Published : 20 May 2026, 03:22 PM
মেমোরি চিপের বাজারে ব্যাপক ঘাটতির মধ্যেই বোনাস সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ধর্মঘটের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার টেক জায়ান্ট স্যামসাং।
বার্ষিক মুনাফার অংশ ও বোনাসের সর্বোচ্চ সীমা বাতিলের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় ৪৮ হাজার কর্মী ১৮ দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধের হুমকি দিয়েছেন।
এ অচলাবস্থা বিশ্বজুড়ে চিপ সরবরাহ ব্যাহত করাসহ দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
স্যামসাং কর্মীরা কী চাইছেন?
স্যামসাংয়ের কর্মী ইউনিয়ন দাবি করেছে, বোনাসের ওপর থাকা সর্বোচ্চ সীমা, যা বার্ষিক বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত রয়েছে তা যেন বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া কোম্পানির বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১৫ শতাংশ বোনাস ফান্ড হিসেবে রাখারও দাবি তাদের, যা কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
কর্মীরা চাইছেন, স্যামসাং এ পরিবর্তনটি কেবল এ বছরের জন্য নয়, বরং স্থায়ীভাবে কার্যকর করুক।
স্যামসাংয়ের প্রস্তাব কী ছিল?
স্যামসাং অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। ইউনিয়ন ও স্যামসাংয়ের মধ্যকার আলোচনার অনুলিপি থেকে জানা যায়, গেল মার্চ স্যামসাং এক হিসাব তুলে ধরেছিল, সেখানে তাদের ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ‘এসকে হাইনিক্স’-এর কিছু কর্মী তাদের বার্ষিক বেতনের ৬০৭ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস পেতে পারেন।
এর প্রেক্ষিতে স্যামসাং প্রস্তাব করেছে, তাদের মেমোরি চিপ বিভাগের কর্মীরা যেন এসকে হাইনিক্সের কর্মীদের চেয়েও বেশি বোনাস পান সেই ব্যবস্থা করবে কোম্পানি।
এ ছাড়া, স্যামসাং তাদের লজিক চিপ বিভাগের কর্মীদের জন্য ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বোনাসের প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে এসব বোনাস কেবল এ বছরের জন্যই এককালীন দেওয়া হবে। নীতিগতভাবে, স্যামসাং বার্ষিক বেতনের ৫০ শতাংশ বোনাসের যে সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে তা বাতিল করতে রাজি নয়।
এ পরিস্থিতির পেছনে কারণ কী?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের জয়জয়কারের কারণে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স উভয়েরই মুনাফা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। পুরো বিশ্বের মেমোরি চিপ উৎপাদনের সিংহভাগই এ দুটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর এসকে হাইনিক্স আগামী ১০ বছরের জন্য তাদের বোনাসের ওপর থাকা সর্বোচ্চ সীমা বাতিল করেছে। ফলে তাদের কর্মীরা স্যামসাংয়ের কর্মীদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বোনাস পেয়েছেন।
স্যামসাংয়ের কর্মী ইউনিয়নের মতে, এ ঘটনার পর অনেক কর্মী স্যামসাং ছেড়ে এসকে হাইনিক্সে যোগ দিয়েছেন ও স্যামসাংয়ের ইউনিয়নে সদস্য পদের সংখ্যাও হু হু করে বেড়েছে।
এ ধর্মঘটের প্রভাব কেমন হতে পারে?
এর আগে, ২০২৪ সালে স্যামসাংয়ে যে ধর্মঘট হয়েছিল তার তুলনায় এবারের ধর্মঘটটি বড় ও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আগেরবার কেবল ছয় হাজার কর্মী অংশ নিয়েছিলেন।
তবে এবার স্যামসাংয়ের ইউনিয়ন বলেছে, প্রায় ৪৮ হাজার কর্মী এই ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই চিপ বিভাগের কর্মী। এ সংখ্যাটি দক্ষিণ কোরিয়ায় স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের মোট জনবলের প্রায় ৩৮ শতাংশ।
এদিকে, সোমবার একটি আদালত স্যামসাংয়ের করা এক নিষেধাজ্ঞার আবেদন আংশিক মঞ্জুর করেছে। আদালত রায় দিয়েছে, যে কোনো ধরনের কর্মবিরতি বা আন্দোলনের সময়ও কিছু জরুরি উৎপাদন কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় কর্মী সংখ্যা ধরে রাখতে হবে।
এ রায়ের প্রেক্ষিতে স্যামসাং ইউনিয়নকে বলেছে, ধর্মঘট চললেও জরুরি সেবা খোলা রাখতে ৭ হাজার ৮৭ জন কর্মীকে অবশ্যই কাজে যোগ দিতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংটেইক ও হোয়াসেংয়ের মতো জায়গাগুলোতে স্যামসাংয়ের বিভিন্ন চিপ কারখানা তিনটি শিফটে দিনে ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকে।
ধর্মঘট কেন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াল?
বর্তমানে মেমোরি চিপের বাজারে তীব্র সংকট চলছে। এমন সময়ে এ ধর্মঘটের ফলে চিপ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ট্রেন্ডফোর্স’-এর তথ্য অনুসারে, বিশ্বের বৃহত্তম ‘ডিআরএএম’ চিপ নির্মাতা কোম্পানি স্যামসাং। গেল বছরের শেষ নাগাদ বিশ্ব বাজারের ৩৬ শতাংশ তাদের দখলে ছিল।
ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের গুরুত্বপূর্ণ এসব মেমোরি চিপ এখন বিভিন্ন এআই ডেটা সেন্টারের জন্যও জরুরি উপাদান হয়ে উঠেছে।
‘কেবি সিকিউরিটিজ’-এর বিশ্লেষক জেফ কিমের অনুমান, একটি ১৮ দিনের ধর্মঘট বিশ্ববাজারে ডিআরএএম মেমোরির সরবরাহ ৩ থেকে ৪ শতাংশ ও ন্যান্ড মেমোরির সরবরাহ ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে চিপের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তারাও এ ধর্মঘটের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে স্যামসাং থেকে।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এ ধর্মঘটের কারণে চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, যা ২ শতাংশ ধরা হয়েছিল তা থেকে ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে প্রবৃদ্ধি দেড় শতাংশে নেমে আসতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, হিসাবটি করা হয়েছে এমনটা ধরে নিয়ে যে, ধর্মঘটের ফলে প্রায় ১ হাজার ৯৯০ কোটি ডলার সমমূল্যের চিপ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং উৎপাদন ব্যবস্থা আবার পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আরও ‘কয়েক সপ্তাহ’ লেগে যেতে পারে।