১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্যাক ডোর বিতর্ক: ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ফের আদালতে অ্যাপল

ব্যবহারকারীদের এনক্রিপ্টেড আইক্লাউড ডেটায় প্রবেশের জন্য গোপন পথ বা ব্যাক ডোর চালুর নতুন নির্দেশনার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের আদালতে গেল অ্যাপল।

ব্যাক ডোর বিতর্ক: ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ফের আদালতে অ্যাপল
এ সুরক্ষা ব্যবস্থা অ্যাপল নিজেও ভাঙতে পারে না, যা বাতিল করলে গ্রাহকরা হ্যাকার ও সাইবার হামলাকারীদের ঝুঁকির মুখে পড়বেন। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Aug 2026, 05:16 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

গ্রাহকদের তথ্যের সুরক্ষায় আবারও যুক্তরাজ্য সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ অ্যাপল। ব্যবহারকারীদের সুরক্ষিত এনক্রিপ্টেড তথ্যে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের দেওয়া নতুন নির্দেশনার বিরুদ্ধে ফের আইনি পদক্ষেপ নিল কোম্পানিটি।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের একই ধরনের একটি দাবি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঠিক এক বছর পর আবারও এই নতুন দ্বন্দ্ব শুরু হল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

ব্যবহারকারীদের এনক্রিপ্টেড আইক্লাউড ডেটায় প্রবেশের জন্য গোপন পথ বা ব্যাক ডোর চালুর নতুন নির্দেশনার বিরুদ্ধে আইফোন নির্মাতা এবার ব্রিটেনের আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বলে এ মামলার তথ্য প্রথম প্রকাশ করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

এফটি প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের বেআইনি কর্মকাণ্ড তদারকির ক্ষমতাওয়ালা স্বাধীন বিচারিক আদালত ‘ইনভেস্টিগেটর ট্রাইব্যুনাল’ বা আইপিটি-এ গেল মাসে অভিযোগটি দায়ের করেছে প্রযুক্তি জায়ান্টটি।

আদালতের এক আদেশ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ব্রিটিশ ব্যবহারকারীদের ‘আইক্লাউড’ ডেটা বা সংরক্ষিত তথ্যে প্রবেশের জন্য সরকারকে গোপন পথ বা ‘ব্যাক ডোর’ সুবিধা দিতে অ্যাপলকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

এর আগে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের তথ্যে প্রবেশের অধিকার চেয়ে এমন দাবি করেছিল লন্ডন। তবে এ নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন শুরু হলে গেল বছর যুক্তরাজ্য তাদের সেই প্রাথমিক অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ অ্যাপলকে নতুন এক ‘টেকনিক্যাল ক্যাপাবিলিটি নোটিশ’ বা টিসিএন জারি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এফটি প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাজ্যের ‘ইনভেস্টিগেটিভ পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর অধীনে সরকার যেভাবে টিসিএন নোটিশ জারির অধিকার চর্চা করছে, অ্যাপল সেটাকেই এবার চ্যালেঞ্জ করল।

যুক্তরাজ্যের এ আইন অনুসারে, সন্ত্রাসবাদ বা শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধ তদন্তে থাকা বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি।

এক্ষেত্রে ডেটা সম্পূর্ণ এনক্রিপশনে সুরক্ষিত থাকলেও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে গ্রাহকের তথ্যে প্রবেশাধিকার দিতে বাধ্য করতে পারে দেশটির সরকার।

নতুন এ আইনি পদক্ষেপে অ্যাপলের পাশাপাশি যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও। 

প্রযুক্তি কোম্পানিটির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের একটি আদেশ পাঠানো হয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘প্রাইভেসি ইন্টারন্যাশনাল’-এর কাছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের ‘টিসিএন’ নোটিশ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আগে থেকেই আইপিটি ট্রাইব্যুনালে আলাদা মামলা লড়ছে ‘প্রাইভেসি ইন্টারন্যাশনাল’ ও আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন ‘লিবার্টি’।

জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে অ্যাপলের অভিযোগের শুনানি প্রকাশ্যে করার আবেদন জানিয়েছে মানবাধিকার কর্মীরা। অ্যাপলকে দেওয়া এ টিসিএন নোটিশের আইনি ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা ও পুরো বিষয়টিতে প্রাইভেসি ধরে রাখার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

প্রাইভেসি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সমান্তরাল দুটি অভিযোগ কীভাবে পরিচালনা করা হবে তা নির্ধারণে আগামী মাসে বিচারিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিশেষ এক শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সংগঠনটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, “যুক্তরাজ্য সরকারের গোপন আদেশের বিরুদ্ধে অ্যাপল আবারও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে শুনে আমরা আনন্দিত।

“অ্যাপলের মামলার মূল বিষয়বস্তু যদি অতীতে আলোচিত সেই আদেশটিই হয়, যা তাদের আইক্লাউড স্টোরেজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে জারি হয়েছিল তবে আমাদের ও লিবার্টির দাবির পাশাপাশি অ্যাপলের এই লড়াই ব্যবহারকারীদের প্রাইভেসি ও তথ্যসুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি অ্যাপল ও যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। টিসিএন সম্পর্কিত বিস্তারিত আইনিভাবে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ থাকায় দুপক্ষের কেউই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও দেয়নি।

জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে অ্যাপলের ‘অ্যাডভান্সড ডেটা প্রোটেকশন’ বা এডিপি প্রোগ্রামের আওতায় থাকা এনক্রিপ্টেড ডেটা দেখার সুযোগ চেয়ে গত বছর প্রথম টিসিএন ইস্যু করেছিল যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে অ্যাপলের যুক্তি ছিল, এ সুরক্ষা ব্যবস্থা অ্যাপল নিজেও ভাঙতে পারে না, যা বাতিল করলে গ্রাহকরা হ্যাকার ও সাইবার হামলাকারীদের ঝুঁকির মুখে পড়বেন। ডেটা দেখার জন্য কোনো ব্যাক ডোর বা গোপন পথ তৈরি করা হলে পুরো তথ্যই অ্যাপলের কাছে দৃশ্যমান হয়ে যাবে, যা পরবর্তীতে পরোয়ানা দেখিয়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে বসতে পারে।

এ মতভেদের জেরে পরবর্তীতে ব্রিটিশ গ্রাহকদের জন্য নিজেদের সেই সুরক্ষিত ‘এডিপি’ সেবাটিই বন্ধ করে দিয়েছিল প্রযুক্তি জায়ান্টটি।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবরের মতোই দাবি করে আসছে, যে আইনের অধীনে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নিরাপত্তামূলক নীতিমালা রয়েছে এবং কেবল চরম জরুরি প্রয়োজনেই এই ক্ষমতার ব্যবহার হবে।