১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

চিলির ৫০০ বছরের পুরানো মমিতে মিলল গুটিবসন্তের ডিএনএ

উত্তর চিলির এক ইনকা সম্প্রদায়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে শুরুর দিকের স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক যুগে মারা যাওয়া দুজন ব্যক্তির মমি থেকে প্রাচীন এ ভাইরাসের ডিএনএ মিলেছে।

চিলির ৫০০ বছরের পুরানো মমিতে মিলল গুটিবসন্তের ডিএনএ
যে দুটি মমি থেকে গুটিবসন্তের প্যাথোজেন মিলেছে, তারা সাবেক ইনকা সাম্রাজ্যের দক্ষিণ অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 02:51 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

চিলিতে পাওয়া প্রায় পাঁচশ বছরের পুরানো দুটি মমি থেকে প্রাচীন গুটিবসন্তের ডিএনএ-এর সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।

আণবিক এ আবিষ্কারে উঠে এসেছে, ১৬ শতকে আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর কীভাবে এ মরণঘাতী ভাইরাস তাণ্ডব চালিয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগটি কীভাবে নিজের রূপ বদলেছে।

রয়টার্স লিখেছে, প্রায় পাঁচ শতক আগে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ বা আমেরিকা মহাদেশে পা রাখার সময় উপনিবেশ গড়ে তোলার তাগিদে নিজেদের সঙ্গে রেখেছিলেন মাস্কেট বন্দুক, কামান, বর্ম, ঘোড়া ও শিকারি কুকুর।

স্থানীয় আদিবাসীদের ওপর তারা সবচেয়ে বড় আঘাতটি এনেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপায়ে, গুটিবসন্তসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের মাধ্যমে, যা নিমেষেই উজাড় করে দিয়েছিল স্থানীয়দের।

ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চল বা ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড’ থেকে অজান্তেই আমেরিকায় বয়ে আনা সেই মারণব্যাধি গুটিবসন্তের প্রথম সরাসরি আণবিক বা মলিকিউলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা, যা একসময় মেসোআমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার লাখ লাখ মানুষকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল।

উত্তর চিলির এক ইনকা সম্প্রদায়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে শুরুর দিকের স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক যুগে মারা যাওয়া দুজন ব্যক্তির মমি থেকে প্রাচীন এ ভাইরাসের ডিএনএ মিলেছে।

‘ভারিওলা’ নামের এক প্যাথোজেনের আক্রমণে গুটিবসন্ত রোগ হয়। ওই দুটি মমির দেহে পাওয়া ভ্যারিওলা ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণে জানা গেছে, এটা ভাইরাসের এমন এক বিলুপ্ত ধারার অন্তর্ভুক্ত, যা বিবর্তনের ধারায় মধ্যযুগীয় ইউরোপ ও পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ছড়িয়ে পড়া বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি অবস্থানে ছিল।

১৪৯২ সালে ইউরোপীয়রা প্রথম আমেরিকায় পৌঁছালে সেখানকার আদিবাসীদের গুটিবসন্তের সঙ্গে কোনো পূর্বপরিচয় ছিল না। ফলে তাদের দেহে এ রোগের বিরুদ্ধে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটিও গড়ে ওঠেনি।

মানুষ থেকে মানুষে স্পর্শের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এ ভাইরাস এবং এর প্রভাবে আদিবাসী জনসংখ্যার এক বিপর্যয়কর পতন ঘটে।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।

এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন’-এর জেনিটিক্স গবেষক ব্রুনো রোমেরো গঞ্জালেস বলেছেন, “আমেরিকায় নথিবদ্ধ গুটিবসন্তের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাদুর্ভাবটি ঘটেছিল ১৫১৮ সালে হিসপানিওলা’ দ্বীপে। ওই সময় স্প্যানিশরা সেখানে বসতি গড়েছিল।”

ঐতিহাসিক সেই হিসপানিওলা দ্বীপটি বর্তমানে হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিক এই দুই দেশে বিভক্ত।

গবেষণার সহ-লেখক ও ওই একই কলেজের জেনিটিক্স গবেষক শিগেকি নাকাগোমে বলেছেন, “মানবজাতির ইতিহাসে গুটিবসন্ত অন্যতম ধ্বংসাত্মক সংক্রামক রোগ, যা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার বছর ধরে মানব সমাজকে আক্রান্ত করেছে।

