২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিগ্রির কদর কমছে না দক্ষিণ কোরিয়ায়, মিলছে নিশ্চিত চাকরি

এসব প্রোগ্রামে পড়াশোনার পাশাপাশি মিলছে নানা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মাস্টার্স ও পিএইচডি কোর্সের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।

ডিগ্রির কদর কমছে না দক্ষিণ কোরিয়ায়, মিলছে নিশ্চিত চাকরি

সার্বিকভাবে স্যামসাংয়ের প্রতিটি আসনের বিপরীতে ১৩.৪৪ জন ও এসকে হাইনিক্সের কোর্সগুলোতে ৯.১৪ জন শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করছেন। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 20 Sep 2026, 11:46 AM

Updated : 20 Sep 2026, 11:46 AM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত উত্থান ও নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর পর অনেক বিশিষ্ট উদ্যোক্তা প্রচলিত বিভিন্ন গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেও দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ টেক কোম্পানিগুলো এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির ওপরই জোর দিচ্ছে।

এআই খাতে দক্ষ জনবল দ্রুত তৈরির জন্য তারা ইউনিভার্সিটিগুলোর সঙ্গে মিলে বিশেষ কোর্স ডিজাইন করছে ও কিছু ক্ষেত্রে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য চাকরির সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তাও দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদাম্যধম সিএনবিসি।

‘সোগাং ইউনিভার্সিটি’র ‘সিস্টেম সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জং চায়ে-রিন। মেমোরি চিপ নির্মাতা কোম্পানি এসকে হাইনিক্স-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে চার বছর মেয়াদি এ কোর্সে পড়াশোনা শেষ করার পর সরাসরি তার এসকে হাইনিক্সে চাকরির নিশ্চয়তা রয়েছে।

অন্যদিকে, ‘সাংইয়ংকিউভয়ান ইউনিভার্সিটি’র ইন্টেলিজেন্ট সফটওয়্যার বিভাগে পড়াশোনা করছেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কিম তাই-রিন।

‘স্যামসাং ইলেকট্রনিকস’-এর সহযোগিতায় তৈরি এআই সফটওয়্যারের এ পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাচেলর্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রামেও চাকরির সুযোগ অনেকটাই নিশ্চিত। তবে এজন্য তাকে স্যামসাংয়ের আলাদা এক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় কর্পোরেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এসব প্রোগ্রামকে ‘কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্ট’ বলা হয়। এসব ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিকে নতুন কোর্স তৈরিতে সাহায্য করে, আর্থিক সহায়তা ও যোগ্য শিক্ষার্থীদের সরাসরি নিজেদের কোম্পানিতে যোগ হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।

‘কোরিয়া ইউনিভার্সিটি’ ও ‘হানইয়াং ইউনিভার্সিটি’সহ বেশ কয়েকটি দক্ষিণ কোরিয়ান উইনভার্সিটির সঙ্গে অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে এসকে হাইনিক্স।

পাশাপাশি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ‘ইয়োনসি ইউনিভার্সিটি’, ‘কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ ও ‘উলসান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র মতো কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।

শিক্ষার্থী জং ও কিম বলেছেন, এসব প্রোগ্রাম তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি নিশ্চয়তা দিয়েছে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলোর জন্য তা দক্ষ কর্মী তৈরির সুনির্দিষ্ট পাইপলাইন হিসেবে কাজ করছে।

সিউলভিত্তিক জংরো একাডেমির তথ্য অনুসারে, বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্ব থাকা এসব কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্টে আবেদনকারীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

এ তালিকায় ‘হুন্দাই মোটর’ ও ‘এলজি ইউপ্লাস’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর কোম্পানির সঙ্গে যোগ বিভিন্ন কোর্সও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাড়ছে প্রতিযোগিতা, মিলছে চাকরির নিশ্চয়তাও

এআই খাতের এ আকর্ষণে যোগ হতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এসব প্রোগ্রাম লাভজনক। কারণ স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স তাদের কর্মীদের আকর্ষণীয় বেতন প্যাকেজ দেয়ে। তবে এসব আসনে ভর্তির প্রতিযোগিতা তীব্র।

এসকেইউ-এর শিক্ষার্থী কিম বলেছেন, “আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জুনিয়ররা প্রতি বছর আমাদের বিভাগে ভর্তি হচ্ছে এবং আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের গ্রেড দিন দিন আরও ভালো হচ্ছে।

“আমি যদি এখন আবেদন করতাম, তবে মনে হয় না আমার গ্রেড নিয়ে এখানে ভর্তি হতে পারতাম।”

জংরো একাডেমির তথ্য অনুসারে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে স্যামসাংয়ের কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্টগুলোতে আবেদন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ও এসকে হাইনিক্সের সঙ্গে যোগ থাকা বিভাগগুলোতে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।

সার্বিভাবে স্যামসাংয়ের প্রতিটি আসনের বিপরীতে ১৩.৪৪ জন ও এসকে হাইনিক্সের কোর্সগুলোতে ৯.১৪ জন শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।

Image

দক্ষিণ কোরিয়ার এসব কোম্পানি পড়াশোনার কারিকুলামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ছবি: রয়টার্স

