২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

এনভিডিয়ার আধা ট্রিলিয়ন ডলারের এআই প্রকল্পে মূল বাধা চীন?

এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ও বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি ডলারের ভাগ্যে কী আছে তা এখন হুয়াং ও ওয়াল স্ট্রিটের এই বাজি কতটা সফল হয় তারই ওপর নির্ভর করছে।

এনভিডিয়ার আধা ট্রিলিয়ন ডলারের এআই প্রকল্পে মূল বাধা চীন?
হুয়াংয়ের বাজিটি চীনা এআই খাতকে পেছনে ফেলে দৌড়ে এগিয়ে থাকার কৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 03:47 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:26 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চিপকে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে ৫০ হাজার কোটি ডলারের ফান্ড সংগ্রহের নতুন পরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াং।

তবে চিপের দ্রুত মান কমে যাওয়া ও চীনা প্রযুক্তির সাশ্রয়ী বিকল্পের তোপে ওয়াল স্ট্রিটের বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদামাধ্যম সিএনবিসি।

এআই জোয়ারে প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিপ তৈরি করে বিশ্বজুড়ে এনভিডিয়াকে সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত করেছেন এর প্রতিষ্ঠাতা জেনসেন হুয়াং। এবার সেই চিপ বিক্রির বাজার ও নিজেদের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখতে একদম ভিন্ন ঘরানার এক আর্থিক কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন তিনি।

ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের হুয়াং বিশ্বাস করাতে চাইছেন যে, বিভিন্ন এআই চিপ কেবল ইলেকট্রনিক্স পণ্য নয়, বরং বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট বা টোল রোডের মতো দীর্ঘমেয়াদী ‘আর্থিক সম্পদ’। তার বাজিটি চীনা এআই খাতকে পেছনে ফেলে দৌড়ে এগিয়ে থাকার কৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এ সপ্তাহে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ছয়টি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ‘ব্ল্যাকরক’, ‘ব্ল্যাকস্টোন’, ‘অ্যাপোলো’, ‘কেকেআর’, ‘ব্রুকফিল্ড’ ও ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’-এর সঙ্গে বড় চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে এনভিডিয়া।

এ চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ৫০ হাজার কোটি ডলারের আর্থিক ফান্ড তৈরি করা, যার মাধ্যমে ডেটা সেন্টার ও জিপিইউ ক্লাস্টার নির্মাণে অর্থায়ন করা হবে। যেসব কোম্পানির সরাসরি কোটি কোটি ডলারের চিপ কেনার মতো নগদ অর্থ বা উচ্চ ক্রেডিট রেটিং নেই তাদেরকে এই ফান্ডের মাধ্যমে ঋণ বা সুযোগ দেওয়া হবে।

ছয় শীর্ষ ওয়াল স্ট্রিট কোম্পানির প্রধানদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে হুয়াং যে মহাপরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন তার পেছনের মূল বিষয়টি হচ্ছে, এনভিডিয়ার তৈরি গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহজে মান হারাবে না। এমনটা দ্রুত অবচয় হওয়া সাধারণ ইলেকট্রনিক্স পণ্যের চেয়ে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।

হুয়াং বলেছেন, “এনভিডিয়ার এআই ফ্যাক্টরি প্ল্যাটফর্ম আসলে বিনিয়োগযোগ্য একটি অবকাঠামোগত সম্পদ। কারণ এর থেকে উৎপাদন ও আয় সম্ভব, যা বিনিময়যোগ্য ও প্রায় সব ক্লাউড সেবাদাতা কোম্পানি ব্যবহার করে। এ দিয়ে প্রতিটি এআই মডেল চালানো সম্ভব।”

‘অ্যাসেট-ব্যাকড ফাইন্যান্স’ বা সম্পদভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় কারণ ঋণগ্রহীতা ব্যর্থ হলে ব্যাংক সেই সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং তা বিক্রি করে অর্থ উদ্ধার করতে পারে। এসব ভৌত সম্পদের স্থায়ী সেকেন্ডারি বাজার থাকে এবং এগুলো বহু বছর টেকসই হয়।

তবে এনভিডিয়ার এসব আধুনিক চিপের কার্যসক্ষমতার মেয়াদ ঠিক কতদিন তা এখনও নিশ্চিত নয়। নতুন প্রযুক্তির এসব চিপ সামনের সারির এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়ে কয়েক বছর ব্যবহারের পর সেগুলো কম আয়ের কাজে সরিয়ে নেওয়া হয়।

