১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

যেভাবে এনভিডিয়া চিপের বিশাল চালান চীনে পাচার ঠেকাল যুক্তরাষ্ট্র

এসব চিপের চাহিদা ব্যাপক। নিজস্ব উপায়ে এআই চিপের বাজার তৈরির চেষ্টা করলেও দেশটি এখনও প্রযুক্তিগতভাবে এনভিডিয়া’র ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

যেভাবে এনভিডিয়া চিপের বিশাল চালান চীনে পাচার ঠেকাল যুক্তরাষ্ট্র
ফেডারেল তদন্তে বেরিয়ে এসেছে অত্যাধুনিক চিপের দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কতটা মরিয়া লড়াই চলছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Jan 2026, 10:44 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:29 PM

চীনে পাচারকালে চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার ১৬ কোটি ডলার মূল্যের উচ্চমানের এআই চিপ জব্দ করেছে মার্কিন গোয়েন্দারা।

সোমবার এ বিষয়ে কিছু নথি প্রকাশ করেছেন টেক্সাসের ফেডারেল প্রসিকিউটররা, যা বড় এক পাচারকারী চক্রের তথ্য সামনে এনেছে। চক্রটি যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিল।

ফেডারেল কর্মকর্তারা এই তদন্তের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন গেটকিপার’। তদন্তটি এনভিডিয়া’র গ্রাফিক প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ চালানের এক গোপন ও অবৈধ নেটওয়ার্ক নিয়ে ছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।

এসব চিপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি এগুলো সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।

মার্কিন সরকার বলেছে, গোপন এক পাচারকারী চক্র যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন অমান্য করে চীনে চিপ পাঠাচ্ছিল। অভিযোগ উঠেছে, এ সিন্ডিকেটটি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে লোক প্রবেশ করানো, ভুয়া বা ছদ্মনামে কোম্পানি তৈরি ও নিউ জার্সিতে গোপন এক গুদাম ব্যবহারের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম চালাত।

তবে মার্কিন সরকারের হয়ে কাজ করা একজন ছদ্মবেশী এজেন্ট সেই গোপন গুদামঘরের কার্যক্রমে ঢুকে পড়েছিলেন।

ফেডারেল তদন্তে বেরিয়ে এসেছে অত্যাধুনিক চিপের দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কতটা মরিয়া লড়াই চলছে। অনেকে বলছেন, এসব চিপই আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

তদন্তকারীরা বলছেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে প্রায় ১৬ কোটি ডলারের ‘এনভিডিয়া এইচ১০০’ ও ‘এইচ২০০ জিপিইউ’ চীনে পাঠানোর চেষ্টা করেছে এ চক্রটি।

চীনে এসব চিপের চাহিদা ব্যাপক। আর এগুলোর সবচেয়ে ভালো যোগান এখনও যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। চীন নিজস্ব উপায়ে এআই চিপের বাজার তৈরির চেষ্টা করলেও দেশটি এখনও প্রযুক্তিগতভাবে এনভিডিয়া’র ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেমিঅ্যানালাইসিস’-এর বিশ্লেষক রে ওয়াং বলেছেন, “আমার ধারণা, চীনের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই মডেলের ৬০ শতাংশেরও বেশি বর্তমানে এনভিডিয়ার হার্ডওয়্যার ব্যবহার করছে। হার্ডওয়্যার থেকে শুরু করে সফটওয়্যার সবক্ষেত্রেই এনভিডিয়ার পদ্ধতিগত শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। এ দুটি বিষয় যখন আপনি একসঙ্গে মেলাবেন তখন বোঝা যায়, এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন।”

তথ্য সংগ্রহের এক পর্যায়ে নিউ জার্সির সেককাসের এক গুদামঘরে একজন ছদ্মবেশী এজেন্ট পাঠায় মার্কিন সরকার। সেখানে সেই এজেন্ট দেখেছেন, এনভিডিয়ার বিভিন্ন জিপিইউ-এর ওপর থেকে আসল নাম মুছে ‘স্যান্ডকায়ান’ নামের এক ভুয়া কোম্পানির লেবেল লাগিয়ে দিচ্ছিল অভিযুক্তরা।

সরকার বলেছে, শিপিং ও রপ্তানির কাগজপত্রে জালিয়াতি করেছে তারা, যেখানে এসব দামি চিপকে সাধারণ ‘অ্যাডাপ্টার’, ‘অ্যাডাপ্টার মডিউল’ ও ‘কন্টাক্টর কন্ট্রোলার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল যাতে কারও সন্দেহ না হয়।

এ বছরের ২৮ মে নিউ জার্সির সেই গুদামঘরে ‘অপারেশন গেটকিপার’ এক নাটকীয় পরিণতির দিকে মোড় নেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে পাচারকারী চক্রের ভাড়া করা তিনটি ট্রাক সেখানে এসে পৌঁছায় যেগুলোর কাজ ছিল পাচার করা এসব চিপ তুলে নিয়ে যাওয়া।

