১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সাংস্কৃতিক বর্বরতা: এআই প্রশিক্ষণের পর পুরোনো বই ধ্বংস

“কয়েক সেন্ট বা এক ডলারে বই কিনে কোম্পানিগুলো সেগুলো স্ক্যান করছে, এআইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তারপর বইগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। সংস্কৃতিকে গ্রাস করার এর চেয়ে উপযুক্ত প্রতীক আর কী হতে পারে।”

সাংস্কৃতিক বর্বরতা: এআই প্রশিক্ষণের পর পুরোনো বই ধ্বংস
পিটার ডে ভ্রিসের পুরোনো বইয়ের দোকান। দোকানে রাখা এই মুখোস কি এআই কোম্পানিগুলোর দানবীয় চেহারাই প্রকাশ করছে? ছবি: ব্র্যাড এইচকে, ট্রিপঅ্যাডভাইজর কন্ট্রিবিউটর

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 11:28 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

নেদারল্যান্ডসের ঐতিহাসিক শহর হারলেমের এক পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকলে যেন সময় থমকে যায়। দোকানজুড়ে সাজানো ১৬শ ও ১৭শ শতকের মানচিত্র, দুর্লভ অলংকরণ, প্রথম সংস্করণের বই, শত শত বছরের পুরোনো ভ্রমণকাহিনি আর ইতিহাসের দলিল। এই নীরব পরিবেশেই প্রতিদিন গড়ে মাত্র একটি বই বিক্রি করেন দোকানের মালিক পিটার ডে ভ্রিস। 

কিন্তু জুনের মাঝামাঝি সময়ে পাওয়া একটি ইমেইল তার কাছে শুধু অস্বাভাবিকই ছিল না, পরে সেটিই তাকে বিশ্বের প্রযুক্তি খাতের এক বিতর্কিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ পুরোনো ও ব্যবহৃত বই সংগ্রহ করছে। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘ফোর জিরো ফোর মিডিয়া’ প্রথম এই গোপন প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ করে। 

বইগুলো উচ্চগতির যন্ত্রে স্ক্যান করার আগে মলাট কেটে ফেলা হয়, এরপর মূল কপিগুলো গুঁড়ো করে ধ্বংস করা হয়।

ডে ভ্রিস বলেন, ‘টু জিরো সেভেন সেভেন এআই’ নামের একটি কোম্পানির প্রতিনিধি নিজেকে ‘নাটালি’ পরিচয় দিয়ে তাকে প্রায় তিন হাজার বইয়ের একটি তালিকা পাঠান। বার্তায় লেখা ছিল, বিভিন্ন ভাষার বই সংগ্রহের একটি নতুন প্রকল্পের জন্য তারা বড় পরিসরে বই কিনতে চান। এত বড় অর্ডারের কথা শুনে তিনি প্রথমে মেইলের সঙ্গে যুক্ত বইয়ের তালিকাই খোলেননি। তার ধারণা ছিল, এটি স্প্যাম মেইল।

তিনি বলেন, “বিরল বইয়ের ব্যবসায় সাধারণত কেউ একটির বেশি বই কিনতে আসে না। তাই কেউ যদি এসে বলে, ‘আমি আপনার কয়েকশ বই কিনতে চাই’, তাহলে সেটি খুবই অদ্ভুত মনে হয়।”

কিন্তু সেটি স্প্যাম হলে বরং ভালোই হয়ত হতো। দেখা গেল বিষয়টি ভিন্ন এবং অস্বস্তিকর। পরে তিনি জানতে পারেন, এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত বিরল বই বিক্রেতার সঙ্গে একইভাবে যোগাযোগ করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, যত বেশি সম্ভব বই সংগ্রহ করে এআই মডেলের জন্য নতুন তথ্যভান্ডার তৈরি করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বই এমন যন্ত্রে স্ক্যান করা হয়, যেখানে আগে বইয়ের মলাট কেটে আলাদা করা হয়। এরপর প্রতিটি পৃষ্ঠা দ্রুত স্ক্যান করা হয় এবং শেষে মূল বইটি গুঁড়ো করে ফেলে দেওয়া হয়। স্ক্যান করার জন্য বই ধ্বংস করা প্রযুক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে একটি আদালতের রায়ের কারণে এই পদ্ধতি কোম্পানিগুলোর আইনি অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

‘ফোর জিরো ফোর মিডিয়া’ বলছে, ‘আইএসবিএনডিবি’ নামে একটি সেবা একবারে ১০ লাখ পর্যন্ত বই সংগ্রহের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই তালিকায় এমন বিরল বইও ছিল, যেগুলোর কেবল হাতে গোনা কয়েকটি কপি টিকেআছে।

এই খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “যুদ্ধ, অগ্নিকাণ্ড আর শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আসা মানুষের হাতে টিকে থাকা বই এখন গুঁড়ো করে ফেলা হচ্ছে। কেন? যাতে একটি এআই আরও ভালো বিপণন বার্তা লিখতে পারে!”

