লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল নেপচুনের সব উপগ্রহ, জানাল জেমস ওয়েব
একমাত্র ট্রাইটনই এর মূল গ্রহের ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে ঘুরছে। এটিই প্রমাণ করে, ট্রাইটন নেপচুনের নিজের কোনো উপগ্রহ নয়, বরং অন্য কোথাও তৈরি হয়েছে।
সৌরজগতের দূরতম গ্রহ নেপচুনের উপগ্রহ ও বলয় নিয়ে চালানো নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে শত কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া এক প্রলয়ঙ্করি মহাজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞের কথা।
রয়টার্স লিখেছে, নেপচুনের বুকে ঘটে যাওয়া এ ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পেয়েছে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।
গবেষকদের মতে, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ সম্ভবত ট্রাইটন। বর্তমানে এটি নেপচুনের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ হলেও, একসময় এটি সৌরজগতের আরও দূরের কাইপার বেল্ট অঞ্চলে অবস্থান করত।
তাদের ধারণা, প্রায় সাড়ে ৪৫০ কোটি বছর আগে সৌরজগত গঠনের পর প্রথম প্রায় ১০০ কোটি বছরের কোনো এক সময়ে, যখন বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহগুলো কেবল যার যার কক্ষপথে স্থিত হচ্ছিল, তখন নেপচুনের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে ট্রাইটন তার কক্ষপথে আটকা পড়ে।
আকারে ট্রাইটন প্লুটোর চেয়ে কিছুটা বড়, তবে পৃথিবীর চাঁদের তুলনায় ছোট। প্লুটোও কাইপার বেল্টের একটি বস্তু।
নেপচুনের কক্ষপথে ধরা পড়ার পর ট্রাইটনের মহাকর্ষীয় প্রভাব নেপচুনের মূল উপগ্রহগুলোর কক্ষপথে অস্থিরতা তৈরি করে। এর ফলে সেসব উপগ্রহের বেশিরভাগই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে ওই সংঘর্ষে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকেই জন্ম নিয়েছে গ্রহটির বর্তমান ছোট ছোট উপগ্রহ ও ধূলিময় বলয়।
নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে নেপচুনের ভেতরের তিনটি ছোট উপগ্রহ, যেমন প্রোটিউস, ল্যারিসা ও গ্যালাটিয়া এবং এর ধূলিময় বলয়গুলোর উপাদান বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
গবেষণায় তারা এমন কিছু ‘ক্লে মিনারেল’ বা কাদা-খনিজ পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন, যা সাধারণত সৌরজগতের প্রান্তসীমায় অবস্থিত কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তুর গভীর অভ্যন্তরেই পাওয়ার কথা।
ম্যাগনেশিয়ামওয়ালা এসব খনিজের উপস্থিতি এর আগে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানের মূল গ্রহাণু বেল্টে থাকা বামন গ্রহ ‘সেরেস’ এবং কিছু উল্কাপিন্ডের মধ্যে দেখা গেছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
এ গবেষণার মূল লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, স্যান ডিয়েগো’র গবেষক রাইলি ডেভিস বলেছেন, “এ ধরনের খনিজ তৈরি হতে তরল পানি ও পাথরের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্পর্শের প্রয়োজন হয়।
“নেপচুনের উপগ্রহগুলো আকারে ছোট ও এতটাই শীতল যে, এদের নিজেদের বুকে এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটা অসম্ভব। ফলে এসব খনিজ পদার্থ অবশ্যই অন্য কোথাও থেকে এসেছে। নিশ্চয়ই প্রাচীন কোনো বড় জগতের গভীর অভ্যন্তর থেকে।
