Published : 12 Mar 2026, 02:26 PM
ঘুমের সময় শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে বহু বছর ধরে। এর চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সিপ্যাপ নামের একটি যন্ত্র, যা মুখে মাস্কের মাধ্যমে বাতাস দিয়ে ঘুমের সময় শ্বাসনালী খোলা রাখে।
১৯৮১ সালে অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক কলিন সালিভান ‘কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার’ বা সিপ্যাপ প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেন। এ নিয়ে ওয়্যার্ড ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনও স্লিপ অ্যাপনিয়া চিকিৎসায় এটিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়, যদিও অনেক রোগীর পক্ষে নিয়মিত ব্যবহার করা সহজ হয় না।
লন্ডনের কিংস কলেজের শ্বাসযন্ত্র ও ঘুম সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়র্গ স্টেইয়ার বলেন, “সিপ্যাপ কাজ করে না এমন নয়, এটি কাজ করে, কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, নিয়মিত ব্যবহার করা অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে যায়।”
তিনি জানান, গবেষণায় দেখা গেছে সিপ্যাপ ব্যবহার করলে সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ কমতে পারে।
তবে, বাস্তবে অনেক মানুষ ঘুমের সময় মুখে মাস্ক পরে থাকতে অস্বস্তি অনুভব করেন। কারও কাছে এটি ক্লসট্রোফোবিক মনে হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে চিকিৎসা শুরুর তিন মাস পর মাত্র ৩৮ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় সময় সিপ্যাপ ব্যবহার করেছেন। আর দুই বছর পর এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ।
বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ কোটি মানুষের মধ্যে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রেই সম্ভাব্য আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা আট কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের রোগ এখনও শনাক্তই হননি।
এই বাস্তবতায় বিকল্প চিকিৎসা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। স্টেইয়ার ‘জিউসওএসএ’ নামে একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা রাতে চিবুকের নিচে পরতে হয়। এটি হালকা বৈদ্যুতিক সংকেত দিয়ে একটি স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে, যাতে ঘুমের সময় পেশির টান কমে গিয়ে শ্বাসনালী চেপে যাওয়া ঠেকানো যায়।
প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে তুলনামূলক সরু গলার রোগীরা এতে ভালো সাড়া দিয়েছেন। তার ভাষায়, “সম্ভবত যন্ত্রটি পেশির আরও কাছাকাছি অবস্থান করায় এমনটি হয়েছে।”
সিপ্যাপের বিকল্প হিসেবে এরইমধ্যে কিছু যান্ত্রিক পদ্ধতিও ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ম্যান্ডিবুলার অ্যাডভান্সমেন্ট ডিভাইস বা এমএডি, যা মুখরক্ষকের মতো পরা হয় এবং নিচের চোয়ালকে সামান্য সামনে এনে শ্বাসনালী সংকোচন কমানোর চেষ্টা করে।
বার্টস হেলথ এনএইচএস ট্রাস্টের পরামর্শক অর্থোডন্টিস্ট আমা জোহাল বলেন, “যে রোগীর উপসর্গ খুব বেশি কিন্তু তিনি সিপ্যাপ সহ্য করতে পারেন না, তার বেলায় সমাধান কী? আমরা তো তাকে কিছুই দিচ্ছি না।”
৩২কো নামের একটি স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী সোনিয়া সামোকি বলেন, এই যন্ত্র ব্যবহারে দন্তচিকিৎসকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, “এটি ব্যবহারের অনুমতি শুধু দন্তচিকিৎসকদেরই আছে। তাই মুখ পরীক্ষা করে আপনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করতে হবে, তবেই এটি কার্যকর হবে।”
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এর উদ্দেশ্য সিপ্যাপকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া নয়। “আমরা বলছি না যে সবাই সিপ্যাপ ছেড়ে দিয়ে এই যন্ত্র ব্যবহার করবেন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করে রোগীর সহনশীলতা ও পছন্দের ওপর।”
এদিকে ‘ইনস্পায়ার থেরাপি’ নামের একটি চিকিৎসা পদ্ধতিও ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে শরীরে একটি ইমপ্লান্ট বসিয়ে স্নায়ু উদ্দীপনার মাধ্যমে শ্বাসনালী খোলা রাখতে সহায়তা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ায় ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি রোগী এই চিকিৎসা নিয়েছেন।
ইনস্পায়ার-এর জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা পরিচালক রুচির প্যাটেল বলছেন, এতে দিনের ঘুমভাব কমে এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার তীব্রতা ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পাশাপাশি নাক ডাকার মাত্রাও ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমার তথ্য পাওয়া গেছে।
ওষুধভিত্তিক চিকিৎসাও সামনে আসছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ অ্যান্ড ফুড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্থূলতার সঙ্গে যুক্ত মাঝারি থেকে গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য ‘জেপবাউন্ড’ নামের একটি ওজন কমানোর ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে।
এদিকে অ্যাপনিমেড নামের একটি স্টার্টআপ এমন একটি রাতের ওষুধ তৈরি করছে, যা স্নায়ু ও পেশির কার্যপ্রণালিকে লক্ষ্য করে শ্বাসনালীর স্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করে।
কোম্পানিটির প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা জন ক্রোনিন বলেন, “দীর্ঘদিন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়াকে মূলত শারীরিক গঠনের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, তাই সমাধানও ছিল যান্ত্রিক। পরে প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি এমন চিকিৎসা তৈরি করতে পারি যা সরাসরি এই সমস্যার জৈবিক দিককে লক্ষ্য করবে?”
তবে নতুন প্রযুক্তি এলেও চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দেন, সিপ্যাপ এখনও অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আমান্ডা সাথ্যাপালা বলেন, “সিপ্যাপ সম্ভবত সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা, কারণ এটি সরাসরি শ্বাসনালীতে বাতাস প্রবাহিত করে।”
তার মতে, মূল সমস্যা যন্ত্রে নয়, বরং ব্যবহার অভ্যাসে। “সঠিক পদ্ধতি যাচাই করার আগেই আমি হাল ছেড়ে দিতে চাই না,” বলেন তিনি।
সিপ্যাপ ব্যবহার অনেকটা ওজন কমানো, ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যায়াম শুরু করার মতো আচরণগত পরিবর্তনের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন এই গবেষক।