ইলন মাস্কও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক এক্স পোস্টে লেখেন, “আমি স্পেসএক্সের এআই দলকে বলেছি, গ্রন্থাগারে থাকা যে কোনো বিরল বই কষ্টকর পথে হলেও মলাট না কেটে স্ক্যান করে তারপর সংরক্ষণ করতে।”

প্রতিবেদন বলছে, এই উদ্যোগের বীজ রোপিত হয় দুই বছর আগে। বিশ্বের অন্যতম উন্নত এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’-এর নির্মাতা অ্যানথ্রপিক সাবেক গুগল বুকস কর্মকর্তা টম টারভিকে নিয়োগ দেয়। তার লক্ষ্য ছিল, “পৃথিবীর সব বই” সংগ্রহ করা। কারণ কোম্পানিটির বিশ্বাস ছিল, এআইকে আরও দক্ষ করতে মানুষের লেখা বিপুল পরিমাণ বই প্রয়োজন।

বার্সেলোনার কাছের বাদালোনার পুরোনো বই বিক্রেতা এবং বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের শিক্ষক মার্সাল ফন্ট ই এস্পি মনে করেন, নতুন লেখা পাওয়ার দৌড়ে এআই কোম্পানিগুলোর পিঠ এখন গিয়ে দেয়ালে ঠেকেছে। তার ভাষায়, ইন্টারনেটে এআই দিয়ে তৈরি লেখা এত বেড়েছে যে নতুন, মানুষের তৈরি তথ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “তাদের এখনও মানুষের তৈরি উপাদান প্রয়োজন।”

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিকে যোগ দেওয়ার পর টারভি প্রথমে প্রকাশকদের কাছে বইয়ের লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ দ্রুতই বাদ দেওয়া হয়। এরপর তিনি সরাসরি বই পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ছাপা বই কেনার উদ্যোগ নেন।

আদালতের নথি অনুযায়ী, অ্যানথ্রপিক লাখ লাখ ডলার ব্যয় করে বিপুল পরিমাণ বই কিনেছিল। এরপর কাটার যন্ত্র ব্যবহার করে বইয়ের মলাট থেকে পৃষ্ঠাগুলো আলাদা করা হয়, সেগুলো স্ক্যান করা হয় এবং পরে মূল বইগুলো ফেলে দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ক্যান করার জন্য বই ধ্বংস করা বাধ্যতামূলক ছিল না। তবে বই ধ্বংস করাই অ্যানথ্রপিকের আইনি অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন নির্মাতাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ফেয়ারলি ট্রেইন্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা এড নিউটন-রেক্স। তিনি বলেন, “আপনি যদি এক ডলারে একটি ব্যবহৃত বই কিনে থাকেন, যার পুরো অর্থই বই বিক্রেতার কাছে যায়, তাহলে কি সেই বই দিয়ে একটি বাণিজ্যিক এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়ার অধিকার পাওয়া উচিত? এমন একটি মডেল, যা পরে সেই বইয়ের লেখকের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করবে? আমার মতো অনেকেই মনে করেন, তা হওয়া উচিত নয়।”

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া গোপন রাখার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। কারণ তারা জানে, লাখ লাখ বই ধ্বংসের খবর সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি ‘আইএসবিএনডিবি’ নিজেদের এক ব্লগেও লিখেছে, “কোনো এআই কোম্পানি ২০ লাখ বই ধ্বংস করেছে, এমন শিরোনাম মানুষের সহানুভূতি তৈরি করবে না।”

ফন্ট ই এস্পির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, কোনো অজানা বা দুর্লভ বইয়ের শেষ সহজলভ্য কপিটিও না এভাবে হারিয়ে যায়! 

তার মতে, ডিজিটাল সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সেটি এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে মূল দলিল অক্ষত থাকে। তিনি বলেন, “আমি এআইয়ের বিরুদ্ধে নই। আমি বুঝি, পুরোনো বই আর জ্ঞান নতুন মাধ্যমে স্থানান্তর করা দরকার। কিন্তু সেটি সঠিকভাবে করতে হবে, মূল দলিল ধ্বংস করে নয়।”

নিউটন-রেক্সের মতে, বইটি বিরল না কি প্রচুর ছাপা হয়েছে, সেটি বড় বিষয় নয়। তার ভাষায়, “কয়েক সেন্ট বা এক ডলারে বই কিনে প্রায় লাখ কোটি ডলারের কোম্পানিগুলো সেগুলো স্ক্যান করছে, এআইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তারপর বইগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। সংস্কৃতিকে গ্রাস করার এর চেয়ে উপযুক্ত প্রতীক আর কী হতে পারে।”

প্রযুক্তি কোম্পানি ফ্যাক্টরি এআইয়ের প্রধান নির্বাহী মাতান গ্রিনবার্গও এই প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “এ ধরনের ব্যক্তিগত মানবিক নিদর্শনকে যান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করার মধ্যে মানুষের প্রতি এক ধরনের বিরূপ মনোভাব রয়েছে। ইতিহাস সাধারণত বই ধ্বংসকারীদের ভালোভাবে মনে রাখে না।”

সবশেষে ডে ভ্রিসের কণ্ঠেই যেন পুরো বিতর্কের সারমর্ম উঠে আসে। তিনি বলেন, “এটি এক ধরনের বর্বরতা। অনেকটা গ্রন্থাগার পুড়িয়ে ফেলার মতো।”