Published : 09 Mar 2026, 10:38 AM
আকাশ ও সমুদ্রের পর এবার যুদ্ধের ময়দান দখল করছে মেশিনগান ও বিস্ফোরক সজ্জিত চালকবিহীন স্থলযান বা ইউজিভি। সৈন্য সংকট মেটানো এবং সম্মুখ সমরে মানুষের ঝুঁকি কমাতে ইউক্রেইন ও রাশিয়া উভয় দেশই এখন সরাসরি লড়াইয়ে নামাচ্ছে আর্মড রোবট।
বিবিসি লিখেছে, রুশ আক্রমণের শুরু থেকেই ইউক্রেইন যুদ্ধ উচ্চপ্রযুক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেইনের আকাশে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে নজরদারি ও আত্মঘাতী ড্রোন উড়ছে, আর কৃষ্ণ সাগরে চালকবিহীন ড্রোনবটের আঘাতে রুশ নৌবাহিনী বিপর্যস্ত।
এখন বড় পরিসরে স্থলে যুদ্ধের জন্য অস্ত্রধারী রোবট মোতায়েন শুরু করেছে ইউক্রেইন। এ চালকবিহীন স্থলযান বা ‘ইউজিভি’ এরইমধ্যে যুদ্ধে এদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। এসব রোবট সফলভাবে রুশ আক্রমণ ঠেকানো ও শত্রু সেনাদের বন্দিও করছে।
মানুষ ছাড়াই সরাসরি ইউক্রেইনীয় ও রুশ ‘কিলার রোবট’ একে অপরের মুখোমুখি লড়াই করছে। ইউক্রেইনীয় সেনাবাহিনীর ‘কেটু’ ব্রিগেডের আলেকজান্ডার আফানাসিয়েভ বলেছেন, “রোবট যুদ্ধ এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তবে ঘটছে।”
তার দাবি, বিশ্বের প্রথম ইউজিভি ব্যাটালিয়ন পরিচালনা করছেন তারা। এসব রোবটের ওপর ‘কালাশনিকভ’ মেশিনগানও বসানো হয়েছে।
মেজর আফানাসিয়েভ বলেছেন, “এসব রোবট এমন যুদ্ধক্ষেত্রেও গুলি চালাতে পারে, যেখানে একজন পদাতিক সৈন্য যেতে ভয় পাবেন। তবে, একটি ইউজিভি নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে না।”
তার ব্যাটালিয়ন ব্যাটারিচালিত ও বিস্ফোরক ভর্তি ‘কামিকাজি’ ইউজিভি ব্যবহার করছে, যা শত্রুদের আস্তানা উড়িয়ে দিতে পারে। আকাশে ওড়া ড্রোনের মতো এগুলো কোনো শব্দ করে না। ফলে আক্রমণের আগে শত্রুরা কোনো সতর্কবার্তাও পায় না।
‘৩৩তম ডিটাসড মেকানাইজড ব্রিগেড’-এর ট্যাংক ব্যাটেলিয়নের ডেপুটি কমান্ডার, যার কলসাইন আফগান, তিনি দাবি করেছেন, মেশিনগান সজ্জিত ইউক্রেইনীয় রোবট রুশ সেনাবাহী যানে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। একটি রোবট টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেইনের একটি অবস্থান একাই রক্ষা করে গেছে।
তবে আফগান স্বীকার করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে এসব ‘কিলার রোবট’ বা ঘাতক রোবটের নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কারণে এসব সীমাবদ্ধতা তারা নিজেরাই আরোপ করেছেন।
“আধুনিক ইউজিভিগুলো আংশিক স্বচালিত। এগুলো নিজে নিজে চলতে এবং শত্রুকে শনাক্ত করতে পারে। তবে গুলি চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি এখনও একজন মানুষ বা অপারেটরই গ্রহণ করেন।
“ভুলবশত রোবট কোনো সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করতে বা কাউকে ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে। এ কারণেই গুলি চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি একজন অপারেটরকেই নিতে হয়।
যার মানে, যুদ্ধক্ষেত্রে অধিকাংশ সশস্ত্র ইউজিভি নিরাপদ দূরত্বে বসে অপারেটররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে রিমোট কন্ট্রোলে পরিচালনা করেন। ইউক্রেইনের এসব রোবটে মেশিনগানের পাশাপাশি গ্রেনেড লঞ্চারও লাগানো যায়। এগুলো মাইন পুঁতে রাখা বা কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে এখনও বেশিরভাগ চালকবিহীন যান ব্যবহৃত হচ্ছে রসদ সরবরাহ ও আহত সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে আনার মতো কাজে।
ইউক্রেইনের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি বলেছেন, সশস্ত্র ইউজিভি’র ভূমিকা অচিরেই বহুগুণ বাড়বে।
