১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অনলাইনে ‘খুব সাধারণ’ হলেও এগুলো আসলে হয়রানি

অনলাইন মাধ্যমে অন্যকে মানসিক অশান্তি দেওয়া, ঘৃণামূলক ভাষার ব্যবহার বা শারীরিকসহ যে কোনো হুমকি- এসবই আসলে হয়রানি।

অনলাইনে ‘খুব সাধারণ’ হলেও এগুলো আসলে হয়রানি
ডিজিটাল দুনিয়ায় কারও নামে ভুয়া পরিচয় তৈরি করা খুব সহজ। ছবি: ফ্রিপিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Aug 2025, 03:53 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:12 PM

ইন্টারনেটে হয়রানির নানা ধরন রয়েছে। কেউ ইমেইল, সামাজিক মাধ্যম, অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মতো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে অন্যকে মানসিক অশান্তি দেয়, কেও বা কেবল ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার করে। কখনো কখনো তা শারীরিক হুমকি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। 

প্রশ্ন হলো এই ডিজিটাল দুনিয়ায় হয়রানি করা এসব ব্যক্তিরা কীভাবে তাদের কাজ চালায়? তাদের নোংরা কৌশলগুলো অনেক সময় অচেনা-অজানা। চলুন একে একে দেখি, কোন কোন ভয়ংকর রূপে সামনে আসে এই সাইবার হয়রানি। শুরু করা যাক সবচেয়ে মারাত্মক দিক থেকে-

সাইবারস্টকিং

সাইবারস্টকিং হচ্ছে ইন্টারনেট বা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে ভয় দেখানো বা হয়রানির উদ্দেশ্যে ক্রমাগত বিরক্ত বা অনুসরণ করা। অনেক সময়ই এর পরবর্তী ধাপে থাকে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো, বদনাম করা, গালি দেওয়া, কারও পরিচয় চুরি করা, হুমকি দেওয়া, গোপন তথ্য প্রকাশ করা বা ব্ল্যাকমেইল করার মতো কাজ। এসব আচরণ ভুক্তভোগীর অনলাইন নিরাপত্তা নষ্ট করে এবং মানসিক চাপ ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বজুড়ে সাইবারস্টকিংয়ের আইন আরও কঠোর করার দাবি উঠছে, কারণ অপরাধীদের বড় একটি অংশই ভয়ঙ্কর অপরাধী এবং মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি বলে প্রতিবেদনে লিখছে প্রযুক্তি সাইট ‘হাও স্টাফ ওয়ার্কস’। 

ইমপারসনেশন

না, এখানে এলভিস প্রেসলি বা বারাক ওবামার কথা বলার ভঙ্গি নকল করার কথা বলা হচ্ছে না। আবার, অনেক তারকার নামেই অসংখ্য ভুয়া সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট রয়েছে। কিন্তু অনলাইন ইমপারসনেশন, বিশেষ করে অসৎ উদ্দেশ্যে করার ফল অনেক বেশি অশুভ এবং ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে।

আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় ভুয়া পরিচয় তৈরি করা অত্যন্ত সহজ। শুধু একটি সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুললেই হলো, ইচ্ছে করলে একসঙ্গে ২০টিও বানানো যায়। কিন্তু ভয়ঙ্কর দিক হলো, এসব ভুয়া প্রোফাইল সাধারণত খারাপ উদ্দেশ্যেই ব্যবহার হয়। কারও নামে ফটোশপ করা নগ্ন ছবি ছড়ানো, মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া, বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা—এসব কাজ শুধু তার সামাজিক সুনামই নষ্ট করে না, মানসিকভাবেও তাকে ভেঙে দেয়।

বিশেষ করে টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মে এমন ভুয়া অ্যাকাউন্টের ছড়াছড়ি। সেলিব্রেটিরা তো প্রতিনিয়ত এর শিকার হচ্ছেন। এই কারণেই টুইটার সেলিব্রেটিদের প্রোফাইলে নীল টিকচিহ্ন দেয়। 

ডক্সিং

ইন্টারনেটে কারও ব্যক্তিগত তথ্য যেমন বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর বা ব্যক্তিগত ডেটা প্রকাশ করে তাকে প্রকাশ্য টার্গেটে পরিণত করাকেই ডক্সিং বলে। এর ফলে ভুক্তভোগী হুমকি, হয়রানি ও মানসিক চাপে পড়ে। 

সমাজতাত্ত্বিক ক্যাথরিন ক্রস বলেছেন, “ডক্সিং মানে হলো কারও ব্যক্তিগত তথ্যকে হাইলাইট করে তার পিঠে এক টার্গেট এঁকে দেওয়া।”

সোয়াটিং

ডক্সিং যেখানে ব্যক্তিগত তথ্যকে অস্ত্র বানায়, সুয়াটিং সেখানে ভয়ের ওপর খেলে। এ ক্ষেত্রে প্রতিশোধপরায়ণ কেউ পুলিশ বা জরুরি সেবাকে মিথ্যা তথ্য দেয়। যেমন, কোনো বাড়িতে সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে বা জিম্মি পরিস্থিতি চলছে। ফলস্বরূপ মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যায় ভারী অস্ত্রসজ্জিত বিশেষ বাহিনী। নির্দোষ মানুষ হঠাৎ করেই পড়ে যায় অসহনীয় ভয়ের মধ্যে। শুধু একটি মিথ্যা ফোন কলই তার জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে, এটাই সোয়াটিংয়ের আসল ভয়াবহতা।