সোগাং ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জং বলেছেন, আগের বছরের তুলনায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিতে প্রতিযোগিতার হার আরও বেশি ছিল।

এসব প্রোগ্রামে পড়াশোনার পাশাপাশি মিলছে নানা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। ‘সোগাং ইউনিভার্সিটি’র প্রতিটি ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসকে হাইনিক্সের স্কলারশিপ পান। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মাস্টার্স ও পিএইচডি কোর্সের জন্যও বৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।

শিক্ষার্থী জং বলেছেন, তিনি টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ওয়ানের স্টাডি ইনসেন্টিভ বা পড়াশোনার ভাতা পান। ভালো ফলাফল ও প্রজেক্টের জন্য অতিরিক্ত বৃত্তির সুযোগও রয়েছে।

এসব সুবিধা পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শর্তও রয়েছে। জং বলেছেন, স্কলারশিপ ধরে রাখতে ন্যূনতম ২ দশমিক ৩ ও এসকে হাইনিক্সে চাকরি নিশ্চিত করতে ২ দশমিক ৭ জিপিএ রাখতে হয়।

পাশাপাশি কোর্স মাঝপথে ছেড়ে দিলে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তা ফেরত দিতে হয়।

এসকে হাইনিক্স বলেছে, গ্র্যাজুয়েটদের আর্থিক সহায়তার মেয়াদের সমান সময় কোম্পানিতে চাকরি করতে হবে। তবে তারা অন্যান্য নিয়মিত গ্র্যাজুয়েটদের মতোই সমান পদমর্যাদা ও মূল বেতন পান।

স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। ‘এসকেইউ প্রোগ্রাম’-এ প্রথম তিন বছর নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে টিউশন ফি মওকুফ করা হয়।

কিম বলেছেন, তৃতীয় বর্ষের শেষ দিক থেকে শিক্ষার্থীরা স্যামসাংয়ের এক আলাদা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। এটা ‘ন্যূনতম প্রক্রিয়া’, যেখানে চাকরি চূড়ান্ত হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের ধাপটি অবশ্যই পার করতে হবে। কেবল যারা এ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেন তারাই পাঁচ বছর মেয়াদি কোর্সের বাকি সময় পূর্ণ টিউশন ফি সহায়তা পান।

এসকেইউ-এর কোর্সটি ২০২৪ সালে শুরু হওয়ায় এর প্রথম ব্যাচ এখনও গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেনি।

কর্পোরেট ও শ্রেণিকক্ষ

স্যামসাং এসকেইউ স্কলারদের জন্য স্যামসাংয়ের ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম, দেশের বাইরের গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শন ও আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক কনফারেন্সে অংশ নেওয়ার মতো নানা ধরনের প্রায়োগিক সুযোগ দিয়ে আসছে।

শিক্ষার্থী কিম বলেছেন, শিক্ষার্থীরা স্যামসাংয়ের ওভারসিজ ব্রাঞ্চ ও তাদের সুওয়ান সাইট পরিদর্শন করেছেন ও নিয়মিতভাবে কোম্পানির বিভিন্ন প্রতিনিধির সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। গেল বছর জং এসকে হাইনিক্সের হেডকোয়ার্টার পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে আয়োজিত ফোরামেও অংশ নিয়েছেন।

“আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে প্রথম বর্ষে করা একটি ক্লাস। প্রতি সপ্তাহে এসকে হাইনিক্সের কর্মীরা বা এসকে হাইনিক্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকরা এসে তাদের নিজ দায়িত্বে থাকা প্রযুক্তি বা ব্যবসা ক্ষেত্র নিয়ে লেকচার দিতেন।”

এর মাধ্যমে সরাসরি এসকে হাইনিক্সের এক্সিকিউটিভদের কাছে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করতে পেরেছিলেন জং এবং তাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক ফিডব্যাকও পেয়েছিলেন। এসব কোম্পানি পড়াশোনার কারিকুলামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এসকে হাইনিক্স বলেছে, বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক ইন্টার্নশিপ বা হাতে-কলমে ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্সের সুযোগ না থাকলেও ভবিষ্যতে তা চালুর বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। তারা কারিকুলাম ডিজাইন ও পর্যালোচনার কাজেও আংশিকভাবে অংশ নেয়।

স্যামসাং বলেছে, তারা প্রাসঙ্গিক কোর্স ও কারিকুলামের বিষয়ে বিভিন্ন ইউনভার্সিটিকে ইনপুট বা মতামত দেয়। তবে কর্মীদের কোর্স পরিচালনার পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

শিক্ষার্তী জং বলেছেন, এসকে হাইনিক্সের কর্মীরা সেমিনার ও বিশেষ লেকচারের জন্য ক্যাম্পাসে এলেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কোর্স পরিচালনা করেন না।

দক্ষিণ কোরিয়ার এসব চিপ জায়ান্টদের জন্য এখন আর ইউনিভার্সিটি পাস করার পর নয়, বরং এ ‘কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্ট’গুলোর মাধ্যমেই শীর্ষ প্রতিভা ও দক্ষ কর্মী তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।