Published : 19 Jan 2026, 11:57 AM
প্লেনের ডানা ভাঁজের কথা শুনলে অনেকের মনে হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো ফাইটার প্লেনের ছবি ভেসে উঠবে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বিশালাকার যাত্রীবাহী প্লেনও নিজের ডানা ভাঁজ করতে পারে।
বোয়িং কোম্পানির নতুন বিস্ময় ‘বোয়িং ৭৭৭এক্স’ ঠিক এই প্রযুক্তি নিয়েই হাজির হয়েছে। কেন এ বিশাল প্লেনের ডানা ভাঁজ করা প্রয়োজন এবং কেনইবা ডানা ভাঁজ করে এই প্লেন উড়তে পারে না চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই রোমাঞ্চকর তথ্য।
‘সান ডিয়েগো এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম’-এ রয়েছে ‘এফ৪ইউ-৭ কর্সএয়ার’ ফাইটার। চমৎকার ‘গাল উইংস’ বা শঙ্খচিলের মতো বাঁকানো ডানার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এ শক্তিশালী প্লেনটি। বিমানবাহী রণতরীতে জায়গা বাঁচানোর জন্য এসব ডানা ভাঁজ করে রাখা হত। ডানার অনন্য এ নকশার কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্লেন।
তবে ডানা ভাঁজের এ ধারণাটি কর্সএয়ারের চেয়েও পুরনো। রাইট ব্রাদার্সের প্রথম প্লেন উড্ডয়নের ১৭ বছর পর এফ.এম. অসবর্ন নামে একজন ব্যক্তি এই ভাঁজ করা ডানার পেটেন্ট বা স্বত্বাধিকার করিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদিনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
বর্তমানে এমন কিছু আধুনিক প্লেন রয়েছে, যেগুলোর ডানা ভাঁজ করা যায়। যেমন ‘এফ-৩৫সি’। এর ডানার অগ্রভাগ ভাঁজ করা যায় যাতে বিমানবাহী রণতরীতে আরও বেশি প্লেন রাখা সম্ভব হয়। আরেকটি হচ্ছে, নতুন বোয়িং ‘৭৭৭এক্স’। এটি বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী প্লেন, যেখানে ডানা ভাঁজ করার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে।
জাদুঘরে দেখা সেই কর্সএয়ার প্রেনের মতোই উদ্ভাবনী নকশা রয়েছে বোয়িংয়ের এ প্লেনে, যা মূলত তৈরি হয়েছে বিমানবন্দরে জায়গা বাঁচানোর জন্য।
নতুন বোয়িং প্লেনের ডানা আগের ‘৭৭৭’ মডেলের তুলনায় প্রায় ২৩ ফুট বেশি দীর্ঘ। বোয়িং চাইলে এসব ডানার দৈর্ঘ্য আগের মতোই রাখতে পারত। তবে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য ডানার দৈর্ঘ্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি। এতে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে, এসব ডানা এত দীর্ঘ যে, অনেক বিমানবন্দরে যাতায়াত করা এ প্লেনের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এ সমস্যার সমাধান হিসেবেই ‘ফোল্ডিং উইংটিপস’ বা ডানার অগ্রভাগ ভাঁজের প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে প্লেন নির্মাতা মার্কিন কোম্পানিটি। তবে মাঝ-আকাশে এসব ডানা ভাঁজ হয়ে থাকে না। প্লেনের ভালো পারফরম্যান্সের জন্য এ বাড়তি দৈর্ঘ্যের ডানা প্রয়োজন।
তাত্ত্বিকভাবে ডানা ভাঁজ করা অবস্থায় প্লেন আকাশে থাকতে পারলেও উড্ডয়নের সময় সর্বোচ্চ লিফট বা বাতাসের চাপ ব্যবহার করে উপরে ওঠার জন্য এসব ডানা পুরোপুরি খোলা থাকা জরুরি।
বোয়িং ‘৭৭৭এক্স’ প্লেনের প্রথম ঘোষণা এসেছিল ২০১৩ সালের দুবাই এয়ারশোতে। কোম্পানিটির পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২০ সালে যাত্রা শুরুর কথা ছিল প্লেনটির। তবে এখনও পর্যন্ত যাত্রীবাহী প্লেন হিসেবে চলাচলের অনুমতি পায়নি। ২০২৭ সাল নাগাদ গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা শুরু হতে পারে।
৭৭৭এক্স-এর নকশা বেশ জটিল। ফলে এই দেরি হওয়াটা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর নয়, বিশেষ করে এর ভাঁজ করা ডানার অগ্রভাগ ও এর বিশালাকার বিভিন্ন ইঞ্জিন একেকটি ‘বোয়িং ৭৩৭’ প্লেনের মূল কাঠামোর চেয়েও বড়। এসব মিলিয়েই এর নির্মাণ প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বোয়িং ‘৭৭৭এক্স’ অনেক দিক থেকে ‘৭৭৭’ ও ‘৭৮৭’ মডেলের মতোই, যা পাইলটদের জন্য চালানো সহজ করে তুলবে। তবে প্লেনটি সম্পূর্ণ নতুন ও বিশাল নকশার। ৭৭৭এক্স-এর দুটি সংস্করণ রয়েছে। প্রথমটি ‘৭৭৭-৯’ ও দ্বিতীয়টি তুলনামূলক ছোট আকারের ‘৭৭৭-৮’। এ দুটিই যাত্রীবাহী প্লেন। ৭৭৭-৯ সংস্করণটি ২৫১ ফুটেরও বেশি লম্বা।
উভয় সংস্করণেরই ডানার বিস্তার ২৩৫ দশমিক ৫ ফুট, যা বর্তমানে প্রচলিত ৭৭৭ প্লেনের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন এয়ারপোর্ট গেটের তুলনায় অনেক বেশি প্রশস্ত।
তবে বোয়িং চাইছে না, প্লেনের জন্য বিমানবন্দরগুলোকে পরিকাঠামো পরিবর্তন করতে হোক বা তাদের প্লেনটি নির্দিষ্ট কিছু বিমানবন্দরে সীমাবদ্ধ থাকুক। ফলে এই ‘ভাঁজ করা ডানার অগ্রভাগ’ যোগ করেছে তারা।
এসব ডানা লম্বা হওয়ার পরও এবং জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে বোয়িং এখানে হালকা ওজনের কম্পোজিট উপাদান ব্যবহার করেছে, যা প্লেনের ওজন না বাড়িয়েই ডানার দৈর্ঘ্য বাড়াতে সাহায্য করেছে।