লন্ডনের ‘চ্যাথাম হাউস’-এ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে এসব রোবট কেবল এককভাবে নয়, বরং এআইচালিত বড় ড্রোন ‘ঝাঁকের’ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
“অদূর ভবিষ্যতে আমরা দেখব শত শত সাশ্রয়ী ও এআই ড্রোন একইসঙ্গে আকাশ, স্থল ও সমুদ্র সব দিক থেকেই আক্রমণ চালাচ্ছে।”
প্রয়োজনই এ উদ্ভাবনের মূল চালিকাশক্তি। আকাশে ড্রোনের আধিপত্যের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ফলে ইউক্রেইনের প্রচলিত ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী এখন সম্মুখ সমর রেখা থেকে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
মেজর আফানাসিয়েভ বলেছেন, পদাতিক বাহিনীকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে “তাদেরকে অবশ্যই ইউজিভি দিয়ে সহায়তা করতে হবে। ইউক্রেইন রোবট হারালে ক্ষতি নেই, তবে দক্ষ ও লড়াকু সৈন্য হারানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।”
ইউক্রেইনীয় সেনাবাহিনী বর্তমানে তীব্র জনবল সংকটে ভুগছে এবং নিহত বা আহত সৈন্যদের জায়গায় নতুন সৈন্য নিয়োগ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, রাশিয়াও ‘কুরিয়ার’-এর মতো যুদ্ধোপযোগী ইউজিভি তৈরি করছে।
রুশ সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুসারে, দেশটির এসব ইউজিভি ‘ফ্লেম থ্রোয়ার’ বা অগ্নিবর্ষক ও ট্যাংকের ভারী মেশিনগানে সজ্জিত হতে পারে এবং টানা পাঁচ ঘণ্টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে। বিভিন্ন ইউক্রেইনীয় অবস্থান উড়িয়ে দিতে ‘লিয়াগুশকা’ নামের এক ধরনের কামিকাজি যান ব্যবহার করছে রুশ বাহিনী।
ইউক্রেইনীয় ইউজিভি উৎপাদক কোম্পানি ‘ডেভড্রয়েড’-এর প্রধান নির্বাহী ইউরি পোরিৎস্কি বলেছেন, রুশ ও ইউক্রেইনীয় বিভিন্ন ঘাতক রোবটের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। তার কোম্পানি গত বছরই সেনাবাহিনীর জন্য শত শত ‘স্ট্রাইক ড্রয়েড’ তৈরি করেছে।
“আজ হোক বা কাল, এমন এক পরিস্থিতি আসবে যখন যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের ঘাতক রোবট আর তাদের ঘাতক রোবট মুখোমুখি লড়াই করবে। রোবট যুদ্ধ শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো মনে হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তা কোনো কল্পনা নয়। এমনটিই এখন আমাদের বাস্তবতা।”
ডেভড্রয়েড বর্তমানে এমন এক সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে, যার ফলে অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও রোবটগুলো নিজে থেকেই ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারবে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় তারা এমন রোবট তৈরি করতে চায়, যা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে স্বচালিতভাবে যেতে ও নিজের কাজ শেষ করতে পারবে। যেমন, শত্রু সেনার ওপর নজর রাখা ও প্রয়োজনে আক্রমণ করা এবং কাজ শেষে নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসা।
২০২৫ সালে সেনাবাহিনীর জন্য ২ হাজারেও বেশি ইউজিভি তৈরি করেছে ইউক্রেইনের আরেকটি রোবট নির্মাতা কোম্পানি ‘টেনকোর’।
কোম্পানিটির পরিচালক মাকসিম ভাসিলচেঙ্কো বলেছেন, ২০২৬ সালে এ চাহিদা ৪০ হাজারে গিয়ে ঠেকবে, যার মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশই হবে সশস্ত্র রোবট।
“সশস্ত্র ড্রোন বা ইউজিভি এখন অপরিহার্য হয়ে উঠবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।”
তার অনুমান, অদূর ভবিষ্যতে ‘হিউম্যানয়েড’ রোবটও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে। বিষয়টি কেবল আর সিনেমার গল্প হয়ে থাকবে না।