চিপ ব্যবহারের এ পরিবর্তনটি বাজারে তাদের পুনরায় বিক্রি ও জামানত হিসেবে মান ধরে রাখার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এনভিডিয়ার এ নতুন মডেল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ‘ফেডওয়াচ অ্যাডভাইজার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা বেন ইমনস বলেছেন, “এখানে একমাত্র প্রধান ঝুঁকি অবচয় বা মান কমে যাওয়া। এনভিডিয়ার এসব চিপ প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে মান হারাতে পারে।”

তার ভাষ্য, এনভিডিয়ার এই অর্থায়ন মডেলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি আসতে পারে চীন থেকে। দেশটি দ্রুতগতিতে নিজেদের কম্পিউট সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ও কোনো এক পর্যায়ে কম খরচের চিপ বাজারে ছেড়ে একটি আন্তর্জাতিক দামযুদ্ধ শুরু করে দিতে পারে।

চীনা উৎপাদন বাজারে হার্ডওয়্যারের দামে ধস নামলে শত শত কোটি ডলার ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রাখা এসব সম্পদের দাম ঋণের মেয়াদের চেয়েও দ্রুত কমে যাবে, যা ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

এ ঝুঁকি পুষিয়ে নিতে বিনিয়োগকারীরা জিপিইউ’কে স্থায়ী সম্পদের বদলে উচ্চ-অপচয়ওয়ালা যন্ত্রপাতি হিসেবেই বিবেচনা করবেন বলে অনুমান ইমনসের। ফলে তারা নিজেদের মূলধনের ঝুঁকি অনুসারে ১১ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ হারের রিটার্ন দাবি করতে পারেন।

এ ছাড়া, ‘ব্যাংক অফ আমেরিকা সিকিউরিটিজ’-এর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ঋণের আওতায় এমন সব কোম্পানি চিপ কিনতে আসবে যাদের চিরাচরিত ঋণের বাজারে উচ্চ ক্রেডিট রেটিং নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঋণগ্রহীতা কোম্পানি যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তবে ওয়াল স্ট্রিটের তহবিল ব্যবস্থাপকরা এসব চিপ বাজেয়াপ্ত করে পড়তি কোনো বাজারেই তা পুনরায় বিক্রি করতে বাধ্য হবেন।

তবে চীনের তৈরি এ ঝুঁকি ভবিষ্যতে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। চীনা এআই চিপের শীর্ষ সরবরাহকারী হুয়াওয়ে ২০১৯ সাল থেকেই মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের কালো তালিকায় রয়েছে।

এ বছরের মে মাসে মার্কিন সরকার বলেছে, হুয়াওয়ের ‘অ্যাসেন্ড’ নামের এআই চিপ আমেরিকার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে কোনো আমেরিকান কোম্পানি এই চীনা কোম্পানির চিপ ব্যবহার করতে পারবে না।

ততদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একক প্রাধান্য ধরে রাখছে এনভিডিয়া। বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এআই চিপের বাজারে তাদের বর্তমান পার্টনারশিপ ৭৫ শতাংশেরও বেশি।

আপাতত এনভিডিয়ার আর্থিক হিসাব-নিকাশ জেনসেন হুয়াংয়ের পক্ষেই কাজ করছে। ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় চিপের সংকট তৈরি হওয়ায় এনভিডিয়ার ‘এইচ১০০’ চিপ ভাড়ার হার আশানুরূপ বেড়েছে।

হুয়াং বলেছেন, ২০২৫ সালের শেষদিকে যেখানে প্রতি জিপিইউ-ঘণ্টার ভাড়া ছিল প্রায় ১.৭০ ডলার তা এ বছরে বেড়ে প্রায় ২.৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এনভিডিয়ার দাবি, তাদের ‘কুডা’ সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম চালুর পর থেকেই চিপের কার্যসক্ষমতা প্রতিনিয়ত উন্নত করতে থাকে। ফলে প্রথাগত হিসাবরক্ষণ মডেলে যা ধারণা করা হয় পুরানো চিপগুলো তার চেয়েও বেশি সময় ধরে উৎপাদনশীল থাকে ও রাজস্ব তৈরি করতে পারে।

এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি ডলারের ভাগ্যে কী আছে তা এখন জেনসেন হুয়াং ও ওয়াল স্ট্রিটের এই বাজি কতটা সফল হয় তার ওপরই নির্ভর করছে।

আরও পড়ুন…

ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গে ৫০ হাজার কোটি ডলারের এআই চুক্তি এনভিডিয়ার