Published : 28 Aug 2026, 11:30 AM
মার্কিন এক ফেডারেল মামলায় ১ হাজার ৬৭০ কোটি ডলারের রেকর্ড অর্থ পরিশোধের চুক্তিতে রাজি হয়েছে মেটা, যাকে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনি লড়াইয়ের পর ফেইসবুকের মূল কোম্পানির জন্য বড় এক নতিস্বীকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে, ওই আপসের পরও মেটার বিরুদ্ধে আইনি ঝুঁকি ও কড়া নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না। ক্ষতিপূরণ ও নীতি পরিবর্তনের শর্ত মেনে নেওয়ার পরও স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দায়ের করা একাধিক মামলা বহাল থাকায় নতুন করে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্টটি।
আমেরিকান সংবাদামধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের যৌথ উদ্যোগে বুধবার এ আপসের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা বলেছেন, “এ আপস কোনোভাবেই মামলা বা আইনি পদক্ষেপের সমাপ্তি নয়, বরং ধারণাগতভাবে একটি সূচনা বা সর্বনিম্ন সীমা মাত্র, সর্বোচ্চ সীমা নয়।”
আপসের অংককে মেটার মতো দেড় ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের কোম্পানির জন্য বড় স্বস্তি বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
মামলার প্রাথমিক শুনানিতে মেটার আইনজীবীরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, সম্মিলিত বিচারে ক্ষতির পরিমাণ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা ২০ হাজার কোটি ডলারের সম্ভাব্য দাবির কথা তুলেছিলেন।
আদালতে যুক্তিতর্ক শুরুর কেবল এক সপ্তাহের মাথায় এ ঐতিহাসিক আপস চূড়ান্ত হয়। শুনানিতে মেটার শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে কেবল ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরি সাক্ষ্য দিয়েছেন।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা থাকলেও আপসের ফলে তাকে আর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। তবে আপসের অংক নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমেয়ার। এ চুক্তিকে মেটার জন্য ‘নিশ্চিত জয়’ বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
“মেটার মতো বড় এক কোম্পানির কাছে কয়েক সপ্তাহের রাজস্ব তুলে দেওয়া মোটেও যথেষ্ট শাস্তি নয়। আমরা আদালতে লড়ব, ফ্লোরিডার শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা কোনো আপস করব না।”
ফ্লোরিডা ছাড়াও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যও এ যৌথ সমঝোতায় না গিয়ে মেটার সঙ্গে আলাদাভাবে ১০০ কোটি ডলারের নিজস্ব চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালত অনুমোদিত এ আদেশে ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অভ্যন্তরীণ পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের আদেশ অনুসারে, মেটাকে টিনএজারদের দৈনিক অ্যাপ ব্যবহারের ওপর সময়সীমা নির্ধারণ ও রাতের বেলা ব্যবহার সীমিত করতে ‘নাইটটাইম ব্লক’ ফিচার যোগ করতে হবে।
শিশুদের অ্যাপ ব্যবহারে বাধা দিতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর বয়স যাচাই ব্যবস্থা বা ‘এনহ্যান্সড এজ অ্যাসিওরেন্স’ কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবক ও অভিভাবকদের মনিটরিংয়ের সুবিধার্থে অতিরিক্ত প্যারেন্টাল কন্ট্রোল টুল তৈরি করতে হবে।
মেটা বলেছে, চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ১০ বছরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যকে ১ হাজার ২৭০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। বাকি ৫৩০ কোটি ডলারের অংশটি গুগলের ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এক্ষেত্রে মেটাও শিশুদের জন্য দৈনিক সময়সীমা ও বয়স যাচাইয়ের একই ধরনের কড়া নিয়ম মেনে নিতে রাজি হয়েছে। তবে আদেশের এই বিধান বা আপসের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি গুগল ও টিকটক।
‘আইনি লড়াই জারি থাকবে’
আইনপ্রণেতারা মেটা ও সার্বিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শিল্পের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। ব্যক্তিগত ক্ষতির অভিযোগে দায়ের হওয়া যৌথ মামলা ও মার্কিন বিভিন্ন স্কুল ডিস্ট্রিক্টের সমন্বয়ে গঠিত আরেকটি আলাদা ফেডারেল মামলা এখনও বিচারাধীন।
ওইসব পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা বলেছেন, মেটা ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে তাদের আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে।
‘মাল্টিডিস্ট্রিক্ট লিটিগেশন’ বা এমডিএল অন্তর্ভুক্ত স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোর আইনজীবীরা যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, “হাজার হাজার তরুণ ও সরকারি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এখনও মেটার পাশাপাশি টিকটক, স্ন্যাপ ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
“প্রতিপক্ষদের তৈরি প্ল্যাটফর্মের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে প্রত্যেক বাদী বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ক্ষান্ত হব না।”
বুধবার ‘টিডি কাওয়েন’-এর বিশ্লেষকরা বলেছেন, এ আপসের ফলে মেটার ‘শেয়ার বাজারে ঝুলন্ত আইনি চাপ কিছুটা হালকা হল’। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, “স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ও ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাগুলো এখনও ঝুলে থাকায় মেটার কাঁধে বড় অংকের দায় রয়েই গেছে।”
এ বছরের শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে ব্যক্তিগত ক্ষতির এক বিচারে ইউটিউবের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন ‘সিমনস হ্যানলি কনরে’ আইনি ফার্মের আইনজীবী জেন কনরে।
তিনি এ আপসকে ‘বড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা কেবল মেটা নয়, পুরো শিল্পের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
“এ আপস মেটার পক্ষ থেকে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি বা কার্যক্রম পরিবর্তনের বড় স্বীকৃতি। এ মামলার বিশালত্ব ঠিক এখানেই। মেটা যেহেতু এসব পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ফলে বড় অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিদেরও এই ধারায় ফিরে আসতে হবে।
“মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার না করলেও নিজেদের প্রচুর অর্থ খরচ করে তারা তাদের কার্যক্রম পরিবর্তন করছে। এ ঘটনা প্রমাণ করেছে, শিশুদের সঙ্গে তাদের এমন আচরণ করা উচিত হয়নি, তাদের শোষণের সুযোগ নেওয়া বা অ্যাপে আসক্ত করা একেবারেই অনুচিত ছিল।”
‘টিউলেন ইউনিভার্সিটি’র বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক রব লালকা বলেছেন, আপসের ফলে ‘আমাদের শিশুরা মেটার প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে খারাপ বিভিন্ন দিক থেকে অন্তত কিছুটা সুরক্ষা পাবে’।
“সঠিক কাজটি করার জন্য মেটাকে সাধুবাদ জানানোর কোনো সুযোগ নেই। তাদের টেনে হিঁচড়ে আদালতে তুলতে হয়েছে ও সেখানে তাদের অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না।”
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা বলেছেন, এ চুক্তি সামাজিক মাধ্যম শিল্পের অন্যান্য কোম্পানির জন্য কড়া বার্তা।
“মেটা যত বড় কোম্পানিই হোক না কেন, তারা একা নয়। টিকটকের বিরুদ্ধে চলমান মামলাসহ পুরো সামাজিক মাধ্যম শিল্পের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই জারি থাকবে। আমরা আইনসভার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে এ খাতের প্রতিটি কোম্পানির কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করব।”