০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

শিকারির চোখ ফাঁকি দিয়ে যেভাবে পালিয়ে বাঁচে প্রজাপতি

প্রজাপতিদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে টিকে থাকা ও সফল হওয়ার পেছনে এই দৃষ্টিবিভ্রম কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিকারির চোখ ফাঁকি দিয়ে যেভাবে পালিয়ে বাঁচে প্রজাপতি

স্ট্রাইপ বা অন্যান্য বোল্ড বা গাঢ় দাগের মাধ্যমে ‘মোশন ড্যাজল’ বা গতির বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বিজ্ঞানীদের এমন ধারণা বেশ পুরনো। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Oct 2026, 03:37 PM

Updated : 02 Oct 2026, 03:37 PM

বাতাসে ওড়ার সময় কোনো পাখি প্রজাপতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে তখন পাখিটি আসলে এমন কিছু দেখতে পায়, যা বাস্তবে সেখানে নেই, অর্থাৎ, পতঙ্গটির নিচের ডানাগুলো যেভাবে নড়ছে বলে মনে হয়, সেগুলোর আসল গতিপথ হয়ত তেমন নয়।

শিকারি পাখিটি এই দৃষ্টিবিভ্রম বা অপটিক্যাল ইল্যুশন বুঝতে পারার আগেই প্রজাপতিটি সহজেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

প্রকৃতির এই আত্মরক্ষা কৌশল নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডানার বৈপরীত্যপূর্ণ ধরনের সঙ্গে ডানার নড়াচড়া মিলে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর গতির সংকেত তৈরি করে। ফলে শিকারি প্রাণীদের পক্ষে ওড়ার সময় প্রজাপতির সঠিক গতিবেগ ও দিক নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইংল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ এক্সটার’-এর অধ্যাপক ও ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশ পাওয়া এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক জোলিয়ন ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “প্রজাপতির ডানার প্যাটার্নগুলো এদের ডানার ঝাপটানির সঙ্গে মিলে এমন সব দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করে, যার কারণে প্রজাপতিটিকে তার আসল গতিপথের চেয়ে অন্য কোনো দিকে ছুটছে বলে মনে হয়।

“একটি পাখি যখন প্রজাপতিটিকে ধরার জন্য ঠিক সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তটিতে আক্রমণ করে তখন এই দৃষ্টিবিভ্রমই প্রজাপতির জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট।”

স্ট্রাইপ বা অন্যান্য বোল্ড বা গাঢ় দাগের মাধ্যমে ‘মোশন ড্যাজল’ বা গতির বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বিজ্ঞানীদের এমন ধারণা বেশ পুরনো।

তবে জেব্রা, সাপ ও টিকটিকির মতো প্রাণী নিয়ে করা আগের বিভিন্ন পরীক্ষাতে মিশ্র ফলাফল মিলেছিল। কারণ, অনেক গবেষণাতেই ডানার বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক নড়াচড়াকে হিসেবে ধরা হয়নি।

ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “প্রজাপতির ডানাগুলো বেশ নমনীয় পৃষ্ঠের হয়, যা ওড়ার সময় একে অপরের সঙ্গে তালি দেওয়ার মতো কাছে আসে ও দূরে সরে যায়।

“এগুলো ওড়ার সময় ইংরেজি আট আকৃতির মতো সামনে ও পেছনে ঘোরে। এই গতির কারণে সামনের ডানার ওপরের একটি ডোরা বা স্ট্রাইপ নিচের দিকে নামার সময় খুব দৃশ্যমান ও স্পষ্টভাবে মন্থর গতিতে নামতে দেখা যায়।

“কিন্তু ডানা যখন ওপরের দিকে ওঠে তখন ডোরাটি দ্রুত ভাঁজ হয়ে ওপরের দিকে ওড়ার গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মোচড় খায়। এসবকিছু মিলে প্রজাপতির ওপরের দিকের গতির চেয়ে নিচের দিকের গতিটিকে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে। আদতে পতঙ্গটি ওপরের দিকেই উড়ছে।”

বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে গবেষক দল প্রকৃত প্রজাপতির হাই-স্পিড ভিডিও ধারণ, কম্পিউটার মডেলিং, সিমুলেটেড ইভোলিউশন বা অনুকরণভিত্তিক বিবর্তন ও টাচস্ক্রিন পরীক্ষা একসঙ্গে প্রয়োগ করেছে।