এ ঘটনা ঘটার সময় পাচারকারীদের এক গোপন টেক্সট গ্রুপে একজন সদস্য একটি বার্তা পাঠান। যেখানে বলা হয়েছে, নিউ জার্সির গুদামঘরে মালামাল নিয়ে আসা একজন ট্রাক চালক জানিয়েছেন, সেখানে হঠাৎ পুলিশ হাজির হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা ওই মালামাল বা কার্গো কোথায় পাঠানো হচ্ছে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন।

এসব মেসেজের তথ্য অনুসারে, পুলিশের জেরার মুখে পড়ার পর ষড়যন্ত্রকারীরা চালকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা যেন ‘স্রেফ বলে দেয় যে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না তারা’।

প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুসারে, এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর ষড়যন্ত্রকারীদের একজন ওই গ্রুপের সবাইকে একটি বার্তা পাঠায়, যেখানে বলা হয়েছে, ‘এই চ্যাটিং গ্রুপটি মুছে ফেলো। সবাইকে ডিলিট করে দাও’।

এর কিছুক্ষণ পরেই ফেডারেল এজেন্টরা অতর্কিত অভিযান চালিয়ে সেই উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করেন। ফলে ওই স্থানে থাকা বিভিন্ন মালামাল চীনে পাচার হওয়া থেকে আটকে যায়।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এনভিডিয়া চিপের অনুমোদনহীন রপ্তানি সংক্রান্ত একের পর এক একই ধরনের ঘটনার মধ্যেই এ মামলাটি সামনে এল। গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’-এর ধারণা অনুসারে, কেবল ২০২৪ সালেই ১০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ এআই চিপ চীনে পাচার হয়েছে।

বিশ্লেষক ওয়াং বলেছেন, “আজকের দুনিয়ায় আমার মনে হয় এমন অনেক উপায় রয়েছে, যার মাধ্যমে অবৈধভাবে এনভিডিয়ার চিপ হাতে পাওয়া সম্ভব। আপনি বিশ্বের যে কোনো জায়গায় আপনার ডেটা সেন্টার বসাতে পারেন, আবার ভুয়া কোম্পানি খুলে এনভিডিয়ার চিপ কিনতেও পারেন। এনভিডিয়ার পক্ষে এত সব কিছু ট্র্যাক করা বা যথাযথভাবে যাচাইয়ের কাজটি খুবই কঠিন।”

এ বিষয়ে এনভিডিয়া’র একজন মুখপাত্র বলেছেন, মার্কিন সরকারের রপ্তানি প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর ও ব্যাপক।

“এমনকি পুরানো প্রজন্মের চিপ পণ্যের পুনরায় বিক্রিও মার্কিন সরকারের কঠোর পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার আওতাভুক্ত। বর্তমানে লাখ লাখ নিয়ন্ত্রিত জিপিইউ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি ও স্কুলে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে আমরা সরকার ও আমাদের গ্রাহকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাব, যাতে পুরানো বিভিন্ন চিপের অবৈধ পাচার ঠেকানো যায়।”

তবে যেদিন ফেডারেল প্রসিকিউটররা নিজেদের এই তদন্তের কথা ঘোষণা করেছিলেন ঠিক সেই দিনই সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা পুরো বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তোলার পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন, এখন থেকে এনভিডিয়ার এইচ২০০ জিপিইউ চীনে রপ্তানির অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য, এসব এইচ২০০ চিপই ছিল ‘অপারেশন গেটকিপার’-এ জব্দ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য।

ট্রাম্প বলেছেন, এই রপ্তানির অনুমতি কেবল তখনই দেওয়া হবে যখন প্রতিটি বিক্রির ২৫ শতাংশ অর্থ অংশ মার্কিন সরকার পাবে। তবে এনভিডিয়ার সবচেয়ে আধুনিক এআই চিপ, যেমন ব্ল্যাকওয়েল ও রুবিন জিপিইউ এখনও রপ্তানির জন্য অনুমোদিত নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

‘অপারেশন গেটকিপার’-এর ফলে দুজন ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং এই অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি পাচারের দায় স্বীকার করেছে হিউস্টনের একজন ব্যক্তি ও তার কোম্পানি।

তবে প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা মার্কিন প্রসিকিউটরদের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। কারণ, তারা প্রমাণের চেষ্টা করছিলেন, এসব চিপ পাচার করা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির। আর অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবীরা এই সুযোগটি লুফে নিতেও দেরি করেননি।

পরদিন আদালতে জমা দেওয়া নথিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে এনভিডিয়ার এইচ২০০ জিপিইউ চীনে রপ্তানির অনুমতি দেবে– এমন ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট নিজেই নিরাপত্তার হুমকির দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন।”

কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এনভিডিয়ার সবচেয়ে উন্নতমানের এসব এআই চিপ চীনে পাচারের প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।