়ে লাগা প্রতিটি স্পর্শ চিহ্নিত করে পারে এটি।
তাৎক্ষণিকভাবে বলের সেন্সর থেকে তথ্যাদি পান ম্যাচ কর্মকর্তারা। আগের কোনো বিশ্বকাপের বলের ভেতরে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের নজির নেই বলে দাবি আডিডাসের।
নিজস্ব ওয়েবসাইটে ফিফা বলছে, ফুটবলারের অবস্থান বিষয়ক ডেটার সঙ্গে আল রিহলার সেন্সর থেকে পাওয়া ডেটা সমন্বয় করে আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি আর ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিকে (ভিএআর) সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই প্রযুক্তি।
এর ফলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতেও দেরি হয় না রেফারিদের।
কীভাবে কাজ করে আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি?
মাঠে দৌড়ে এবং মাঠের বাইরে বসে ভিডিও দেখে ম্যাচের নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন, এমন কর্মকর্তাদের দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করাই ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি’র মূল উদ্দেশ্য বলে দাবি ফিফার।
এ প্রযুক্তির কেন্দ্র রয়েছে প্রতিটি স্টেডিয়ামের ছাদের নিচে বসানো ১২টি করে ট্র্যাকিং ক্যামেরা। ক্যামেরাগুলো ম্যাচের বল এবং প্রতি খেলোয়ারের ২৯টি ডেটা পয়েন্টের ওপর নজর রেখে তাদের সঠিক অবস্থানের ডেটা প্রতি সেকেন্ড ৫০ বার করে ম্যাচ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায়।
খেলোয়ারের চার হাত-পাসহ অফসাইড ঘোষণা করার জন্য যে বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখতে হয়, তার সবই আছে ওই ২৯টি ডেটা পয়েন্টের মধ্যে। আর এতে অংশ নেয় আল রিহলার মোশন সেন্সরও।
প্লেয়ারের হাত-পায়ের অবস্থানের তথ্যের সঙ্গে বলের মোশন সেন্সরের ডেটা সমন্বয় করে তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাচের ‘ভিডিও অপারেশন রুম’-এর কর্মকর্তাদের জানান দেয় এআই। পাস দেওয়ার মুহূর্তে বল পাওয়া খেলোয়াড় অফসাইডে ছিলেন কি না তা নির্ধারণ করতে পারে এআইটি।
মাঠের রেফারিকে অফসাইডের বিষয়ে জানান দেওয়ার আগে ভিডিও অপারেশন রুমে এআইয়ের সতর্কবার্তা যাচাই করে দেখেন কর্মকর্তারা।
এআই অফসাইড নির্ধারণে সময় নেয় কয়েক সেকেন্ড; তারপর মাঠের রেফারি বিষয়টি ভিডিও দেখে নিশ্চিত করেন। এরপর এআইয়ের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি থ্র্রিডি অ্যানিমেশন স্টেডিয়ামের বড় পর্দাতেও দেখায় ফিফা, যেন দর্শকরাও অফসাইডের কারণটি বুঝতে পারেন।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি
২০১৮ সালের বিশ্বকাপ থেকেই ‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেম’ ব্যবহার করছে ফিফা। সংস্থাটির দাবি, বিশ্বব্যাপী একশ’র বেশি প্রতিযোগিতায় সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এ প্রযুক্তি।
ভিআর সিস্টেম নির্দিষ্ট চারটি ক্ষেত্রে রেফারির সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ভূমিকা রাখতে পারে; সেগুলো হলো:
গোল হলে এবং গোলের আগে কোনো ফাউল হলে।
পেনাল্টি এবং পেনাল্টির আগে কোনো ফাউল হলে।
সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হলে (দ্বিতীয়বার হলুদ কার্ড দেখানোর বেলায় নয়)।
পরিচয় নিয়ে কোনো বিভ্রান্তিত হলে।
ফিফা জানিয়েছে, ম্যাচ চলাকালীন এ চারটি বিষয়ের ওপর মাঠের বাইরে থেকে নজর রাখে ভিএআর টিম। মাঠের রেফারি বড় কোনো ভুল করলে অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা তার চোখ এড়িয়ে গেলে কেবল তখনই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন মাঠের বাইরে থাকা কর্মকর্তারা।
কাতারের আটটি স্টেডিয়ামের জন্য ‘ভিডিও অপারেশন রুম (ভিওআর)’ একটি এবং সবগুলো স্টেডিয়াম ফাইবার অপটিক-কেবলের মাধ্যমে দোহার ভিওআর রুমের সঙ্গে সংযুক্ত বলে জানিয়েছে ফিফা।
প্রতিটি স্টেডিয়ামের ৪২টি ব্রডকাস্ট ক্যামেরার ভিডিও ফিডে প্রবেশাধিকার আছে ভিএআর দলের সদস্যদের। এর মধ্যে আটটি ক্যামেরা সুপার স্লো মোশন এবং চারটি ক্যামেরা আল্ট্রা স্লো মোশন ভিডিও ধারণ করে।
আর ভিএআর দলে আছেন একজন প্রধান ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি এবং তার তিন সহযোগী। এরা প্রত্যেকেই ফিফার সেরা ভিডিও রেফারি দলের অংশ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অতঃপর গোল-লাইন
বলের পুরোটাই গোল লাইন পার করেছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে গোল-লাইন প্রযুক্তি। ২০১৪ সাল থেকেই এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ফিফা।
এ প্রযুক্তির মূল শর্ত হচ্ছে, গোল হওয়ার জন্য বলের পুরোটাই বল লাইন পার হতে হবে। রেফারিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করে এ প্রযুক্তি। আর মাঠের রেফারির কাছে এর নোটিফিকেশন যায় এক সেকেন্ডের মধ্যে; অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন রেফারি।
কেবল রেফারি আর ম্যাচের কর্মকর্তাদের ঘড়িতেই যায় এ নোটিফিকেশন। ফিফা জানিয়েছে, স্টেডিয়ামের ক্যাটওয়াক অথবা ছাদের নিচে বসানো ১৪টি দ্রুত গতির ক্যামেরা ব্যবহার করে এ প্রযুক্তি।
ক্যামেরা ফিডের ডেটা ব্যবহার করে পরিস্থিতির থ্রিডি দৃশ্যায়ন স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় তুলে ধরা যায় দর্শকদের সুবিধার জন্য।
