Published : 10 Sep 2026, 10:05 AM
গেল ১৮ মাসে র্যামের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বছরের বাকি সময়েও সম্ভবত এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে। ষাটের দশক থেকে শুরু করে এতদিন পর্যন্ত যে প্রযুক্তির দাম ধারাবাহিকভাবে কেবল কমেছেই, সেখানে হঠাৎ এমন রেকর্ড দামবৃদ্ধি নজিরবিহীন।
সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে এখন ‘র্যাম্পোক্যালিপ্স’ বা র্যাম-সংকট নামে ডাকছেন।
একসময় যা ছিল সাশ্রয়ী দামের সাধারণ পণ্য, তা-ই এখন পরিণত হয়েছে বিলাসী বস্তুতে। এ কারণেই আগামী দীর্ঘ সময় ধরে নতুন যে কোনো ফোন, পিসি বা ট্যাবলেট কিনতে গ্রাহককে গুনতে হবে আগের চেয়ে বেশি অর্থ।
র্যাম কী? কীভাবে কাজ করে?
র্যাম বা ‘র্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি’ হচ্ছে যে কোনো কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ডেটা পড়া ও দ্রুত কার্যকর করতে সাহায্য করে। কম্পিউটার সঠিকভাবে সচল রাখতে প্রসেসর বা সিপিইউ-এর নিরবচ্ছিন্ন তথ্যের প্রয়োজন, যা কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে জমা থাকে।
তবে ব্যবহারকারীর হার্ডড্রাইভ যতই দ্রুতগতির হোক না কেন, সিপিইউ-এর কাজের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তত দ্রুত ডেটা সরবরাহ করা এর পক্ষে সম্ভব নয়। এখানেই কাজ করে র্যাম।
প্রসেসর ও হার্ডড্রাইভের মাঝখানে অবস্থান করে মূল স্টোরেজ থেকে ফাইল এনে নিজের কাছে জমা রাখে র্যাম, যাতে সিপিইউ প্রয়োজন হওয়া মাত্রই তা ব্যবহার করতে পারে। কম্পিউটারে র্যামের পরিমাণ যত বেশি হবে তত বেশি ডেটা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
কম্পিউটার ধীরগতির হয়ে গেলে প্রসেসর বদলানোর চেয়ে র্যাম বাড়ানো বরাবরই কার্যকর সমাধান। এ চলমান সংকট শুরুর আগ পর্যন্ত চিত্রটি এমনই ছিল।
র্যাম কোথায় তৈরি হয়?
বিশ্বের মোট র্যামের সিংহভাগ তৈরি করে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন এই তিন কোম্পানি। শত শত কোটি ডলার দামের বড় কারখানায় সূক্ষ্ম প্রকৌশল প্রযুক্তির মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়।
সাধারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসে যে র্যাম ব্যবহৃত হয় তাকে ‘ডাইনামিক র্যাম’ বা ‘ডিআরএএম’ বলে, যা বেশ কয়েক ধরনের হয়। যেমন, কম্পিউটারের জন্য ‘ডিডিআর’ ও মোবাইল ডিভাইসের জন্য ‘লো পাওয়ার ডিডিআর’।
তবে উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা কম্পিউটিংয়ের জন্য ‘এইচবিএম’ নামে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী আরেক ধরনের র্যাম রয়েছে। এইচবিএম প্রযুক্তি সাধারণ ডিডিআর-এর চেয়ে বেশি উন্নত, দ্রুতগতির ও অধিক ধারণক্ষমতার।
এ ধরনের গতি ও কার্যসক্ষমতার কারণে এআই ট্রেনিং ও আধুনিক ডেটা সেন্টারের মতো জটিল কাজে এইচবিএম ব্যবহৃত হয়।
মূল সংকটের নেপথ্যে এইচবিএম বনাম ডিআরএএম
প্রযুক্তিগতভাবে সাধারণ ডিআরএএম ও উচ্চসক্ষমতার এইচবিএম সরাসরি রিপ্লেসযোগ্য নয়। তবে এগুলো তৈরিতে একই ধরনের মূল উপাদান ব্যবহৃত হয়।
উভয়ের ভিত্তি তৈরি হয় সিলিকন ওয়েফার দিয়ে। পার্থক্য কেবল ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে সেগুলোর সংযোজন প্রক্রিয়ায়। সমস্যা হল, এইচবিএম তৈরিতে সাধারণ র্যামের তুলনায় বেশি পরিমাণ কাঁচামাল ও রিসোর্সের প্রয়োজন হয়।
২০২৪ সালে মাইক্রনের প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় মেহরোত্রা বিনিয়োগকারীদের বলেছিলেন, প্রতিটি এইচবিএম ইউনিট তৈরিতে সাধারণ ‘ডিডিআর৫’ র্যামের তুলনায় প্রায় ‘তিনগুণ সিলিকন ওয়েফার’ প্রয়োজন।
এ বিষয়টি এখন বড় সংকটে রূপ নিয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাজারে থাকা প্রতিটি এইচবিএম মডিউলের জন্য যে পরিমাণ কাঁচামাল ও উৎপাদন সক্ষমতা ব্যয় হচ্ছে তা দিয়ে সাধারণ ব্যবহারের জন্য তৈরি করা যেত তিনটি ডিআরএএম মডিউল। এ কারণে ভোক্তা বাজারের জন্য র্যামের তীব্র ঘাটতি ও দামবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
র্যামের দাম আসলে কতটা বেড়েছে?