“নেপচুনের ভেতরের বিভিন্ন উপগ্রহে এ পদার্থের উপস্থিতিতে প্রমাণ মিলেছে, অতীতে সেখানে প্রলয়ঙ্করি এক ঘটনা ঘটেছিল, যা প্রাচীন সেইসব জগৎকে ধ্বংস করে এদের ভেতরের অংশ উন্মুক্ত করেছে। পরবর্তীতে সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই আজকের এসব ছোট উপগ্রহ ও বলয়গুলোর পুনর্জন্ম হয়েছে।”
গবেষক রাইলি ডেভিস বলেছেন, “বড় আকারের বরফাবৃত উপগ্রহগুলোর ভেতরের অংশ সাধারণত আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়, যা বরফের পুরু আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে থাকে। সেগুলো সম্পর্কে কেবল গাণিতিক মডেল ও ধারণার ওপর নির্ভর করতে হয়।
“তবে নেপচুনের ভেতরের বিভিন্ন উপগ্রহ হয়ত সৌরজগতের একমাত্র জায়গা, যেখানে আমরা প্রাচীন সেইসব জগতের ভেতরের উপাদান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছি। কারণ সেই মহাজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞ পুরো ব্যবস্থাটিকে এক অর্থে দুমড়ে-মুচড়ে ভেতরের অংশ বাইরে বের করে এনেছে।”
সৌরজগতের সমস্ত বড় উপগ্রহের মধ্যে একমাত্র ট্রাইটনই এর মূল গ্রহের ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে ঘুরছে। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, ট্রাইটন নেপচুনের নিজস্ব কোনো উপগ্রহ নয়, বরং অন্য কোথাও তৈরি হওয়ার পর গ্রহটির টানে বন্দি হয়েছে।
‘মহাজাগতিক আগন্তুক’
সৌরজগতের অন্য তিনটি বড় আকারের গ্যাসীয় গ্রহ হচ্ছে বৃহস্পতি, শনি ও ইউরেনাস, যার প্রতিটি গ্রহেরই রয়েছে নিজস্ব উপগ্রহ ব্যবস্থা। সেগুলো নির্দিষ্ট গ্রহের আশপাশেই তৈরি হয়েছে এবং গ্রহগুলো যেদিকে ঘোরে, উপগ্রহগুলোও সেই একই দিকে বৃত্তাকারে আবর্তন করে।
গবেষক ডেভিস বলেছেন, “সৌরজগতের বড় বিভিন্ন গ্রহের মধ্যে একমাত্র নেপচুনেই এমন কোনো সুশৃঙ্খল উপগ্রহ ব্যবস্থা নেই। ফলে অন্যান্য বড় গ্রহগুলোতে উপগ্রহের সুসংগঠিত পরিবার দেখা গেলেও নেপচুন শেষ পর্যন্ত বন্দি হওয়া এক মহাজাগতিক অনুপ্রবেশকারীর দখলে চলে যায়।”
নেপচুনের সব উপগ্রহ ও বলয়ের মোট ভরের ৯৯ শতাংশেরও বেশি জুড়ে রয়েছে একা ট্রাইটন।
সূর্য থেকে পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ দূরে অবস্থিত নেপচুনের ১৬টি আবিষ্কৃত উপগ্রহ রয়েছে। গ্রহটির একেবারে বাইরের দিকের উপগ্রহ ‘নেরেইড’-এর কক্ষপথ পুরো সৌরজগতের যে কোনো উপগ্রহের চেয়ে বেশি ডিম্বাকৃতির।
গবেষকরা বলছেন, অন্য এক গবেষণায় নেরেইডের উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটাই ছিল নেপচুনের মূল বিভিন্ন উপগ্রহের মধ্যে একমাত্র বেঁচে যাওয়া সদস্য, যা কোনোভাবে ট্রাইটনের সেই তাণ্ডব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল।
গঠনের দিক থেকে প্লুটোর মতো ট্রাইটনের উপরিভাগেও রয়েছে নাইট্রোজেন বরফ, মিথেন বরফ ও কার্বন ডাই অক্সাইড। সেইসঙ্গে পাতলা নাইট্রোজেনের বায়ুমণ্ডল।
গবেষকরা একটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেছেন, প্লুটো আকারের অন্য কোনো কাইপার বেল্ট বস্তু হয়ত নেপচুনের খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রহটির তীব্র মহাকর্ষ বলের টানে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছিল।
নেপচুনের এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, সৌরজগতের ইতিহাস বেশ সংঘাতময় ও সহিংস।
ডেভিস বলেছেন, “একটি এলোমেলো ঘটনা কীভাবে পুরো এক গ্রহ ব্যবস্থার কাঠামো আমূল বদলে দিতে পারে এ গবেষণা তারই দৃষ্টান্ত।”