“১৯৮০ সালে বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়ার আগে রোগটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।”

নির্দিষ্ট কিছু হিসেব অনুসারে, আমেরিকায় গুটিবসন্ত ও অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগে প্রায় ৯০ শতাংশ আদিবাসী মারা যান। যা পরবর্তীতে স্প্যানিশদের আধুনিক মেক্সিকোর ‘অ্যাজটেক সাম্রাজ্য’, মধ্য আমেরিকার ‘মায়া নগর-রাষ্ট্র’ এবং ইকুয়েডর, পেরু ও চিলি জুড়ে বিস্তৃত ‘ইনকা সাম্রাজ্য’ জয় করতে সহায়তা করেছিল।

প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত মমি

যে দুটি মমি থেকে গুটিবসন্তের প্যাথোজেন মিলেছে, তারা সাবেক ইনকা সাম্রাজ্যের দক্ষিণ অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন।

উত্তর চিলির কামারোনেস কোভের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে তাদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে একজন ছিলেন ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারী ও অন্যজন ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণ।

‘ইউনিভার্সিটি অফ চিলি’র বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রপোলজিস্ট ও এ গবেষণার সহ-লেখক কনস্তানজা দে লা ফুয়েন্তে কাস্ত্রো বলেছেন, “দেহ দুটি প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত মমি হয়ে গিয়েছিল এবং এতে উট জাতীয় প্রাণীর পশমী কম্বলে পেঁচিয়ে বিভিন্ন সমাধিসামগ্রীসহ কবর দেওয়া হয়েছিল।

“কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক মমিকরণের পার্থক্য বোঝাটা জরুরি। এদের দেহ কাপড়ে মোড়ানো থাকলেও মিশরীয় মমির মতো কোনো রাসায়নিক বা শারীরিকভাবে পরিবর্তন করা হয়নি। এভাবে কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে সমাহিত করার রীতি ইনকাদের মধ্যে আগেই প্রচলিত ছিল।”

তারা ঠিক কবে গুটবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে না পারলেও সময়কালটি ষোড়শ শতাব্দীর দিকে বলে নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা। ফ্রান্সিসকো পিজারোর নেতৃত্বে স্প্যানিশরা ১৫৩০-এর দশকে ইনকা সম্রাটকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।

লাখ লাখ মানুষ হত্যার পাশাপাশি গুটিবসন্ত আদিবাসীদের ওপর গভীর মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হেনেছিল। তীব্র জ্বর, রক্তক্ষরণকারী ফোসকা ও বিকলাঙ্গতার মতো লক্ষণ নিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ রোগের কারণে বহু আদিবাসী বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, দেবতারা তাদের ত্যাগ করেছেন বা স্প্যানিশদের শক্তির কাছে তারা অসহায়।

দুটি মমি থেকে সংগৃহীত ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করে প্যাথোজেনটির বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য মিলেছে।

জিনোম দুটি প্রায় হুবহু একই রকম, যা ইঙ্গিত করে যে তারা দুজন একই প্রাদুর্ভাব বা একই ধরনের ভাইরাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছিলেন।

গবেষকরা বলছেন, ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত এ প্যাথোজেনটির দীর্ঘ জিনগত বিবর্তন ঘটেছিল। তবে স্প্যানিশদের ঔপনিবেশিকতার সময়ে গুটিবসন্ত মহামারির রূপ নিলে ভাইরাসের রূপান্তরের গতি ধীর হয়ে যায় এবং ১৭৯৬ সালে প্রথম প্রতিষেধক টিকা উদ্ভাবনের পর তা আবার গতি পায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে বোঝা যায় ভাইরাসটি সেরা এক বিবর্তনীয় স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল, যার ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে এর নতুন করে কোনো খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।

১৯৭৭ সালে সোমালিয়ায় শেষবারের মতো স্বাভাবিকভাবে গুটিবসন্ত রোগী চিহ্নিত হয়। এর তিন বছর পর ১৯৮০ সালে গুটিবসন্তকে মানব ইতিহাসের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়া সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।