পিসি তৈরির যন্ত্রাংশের দামের তথ্যভাণ্ডার ‘পিসিপার্টপিকার’-এর গত ১৮ মাসের গ্রাফ দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠতে বাধ্য।
২০২৫ সালের শুরুতে এক জোড়া ১৬ জিবি ‘ডিডিআর৫-৪৮০০’ র্যামের দাম ছিল ১০০ ডলারের নিচে, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারশ ডলারেরও বেশি।
অন্যদিকে, ৩২জিবির হাই-এন্ড ‘ডিডিআর৫-৬০০০’ র্যামের দাম ২৫০ ডলার থেকে বেড়ে এখন ১২০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা দিয়ে আস্ত এক ম্যাকবুক এয়ার কিনে ফেলা সম্ভব!
র্যামের দাম এখন এত বেশি কেন?
এর ছোট উত্তর হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। মাঝারি উত্তর হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কাড়ি কাড়ি অর্থ পেয়ে বিভিন্ন এআই কোম্পানি বিশ্বের প্রায় পুরো র্যামের মজুতই কিনে ফেলছে।
আর বিস্তারিত উত্তর হল, গত দুই দশক ধরে বিশ্বজুড়ে র্যামের বাজার বেশ অনুমানযোগ্য ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইসে বেশি র্যামের প্রয়োজন হলেও প্রতি বছর মোট কত র্যাম মডিউলের দরকার হবে তা বেশ স্থিতিশীলই ছিল।
প্রযুক্তি শিল্প আগে থেকেই জানত মানুষ প্রতি বছর কতগুলো ফোন বা পিসি কিনবে ও আপগ্রেড সাইকেল কেমন হবে। বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাসও আগে থেকে পাওয়া যেত।
যেমন, মাইক্রোসফট যখন বেশি সিস্টেম রিকোয়ারমেন্টসহ নতুন অপারেটিং সিস্টেম বাজারে আনে, পিসি নির্মাতারা আগে থেকেই বাড়তি র্যাম অর্ডারের যথেষ্ট সময় পায়।
ক্লাউড ডেটা সেন্টারের মতো নানা বিষয় যখন প্রথম আলোচনায় আসে তখন বাড়তি চাহিদাও বাজার খুব ভালোভাবেই সামাল দিতে পেরেছিল।
তবে এআই কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক ও বিনিয়োগকারী উভয় শ্রেণিকেই এমনটা বোঝাতে পেরেছে, তাদের এসব পণ্য এখন টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। ওপেনএআইয়ের মতো বিভিন্ন কোম্পানি এখন একরকম যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রয়েছে।
তাদের হাতে শত শত কোটি ডলার তুলে দেওয়া হচ্ছে এবং যতটা সম্ভব কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সেই মোটা অংকের অর্থের জোরে তারা কারখানাগুলো থেকে পুরো এক বছরের হার্ডওয়্যার তৈরির সক্ষমতা আগে থেকেই কিনে রাখছে।
প্রযুক্তি সাইট ‘ডিজিটাইমস’-এর দাবি, বিশ্বের প্রতিটি র্যাম নির্মাতার ২০২৭ সাল পর্যন্ত উৎপাদনের পুরো সক্ষমতা এরইমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে।
বাকি প্রযুক্তি শিল্পের ওপর এআইয়ের এই উন্মাদনা কতটা ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে তা কেবল একটি ডেটা সেন্টারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
অবকাঠামো কোম্পানি ‘ইন্ট্রোল’-এর তথ্য অনুসারে, ইলন মাস্কের এআইকে প্রশিক্ষণের জন্য মেমফিসে তৈরি করা এক্সএআইয়ের ‘কলোসাস’ সাইটে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের ৫ লাখ ৫৫ হাজার এনভিডিয়া জিপিইউ রয়েছে।
অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো এক্সএআই’ও তাদের বিভিন্ন সার্ভারে সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার র্যাম যোগ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি তা-ই হয় তবে কেবল এই একটি কেন্দ্রেই হয়ত ১১ কোটি ২০ লাখ ৫ হাজার গিগাবাইট র্যাম ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসব ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত র্যাম গ্রাহকদের ডিভাইসে ব্যবহার করা যায় না। তবে এগুলো তৈরিতে একই কাঁচামাল ও সম্পদ ব্যবহৃত হয়।
সহজভাবে বললে, এই পরিমাণ র্যাম প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ৬২৫টি ‘আইফোন ১৭’ বা ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫০টি ‘গ্যালাক্সি এস২৬’ ডিভাইসে ব্যবহৃত র্যামের সমান।
মার্চে মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গ প্রতিবেদনে লিখেছে, বর্তমানে ৮৩১টি ডেটা সেন্টার নির্মাণাধীন রয়েছে।
পরিস্থিতি যে সামনে আরও ভয়াবহ হতে যাচ্ছে তার আরেকটি বড় প্রমাণ ২০২৫ সালের অক্টোবরে এএমডি’র সঙ্গে ওপেনএআইয়ের করা চুক্তি। এ দুই কোম্পানি মিলে ৬ গিগাওয়াট সক্ষমতার এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এর প্রথম ১ গিগাওয়াট সাইটটিতে এএমডি’র ‘ইনস্টিংক্ট এমআই৪৫০’ জিপিইউ ব্যবহার করা হবে, যার প্রতিটির সর্বোচ্চ র্যাম ধারণক্ষমতা ৪৩২ জিবি।
প্রযুক্তি খাতের হিসাব অনুসারে, প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার জিপিইউ থেকে ১ গিগাওয়াট সক্ষমতা পাওয়া যায়। সেই হিসেবে কেবল এ একটি প্রজেক্টেই প্রায় ১৯ কোটি ৪৪ লাখ গিগাবাইট র্যাম বা প্রায় ২ কোটি ৪৩ লাখ আইফোন ১৭ ইউনিটের সমান ব্যবহার করা হতে পারে। এমনটা ওই সম্পূর্ণ চুক্তির মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ!