Published : 27 Jul 2026, 04:05 PM
শেয়ারবাজারে লেনদেনের প্রথম দিনেই শেয়ার দর প্রায় ৪৬৬ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার নতুন নজির গড়েছে চীনা চিপ নির্মাতা কোম্পানি চাংসিন টেকনোলজি গ্রুপ বা সিএক্সএমটি।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, অভিষেকের এ চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে ব্যাংকিং জায়ান্ট আইসিবিসি’কে পেছনে ফেলে চীনের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে এ প্রযুক্তি জায়ান্ট।
সোমবার সাংহাইয়ের প্রযুক্তিভিত্তিক ‘স্টার মার্কেট’-এ লেনদেনের প্রথম দিনেই সিএক্সএমটি’র শেয়ারের দর প্রায় ৪৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতি শেয়ারের প্রারম্ভিক মূল্য বা আইপিও ৮ দশমিক ৬৬ ইউয়ান নির্ধারণ করে বাজার থেকে ৫৭.৯২ বিলিয়ন ইউয়ান বা ৮৬০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে সিএক্সএমটি। এ বছরে এখন পর্যন্ত এটাই এশিয়ার বৃহত্তম আইপিও।
প্রথম দিনের লেনদেন শেষে সিএক্সএমটি’র প্রতি শেয়ারের দাম গিয়ে ঠেকেছে ৪৯ ইউয়ানে। এতে কোম্পানিটির সার্বিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩.৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান। এ উত্থানের ফলে ‘ইনডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অফ চায়না’ বা আইসিবিসি’কে পেছনে ফেলেছে সিএক্সএমটি, যার বাজারমূল্য ছিল ২.৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।
কোম্পানিটির বিবরণী বা আইপিও নথি অনুসারে, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের বিক্রয় হিসাব বিবেচনা করলে বৈশ্বিক ডিআরএএম (ডি-র্যাম) বাজারে সিএক্সএমটি’র অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে।
স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বড় আকারের নেটওয়ার্ক সার্ভার নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এই ডিআরএএম মেমোরি চিপ।
বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের বড় এ বাজারটি এখনও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, এসকে হাইনিক্স ও মার্কিন কোম্পানি মাইক্রন টেকনোলজির দখলে।
বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও সিএক্সএমটি’র সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনবিসি-র ‘স্কওয়াক বক্স এশিয়া’ অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন বিনিয়োগ কোম্পানি ‘ইয়ি ক্যাপিটাল’-এর প্রধান নির্বাহী থিওডোর শো।
সিএক্সএমটি’র ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেছেন, “কোম্পানিটি যে ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবে সে বিষয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। চিপ খাতে তারা কেবল বিশ্বজায়ান্টদের চ্যালেঞ্জই জানাবে না, বরং একদিন নিজেই এ খাতের গ্লোবাল চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠবে, যা কেবলই সময়ের ব্যাপার।”
অ্যাপলের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের নজর ও অনবদ্য ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই শেয়ারবাজারে এমন অভূতপূর্ব সূচনা পেল চীনা চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটি।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চীনে বিক্রির জন্য তৈরি ডিভাইসের জন্য সিএক্সএমটি’র উৎপাদিত ডিআরএএম বা ডি-র্যাম চিপ পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করেছে অ্যাপল।
বিশ্বজুড়ে কম্পিউটিং সক্ষমতার ক্রমাগত চাহিদা ও শীর্ষস্থানীয় চিপ উৎপাদকদের সক্ষমতা বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির আয়ে।
গেল বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ২৮৩ কোটি ইউয়ান পরিচালন লোকসান গুণতে হয়েছিল কোম্পানিকে, সেখানে এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ৩৫.৪৩ কোটি ইউয়ান পরিচালন মুনাফা পকেটে পুরেছে সিএক্সএমটি।
শেয়ারবাজার অভিষেকের এ নাটকীয় উত্থান নিয়ে বিনিয়োগ কোম্পানি ‘ইয়ি ক্যাপিটাল’-এর প্রধান নির্বাহী থিওডোর শো বলেছেন, “তালিকাভুক্তির প্রথম দিনেই শেয়ারের দর ৪৭০ শতাংশ বেড়ে যাওয়াটা একদম বিরল কোনো ঘটনা নয়। তবে সিএক্সএমটি’র মতো এত বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন নৈপূণ্য দেখানো সত্যিই বেশ নজরকাড়া।”
তিনি আরও বলেছেন, অতীতে সাধারণ ছোট বা মাঝারি মূলধনের বিভিন্ন কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন চিত্র দেখা যেত। তবে সিএক্সএমটি’র ক্ষেত্রে প্রথম দিনে শেয়ারের সীমিত সরবরাহ ও বাজারের পুঞ্জীভূত ইতিবাচক ভাবাবেগই দাম এতটা বাড়িয়ে তোলার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক নোটে আন্তর্জাতিক গবেষণা কোম্পানি ‘মর্নিংস্টার’ বলেছে, এআই প্রযুক্তি এখন চীনের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফলে এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে সিএক্সএমটি।
সিএক্সএমটি’র আইপিও নথি অনুসারে, ২০১৬ সালে চেয়ারম্যান জু ইমিংয়ের হাতে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মৌলিক প্রতিযোগিতা জোরদার করতে চায়। যার বড় অংশই ব্যয় হবে মেমোরি ওয়েফার বিপুল পরিমাণে উৎপাদন ও গবেষণা প্রকল্পগুলোতে।
তবে এ জোয়ারের মধ্যেও কিছুটা সতর্কতার বাণী শুনিয়েছেন থিওডোর শো। তিনি বলেছেন, “আমার মনে হয় আমরা মেমোরি সাইকেলের বাজার দর ও মাতামাতির স্বল্পমেয়াদী চূড়ায় পৌঁছে গেছি।”
এরইমধ্যে চীনের বিভিন্ন স্থানের অনেক বিনিয়োগকারী এ আইপিও চালুর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলতে শুরু করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শেয়ারের দাম হয়ত এখনই সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়নি। তবে পুরো বাজারটি বর্তমানে যোগান ও চাহিদার এক চরম ভারসাম্যহীনতার চূড়ায় অবস্থান করছে বলেও মন্তব্য করেন এই বাজার বিশ্লেষক।