১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২৫০০০ বছর আগেও মানুষ মাদক গ্রহণ করত, মিলল প্রমাণ

ইন্দোনেশিয়ায় সুলাওয়েসি দ্বীপটির দুটি আলাদা স্থান থেকে কৃষিকাজ শুরুর আগের যুগের দুজন প্রাচীন মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে।

২৫০০০ বছর আগেও মানুষ মাদক গ্রহণ করত, মিলল প্রমাণ
কঙ্কাল দুটির একটি ৭ হাজার বছর ও অন্যটি ১৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর পুরনো। ছবি: মাপাং প্রজেক্ট

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Sep 2026, 04:40 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন আদিবাসীদের অবশিষ্টাংশে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো মাদক সেবনের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।

সুলাওয়েসি দ্বীপের দুটি দুর্লভ কঙ্কালের দাঁত বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সেখানে তীব্র ক্ষয় ও সাইকোট্রপিক বা মস্তিষ্ক ও মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে এমন উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন।

এর মাধ্যমে ইঙ্গিত মিলেছে, ২৫ হাজার বছর আগে থেকেই ওই আদিম মানুষরা নিয়মিত শক্ত ও ঘষে খাওয়ার মতো সুপারি বা বেটল নাট চুষতেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ‘গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি’র ‘অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ সেন্টার ফর হিউম্যান ইভোলিউশন’-এর অধ্যাপক অ্যাডাম ব্রুমের নেতৃত্বে।

দ্বীপটির দুটি আলাদা স্থান থেকে কৃষিকাজ শুরুর আগের যুগের দুজন প্রাচীন মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে একটি ৭ হাজার বছর ও অন্যটি ১৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর পুরনো।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ। গবেষণায় কীভাবে ওই দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দাঁতে গভীর ও গোলাকার খাঁজ তৈরি হয়েছিল তা উঠে এসেছে।

দাঁতের ক্ষয়ের মাত্রা সম্পর্কে অধ্যাপক ব্রুম বলেছেন, “আমি ভাবছিলাম, এসব মানুষ আসলে কী করছিলেন? কারণ, মনে হচ্ছিল কেউ যেন ড্রিল হেড দিয়ে দাঁতের ভেতরের অংশ ক্ষয় করে ফেলেছে। এর মধ্যে কিছু খাঁজ এতটাই গভীরে চলে গিয়েছিল যে দাঁতের ভেতরের মজ্জা বা পাল্প উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।”

বর্তমানে সুপারি বিশ্বজুড়ে অ্যালকোহল, ক্যাফেইন ও নিকোটিনের পর চতুর্থ সর্বোচ্চ ব্যবহৃত সাইকোট্রপিক পদার্থ হিসেবে পরিচিত, যা বিশ্বের প্রায় দশ শতাংশ মানুষ নিয়মিত সেবন করেন।

সুপারি ‘এরেকা ক্যাটেচু’ পাম গাছের বীজ, যা পান পাতার সঙ্গে মোড়ানো হয় বলে এটাকে ‘বেটল নাট’ও বলে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ব্রুম বলেছেন, “এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে আজ যে মাদক সেবনের অভ্যাস দেখা যায় তা কীভাবে বিকশিত হয়েছিল আমরা তার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছি।”

বর্তমানে পোড়া শামুক-ঝিনুক পিষে তৈরি চুন ও পানের পাতার সঙ্গে সুপারি মিশিয়ে চিবানো হলেও প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগে এ মাদক গ্রহণের ধরনটি কিছুটা ভিন্ন ছিল।

দাঁতের অদ্ভুত ক্ষয়ের কারণ ব্যাখ্যায় অধ্যাপক ব্রুম বলেছেন, “কল্পনা করুন আপনি মুখে একটি পাথর রেখে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এটাকে মুখের এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরাচ্ছেন।

“এমনটা করলে একসময় তা আপনার শক্ত দাঁতের টিস্যুকে ক্ষয় করে এই ধরনের খাঁজ তৈরি করবে।”

আধুনিক যুগে চুন মিশিয়ে সুপারি চিবানোর রীতি চালু হওয়ার আগে প্রাচীন মানুষ এই শক্ত বীজ কেবল মুখে পুরে চুষতেন কি না সেই বিষয় খতিয়ে দেখেছে গবেষক দলটি।

এ অনুমান যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম লালার মধ্যে সুপারি ভিজিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন, তাতে ‘আরেকোলিন’ নামের এক সাইকোট্রপিক উপাদানের পর্যাপ্ত উপস্থিতি রয়েছে, যা মৃদু মাদকতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

পরবর্তীতে ওই প্রাচীন মানুষের দাঁতের টিস্যু বিশ্লেষণ করেও আরেকোলিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন তারা।

এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে অধ্যাপক ব্রুম বলেছেন, “আমি পরীক্ষার অংশ হিসেবে একটি সুপারি চুষে দেখেছি এবং এর স্বাদ তেতো ও কষা, যা মুখের ভেতর অবশ করে দেয় ও আমার মনে হয় তারা এ অনুভূতিটাই পেতে চাইত।

“এটা হয়ত দাঁতের ব্যথা উপশমের এক আদিম ঐতিহ্যগত প্রতিকার ছিল। তবে তারা দীর্ঘ সময় ধরে এমনটা করলে সুপারি চোষার ফলে তাদের দাঁত এতটাই ক্ষয়ে গিয়েছিল যে বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে আরও মারাত্মক দাঁতের ব্যথার কারণ হয়েছিল।

“এসব মানুষ দৃশ্যত এক স্বয়ংক্রিয় চক্রের মধ্যে আটকা পড়েছিল, যেখানে এ সুপারি চোষার অভ্যাসের কারণে তৈরি হওয়া দাঁতের ব্যথা নিরাময়ের জন্যই তারা ক্রমাগত সুপারি চুষে যেত।”

মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশের সংস্পর্শে আসার পর থেকেই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটায় এমন উদ্ভিদ ব্যবহার শুরু করেছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে সাইকোট্রপিক ড্রাগ ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে সাধারণত প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের বার্লি দিয়ে তৈরি গাঁজানো পানীয়ের ইতিহাসই এতদিন সবচেয়ে পুরনো বলে ধারণা করা হত।

স্পেনের ‘ভায়াদোলিদ ইউনিভার্সিটি’র ইউরোপীয় প্রাগৈতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ড. এলিসা গুয়েরা-ডোস বলেছেন, এ গবেষণা ‘মানুষের মাধ্যমে মাদক ব্যবহারে প্রাচীনত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ’।

“গবেষণার এসব ফলাফলে প্রমাণ মেলে, বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে সাইকোট্রপিক উদ্ভিদ ব্যবহারের সবচেয়ে পুরনো প্রমাণই নয়, বরং সুপারি সেবন প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে চলে আসা এক সহস্রাব্দেরও পুরনো ঐতিহ্যও।”