অধ্যাপক জোলিয়ন ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “ডোরাকাটা দাগ বা স্ট্রাইপগুলো গতির সংকেত নির্ধারণকারী বিভিন্ন স্নায়ুচক্রকে বিভ্রান্ত করতে দারুণভাবে কাজ করে। ‘বার্বার পোল ইলিউশন’-এর চমৎকার উদাহরণ, যেখানে পাশাপাশি নড়াচড়া করা ডোরাগুলোকে দেখে ওপর বা নিচের দিকে নড়ছে বলে মনে হয়।”

এসব প্যাটার্ন আক্রমণ করার সময় প্রজাপতির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে শিকারির মনে সংশয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

অধ্যাপক ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ভিজুয়াল সিস্টেম ছাড়া শিকারিদের পক্ষে এ বাড়তি ‘বিভ্রান্তি’ কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব।”

তার ভাষ্য, প্রজাপতিদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে টিকে থাকা ও সফল হওয়ার পেছনে এই কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে সব প্রজাপতি এই কৌশল ব্যবহার করে না।

ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “যেসব প্রজাপতি সবচেয়ে কম গতি-বিভ্রান্তি তৈরি করে, সেগুলোর রং সাধারণত বাদামী বা লাল হয়ে থাকে।”

এর মানে, কিছু প্রজাতি ছদ্মবেশ বা সতর্কতামূলক রঙের ওপর বেশি নির্ভর করে, যা শিকারিদের সংকেত দেয় যে, পতঙ্গটি বিষাক্ত বা এর স্বাদ কটু।

এসব প্রভাব আসলেই আক্রমণে প্রভাব ফেলতে পারে কি না তা পরীক্ষা করতে গবেষকরা একশ জন মানব স্বেচ্ছাসেবককে যোগ করে তিন হাজার বার ভার্চুয়াল প্রজাপতি ধরার পরীক্ষা চালিয়েছেন।

অংশগ্রহণকারীরা ভিডিও দেখে স্ক্রিনে ট্যাপ করে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করেন। যেসব প্রজাপতি শক্তিশালী ভিজুয়াল বিভ্রান্তি তৈরি করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে মানুষ এদের আসল অবস্থানের পেছনে, অর্থাৎ দূরে লক্ষ্যস্থির করেছিল।

ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “জ্যান্ত পাখি ও প্রজাপতি নিয়ে শিকারের পরীক্ষা চালানো অনেক দিক থেকেই আদর্শ হতে পারত। তবে বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব ও নৈতিকতার দিক থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়।”

গতির দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে জড়িত স্নায়ুচক্রগুলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে বেশ মৌলিক হওয়ায় গবেষকরা বলছেন, এ গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

প্রজাপতিদের একাধিক শিকারিকে মোকাবেলা করতে হয়। আর গতির এই বিভ্রান্তি সব শিকারিকে সমানভাবে বোকা নাও বানাতে পারে।

ট্রোসকিয়ানকোর বলেছেন, “আপাতত আমরা কেবল পাখির দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণা করেছি। তাত্ত্বিকভাবে, ড্রাগনফ্লাই বা রোবার ফ্লাইয়ের মতো বিভিন্ন শিকারি পোকার মধ্যেও অনুরূপ প্রভাব দেখা যেতে পারে।

তবে পাখির তুলনায় এদের দৃষ্টিশক্তি বেশি দ্রুত কাজ করে। ফলে এই দৃষ্টিবিভ্রম হয়ত এদের ক্ষেত্রে কাজ নাও করতে পারে। বাস্তবেও দেখা যায়, ড্রাগনফ্লাই ও রোবার ফ্লাই বেশ সফলভাবে প্রায়ই প্রজাপতি শিকার করে থাকে।”

জীববিজ্ঞানের গণ্ডি পেরিয়ে গবেষক দলের এ ‘মোশন-ভিশন’ টুলের ব্যবহারিক প্রয়োগও থাকতে পারে। যেমন, ফ্লাইট বা কমব্যাট সিমুলেটরে গতি কীভাবে দেখানো হয় তার মান উন্নয়ন করা থেকে শুরু করে, দৃশ্যমানভাবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এমন কোনো চলমান কর্মী, যান, ড্রোন বা রোবটকে সুরক্ষা দিতে বিশেষ প্যাটার্ন তৈরি করা।

ট্রোসকিয়ানকো বলেছেন, “আমাদের তৈরি মডেলগুলো কীভাবে সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করতে এবং কৃত্রিম পরিবেশে মানুষের অস্বস্তি ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে তা নিয়ে কাজ করতে আমি বেশি রোমাঞ্চিত।

“কারণ আমাদের আশপাশে অনেক সময় ফ্ল্যাশিং, চলমান ও ডোরাকাটা বস্তুগুলো নানামুখী ক্ষতি বা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”