ক্যাটফিশিং

ক্যাটফিশিং হলো প্রতারণার এক ধরনের খেলা, যেখানে অপরাধী আসল কারও মতো সেজে নয়, বরং একেবারে কল্পিত পরিচয় বানায়। ইন্টারনেট থেকে কারও ছবি চুরি করে তৈরি করা সেই ভুয়া চরিত্রের আড়ালে তারা জড়িয়ে ফেলে অনলাইন প্রেমের সম্পর্ক। ধীরে ধীরে ভুক্তভোগী আটকে যায় মিথ্যা নাম, মিথ্যা রূপ আর বানানো গল্পের জালে।

অনেক সময় ক্যাটফিশিং কেবল বিনোদনের জন্য করা হয়, আবার কখনও তা একতরফা ভালোবাসার বিকৃত প্রকাশে রূপ নেয়। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, যখন মিথ্যা ভালোবাসার প্রতিশ্রুতিকে অস্ত্র বানিয়ে কাউকে অবৈধ বা লজ্জাজনক কাজে বাধ্য করা হয়। এর স্পষ্ট লক্ষণ হলো—অ্যাকাউন্টের ওই ব্যক্তিকে সামনাসামনি দেখা যায় না, এমনকি ভিডিও কলেও নয়।

ট্রলিং

ইন্টারনেটে যে কোনো পোস্টের নিচের কমেন্ট সেকশন পড়লে প্রায়ই মনে হয় মন্তব্য না করাই ভালো ছিল। কারণ সেখানেই দেখা মেলে অকারণ আক্রমণাত্মক মন্তব্যের, যা লিখে থাকে তথাকথিত ‘ট্রলার’। ট্রলিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো কাউকে খেপিয়ে দেওয়া, কষ্ট দেওয়া কিংবা অকারণ বিতর্কের আগুন জ্বালানো।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্রলের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো উপেক্ষা। তারা প্রতিক্রিয়াই খোঁজে, আর যদি সেই প্রতিক্রিয়া না পায় তবে তাদের আনন্দ মুহূর্তেই মাটি হয়ে যায়।

ডগপাইলিং

খেলাধুলায় ডগপাইল মানে হলো বিজয়ের আনন্দে সবাই মিলে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু ইন্টারনেটে ডগপাইল মানে একদল মানুষ মিলে একজনকে টার্গেট করে আক্রমণ করা। কেউ কিছু বললেন, যা অনেকের ভালো লাগল না, আর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো মন্তব্যের ঝড়, অপমান আর হুমকি। ফলাফল হচ্ছে ভুক্তভোগীর অনলাইন উপস্থিতি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এটি মূলত এক ধরনের অন্ধ উন্মাদনা, যেখানে একজনের মতামতকে চাপা দিতে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনেকে।

রিভেঞ্জ পর্ন

রিভেঞ্জ পর্ন হলো প্রতিশোধের এক নোংরা রূপ, যেখানে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনলাইনে ছড়ানো হয় বা পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। অনেক নারী এ কারণে চাকরি, মানসিক শান্তি এবং পারিবারিক সম্পর্ক হারিয়েছেন, এমনকি কেউ কেউ নিজের জীবন পর্যন্ত নষ্ট করেছেন। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে। ভয়ঙ্কর দিক হলো, আইন দীর্ঘদিন এই অপরাধের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি, যদিও কিছু দেশে এটিকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

সাইবারবুলিয়িং

অনলাইন হয়রানির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম হলো সাইবারবুলিয়িং। গুজব ছড়ানো, অপমানজনক ছবি শেয়ার করা, মেসেজে হুমকি দেওয়া সব একসঙ্গে মিশে গড়ে ওঠে এই দানব। সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীরাই এর প্রধান শিকার। আগে বুলির ভয় থাকত শুধু স্কুলে, এখন তা ঢুকে পড়েছে তাদের ঘরেও। ফলে দিন-রাত ভুক্তভোগী আতঙ্কে ভোগে। এর প্রভাব ভয়ংকর ডিপ্রেশন, আত্মহত্যা, নেশার আসক্তি, আর শিক্ষাজীবনে ভরাডুবি।

হেইট স্পিচ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক সমাজের মূল স্তম্ভ। কিন্তু হেইট স্পিচ সেই স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ায়। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা যৌনতা ভিত্তিক মানুষকে অপমান করা হয় এবং সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। হেইট স্পিচ বিভাজন, ঘৃণা ও ভয়ের সৃষ্টি করে। আইন প্রায়ই এর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খায়, কারণ অপমানের সীমা মানুষের কাছে ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায় হলো শিক্ষা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি, যাতে মানুষ ভিন্নতাকে ঘৃণা না করে সম্মান করতে শেখে।