Published : 06 May 2026, 02:51 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত শিল্পী হ্যান্স হোলবেইনের আঁকা দুটি স্কেচের পরিচয় নিয়ে কয়েকশ বছরের পুরানো রহস্যের জট খুলেছে বলে দাবি গবেষকদের।
যার একটিকে বহু বছর ধরে রাজা অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় স্ত্রী ও দুর্ভাগা রানী অ্যান বোলিনের প্রতিকৃতি হিসেবে ভাবা হত। অপর স্কেচটিতে থাকা নারীটি কে ছিলেন তা সময়ের গর্ভেই হারিয়ে গিয়েছিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, এখন এআই প্রযুক্তির সহায়তায় গবেষকরা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন।
গবেষকরা বলছেন, নাম না জানা সেই নারীটিই আসলে হতে পারেন ইতিহাসের সেই বিষাদময় রানী অ্যান বোলিন। আর যে ছবিটিকে এতদিন অ্যান বোলিন বলে মনে করা হত তা সম্ভবত তার মা এলিজাবেথ হাওয়ার্ডের প্রতিকৃতি।
এ নতুন আবিষ্কারের ফলে রাজকীয় সংগ্রহে থাকা শিল্পকর্মগুলোর সঠিক পরিচয় ও ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজকীয় সংগ্রহে থাকা এ দুটি কাজ ‘উইন্ডসর স্কেচ’ এবং ‘অজ্ঞাত নারী’ হিসেবে পরিচিত।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্র্যাডফোর্ড’ এর একদল গবেষক এসব ছবি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ১৭০০-এর দশকে স্কেচ দুটির গায়ে ভুল নাম লিখে রাখা হয়েছিল। সেই ভুলের কারণেই দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে এ ভুল ধারণাটি টিকে ছিল।
হোলবেইনের আঁকা ৮০টিরও বেশি ছবির সংগ্রহ নিয়ে গবেষণা করেছেন স্বতন্ত্র গবেষক কারেন ডেভিস। ‘উইন্ডসর স্কেচ’ ছবিটি নিয়ে তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। কারণ, সেখানে ছবির মডেলকে কেবল পাশ থেকে (প্রোফাইল) দেখা যায়।
ছবিতে থাকা নারী ছিলেন উজ্জ্বল গায়ের রঙের এবং লাল চুলের, যেখানে অ্যান বোলিনকে প্রায়ই কালচে বা শ্যামলা বর্ণের নারী হিসেবে বর্ণনা করা হত।
হোলবেইনের এ চিত্রসংগ্রহটি ভুল নামকরণের জন্যও পরিচিত ছিল। যেমন বোলিনের কাজিন হেনরি হাওয়ার্ডের ছবিটিকে আসলে তার বাবার ছবি বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় ডেভিস ধারণা করেছেন, সংগ্রহে থাকা কাজগুলোর মধ্যে ১৫ শতাংশেরও কম ছবির সমসাময়িক দালিলিক প্রমাণ বা সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
এ গবেষণার কাজে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্র্যাডফোর্ড’ এর ‘সেন্টার অফ ভিজুয়াল কম্পিউটি’ এর পরিচালক অধ্যাপক হাসান উগাইলের সঙ্গে যুক্ত হন ডেভিস।
অধ্যাপক উগাইল এক বিশেষ এআই মডেল তৈরি করেছেন, যা পুরানো বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি চিনতে পারে। এর আগে, তিনি রাফায়েলের আঁকা একটি ছবিও এআইয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করেছিলেন, যা কয়েক দশক ধরে শিল্প ইতিহাসবিদদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছিল।
হোলবেইনের চিত্রসংগ্রহ সম্পর্কে অধ্যাপক উগাইল বলেছেন, “আমরা পুরো সংগ্রহটি পর্যবেক্ষণ এবং বড় মেট্রিক্স তৈরির জন্য একটি ছবির সঙ্গে অন্য ছবির তুলনা করেছি, যা এমন সব চিত্রকর্মকে একত্র করেছে যেগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, অজ্ঞাতনামা সেই নারীটি ‘বোলিন-হাওয়ার্ড’ গুচ্ছের মধ্যে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ‘উইন্ডসর স্কেচ’ ছবিটি বোলিনের মা এলিজাবেথ হাওয়ার্ডের বিভিন্ন ছবির কাছাকাছি মেলে।
গবেষক ডেভিস বলেছেন, এ বিশ্লেষণটি এসব ছবি ও হোলবেইনের বাকি চিত্রসংগ্রহ নিয়ে আলোচনার নতুন পথ খুলে দেবে।
“আমার মনে হয় এখন আমরা এমন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছি, যেখানে বিষয়টি কেবল এমন নয় যে, আমরা একটি দাবি করলাম আর তাতেই সব মিটে গেল। তবে আমি আশা করি ছবিগুলো নতুন করে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক পরিসরে বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।”
রয়াল কালেকশন ট্রাস্টের একজন মুখপাত্র বলেছেন, নাম না জানা সেই মডেলের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে।
“রাজকীয় সংগ্রহ সবার জন্য উন্মুক্ত করা এবং গবেষণার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা এ বিষয়ে আরও আলোচনা, বিতর্ক ও নতুন তথ্য আসাকে স্বাগত জানাই।”
টিউডর রাজসভার সদস্যদের নিয়ে আঁকা হ্যান্স হোলবেইনের বিভিন্ন প্রতিকৃতি রেনেসাঁ যুগের অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত।
জার্মানির অগসবার্গে জন্মগ্রহণকারী হোলবেইন ইংল্যান্ডে আসার আগে বাসেলে কাজ করতেন। ইংল্যান্ডে আসার পর তিনি প্রতিকৃতি ও স্কেচ তৈরিতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
তিনি ইউরোপের ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচতে দেশত্যাগ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত রাজা অষ্টম হেনরির রাজসভার সন্দেহ আর কুসংস্কারের আবর্তে এসে পড়েন।
রাজা তার স্ত্রী ক্যাথরিন অফ অ্যারগনকে ডিভোর্স দিয়ে বোলিনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তবে পোপের অস্বীকৃতি শেষ পর্যন্ত ‘ইংলিশ রিফরমেশন’ এর সূত্রপাত ঘটায়।
হোলবেইন টমাস মোরের প্রতিকৃতিও এঁকেছিলেন, যাকে ১৫৩৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং এর পরের বছরই শিরশ্ছেদ করা বোলিনের ছবিও তিনি আঁকেন।