Published : 26 Aug 2026, 12:53 PM
পদার্থের চরম রূপান্তরের মুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের আচরণে লুকানো সর্বজনীন গাণিতিক নিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল।
তাদের দাবি, কোয়ান্টাম সিমুলেটরে পরমাণুর শৃঙ্খল সাজিয়ে ‘কনফর্মাল ফিল্ড থিওরি’র দীর্ঘদিনের তাত্ত্বিক পূর্বাভাস প্রথমবারের মতো পরীক্ষাগারে সরাসরি পরিমাপ করেছেন তারা।
গবেষকদের এমন পদক্ষেপ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দুয়ার উন্মোচন করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
পদার্থের দুটি ভিন্ন অবস্থার মধ্যবর্তী ক্রান্তিলগ্নে বা ‘ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে’ পৌঁছালে বিভিন্ন উপাদানের আচরণে এক অদ্ভুত ও অভিন্ন সাদৃশ্য দেখা যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় এ বৈচিত্র্যময় অভিন্নতাকে বলে ইউনিভার্সালিটি বা সর্বজনীনতা।
এ ধরনের বিশেষ সময়ে কোনো পদার্থের আণুবীক্ষণিক স্তরের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব কমে আসে এবং ভিন্ন ভিন্ন পদার্থও একই ধরনের গাণিতিক নিয়ম মেনে চলতে শুরু করে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় কোয়ান্টাম পর্যায়ে পদার্থের এ সর্বজনীন কাঠামোর প্রথম প্রত্যক্ষ পরিমাপ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
‘ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা ক্যালটেকের গবেষকদের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক দলটি বিশেষভাবে তৈরি কোয়ান্টাম সিমুলেটর ব্যবহার করে ‘কনফর্মাল ফিল্ড থিওরি’ নামের গাণিতিক তত্ত্বের পূর্বাভাষ পরীক্ষা করে দেখেছেন।
পদার্থবিজ্ঞানীরা গেল কয়েক দশক ধরে ক্রান্তিলগ্নে পদার্থের আচরণ ব্যাখ্যা করতে এসব তত্ত্বের ওপর নির্ভর করলেও এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পূর্বাভাস এতদিন গবেষণাগারে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকরা প্রধানত ‘আইসিং’ ও ‘ট্রাইক্রিটিক্যাল আইসিং’ নামের দুটি কনফর্মাল ফিল্ড থিওরির ওপর জোর দিয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার সন্ধিক্ষণে একটি কোয়ান্টাম সিস্টেমে কী পরিবর্তন ঘটে সেই প্রক্রিয়ারই আগাম ধারণা দিয়েছে তত্ত্ব দুটি।
পানি ফুটে বাষ্পে পরিণত হওয়ার মতো আমাদের চেনা পরিবর্তনের সঙ্গে এ প্রক্রিয়ার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এ রূপান্তর তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে ঘটে না, বরং এমনটা ঘটে সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে, যার অবস্থান পরম শূন্য বা ‘অ্যাবসোলিউট জিরো’ তাপমাত্রার কাছাকাছি।
এমন সংকটময় মুহূর্তে একটি কোয়ান্টাম সিস্টেম নির্দিষ্ট পরিমাণে শক্তি শোষণ করতে পারে। অনুমোদিত এসব শক্তির স্তরকে একটি মইয়ের ধাপের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
দুটি ধাপের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরস্পরের সঙ্গে ঠিক কীভাবে সম্পর্কিত থাকবে ‘কনফর্মাল ফিল্ড থিওরি’ দিয়ে এর সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
এসব পূর্বাভাস পরীক্ষা করতে গবেষকরা ‘অপটিকাল টুইজার’ নামের নিখুঁত লেজার রশ্মির সাহায্যে এক সারিতে স্ট্রনশিয়াম পরমাণু আটকে রেখে শৃঙ্খল তৈরি করেন।
এরপর অন্যান্য লেজারের মাধ্যমে পরমাণুগুলোকে উচ্চ উত্তেজিত ‘রিডবার্গ’ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে পাশাপাশি থাকা পরমাণুগুলোর মধ্যে প্রবল মিথস্ক্রিয়া শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত পুরো সিস্টেমটিকে কাঙ্ক্ষিত কোয়ান্টাম ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে না পৌঁছানো পর্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করেন গবেষকরা।
পরবর্তী ধাপে এসব শক্তির স্তর পরিমাপ করতে ‘ম্যানি-বডি মডিউলেশন স্পেকট্রোস্কোপি’ নামের এক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে লেজার রশ্মির প্রবাহে মৃদু পরিবর্তন এনে এসব পরমাণুর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। কৌশলটি পানিতে ভেজা আঙুল দিয়ে কাচের গ্লাসের কানায় ঘোরালে যেমন অনুনাদ বা শব্দের তৈরি হয় বিষয়টি তেমনই।
গ্লাসের প্রাকৃতিক ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে আঙুলের গতি মিলে গেলে যেমন স্পষ্ট সাড়া পাওয়া যায় ঠিক একইভাবে এ কোয়ান্টাম পরীক্ষাতেও শক্তিশালী সাড়াদানের মাধ্যমে সিস্টেমের অনুমোদিত শক্তিস্তরের উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সর্বোচ্চ ৩৫টি পরমাণুর শৃঙ্খল নিয়ে পরিচালিত এ পরীক্ষায় দেখা গেছে, শক্তির বিভিন্ন ধরন ‘আইসিং কনফর্মাল ফিল্ড থিওরি’র পূর্বাভাসের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
পরবর্তীতে আরও জটিল ‘ট্রাইক্রিটিক্যাল’ বিন্দুতে পৌছে দেওয়ার পরও তত্ত্বের সঙ্গে মিল রেখে শক্তির সেই সুনির্দিষ্ট অনুপাত খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
পরমাণু শৃঙ্খলের শেষ প্রান্তের পরমাণুগুলোতে পরিবর্তন এনে আরও কিছু নতুন শক্তির স্তর উন্মোচন করতে ও ধরন বদলাতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা, যা তাত্ত্বিক পূর্বাভাসের সত্যতাকে আরও নিশ্চিত করেছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ। এ গবেষণার মধ্য দিয়ে গেল কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা গাণিতিক ধারণাসমূহের দুর্লভ এক প্রয়োগিক সত্যতা মিলল।
এর চেয়েও বড় বিষয়, গবেষকরা এখন এমন সব কোয়ান্টাম সিস্টেমেও এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন, যার আচরণ আগে থেকে হিসাব করে বের করা অসম্ভব ছিল।
গবেষকদের পরবর্তী পরিকল্পনা একমাত্রিক শৃঙ্খল ছাড়িয়ে পরমাণুগুলোকে দ্বিমাত্রিক গ্রিডে সাজিয়ে পরীক্ষা চালানো।
দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রে ‘কনফর্মাল ফিল্ড থিওরি’ সম্পর্কিত জ্ঞান এখনও বেশ সীমিত। ফলে পরাক্রমশালী ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারও যেসব পদার্থের ধরন পূর্বাভাস দিতে হিমশিম খায় কোয়ান্টাম সিমুলেটরের সাহায্যে তা উন্মোচন করা সম্ভব হবে।