আইপ্যাডের তুলনায় আইফোনের দাম বেশি কেন?
আইপ্যাডকে কেবল বড় আকারের কোনো আইফোন হিসেবে ভাবার সুযোগ নেই, বরং ডিভাইস দুটির কাঠামোগত ও কারিগরি ভিন্নতাই দামের পার্থক্যের মূল কারণ।
আকারের দিক থেকে আইপ্যাড যে কোনো আইফোনের চেয়ে বেশ বড় হওয়ার পরও আইফোনের তুলনায় আইপ্যাডের দাম কম দেখে অনেকেই অবাক হন।
সাধারণত টেলিভিশন, ল্যাপটপ বা স্মার্টওয়াচের ক্ষেত্রে বড় আকারের ডিভাইসের দাম বেশি হয়। তবে অ্যাপলের এই দুই জনপ্রিয় পণ্যের ক্ষেত্রে সমীকরণটি একেবারেই উল্টা।
এ বছর বাজারে থাকা সবচেয়ে সাশ্রয়ী দামের আইফোন ১৭ই-এর দাম ৫৯৯ ডলার, যা সবচেয়ে কম দামি আইপ্যাড, অর্থাৎ একাদশ প্রজন্মের আইপ্যাডের ৪৪৯ ডলারের চেয়ে বেশি।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে কাজ করছে ডিজাইন, হার্ডওয়্যার, বাজার বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ প্রকৌশলের জটিলতার মতো বহুমুখী কারণ।
আইপ্যাডকে কেবল বড় আকারের কোনো আইফোন হিসেবে ভাবার সুযোগ নেই, বরং ডিভাইস দুটির কাঠামোগত ও কারিগরি ভিন্নতাই দামের পার্থক্যের মূল কারণ।
আইফোনের ডিজাইন ও প্রকৌশল জটিল
ছোট আইফোনের সীমিত পরিসরে সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে বিন্যস্ত করা প্রকৌশলীদের জন্য সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ।
মাদারবোর্ড, ব্যাটারি, ‘সিস্টেম-অন-চিপ’, রেডিও অ্যান্টেনা, সেন্সর ও স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যাতে একে অপরের কার্যসক্ষমতায় কোনো ধরনের বাধা তৈরি না করে এবং অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে ডিভাইসটিকে অকার্যকর করে না তোলে, সেজন্য আইফোনে সূক্ষ্ম ও জটিল প্রকৌশল প্রয়োগ করতে হয়।
দীর্ঘক্ষণ চার্জ ধরে রাখার জন্য ব্যাটারির সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনাও এখানে বড় বিষয়।
আইপ্যাডের বড় জায়গা ডিজাইনারদের বেশি স্বাধীনতা দেয়। অতিরিক্ত জায়গার কারণে যন্ত্রাংশের বিন্যাস সহজ এবং তাপ অপসারণ বা কুলিং প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজতর হয়।
আইফোনের মতো অতটা তীব্র গবেষণা ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে আইপ্যাডকে যেতে হয় না, যা এর উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনে। তবে আইফোন এয়ারের মতো মডেলের ক্ষেত্রে নিজস্ব কিছু প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আইফোনে ব্যবহৃত হয় প্রিমিয়াম ও ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যার
আকারের ব্যবধান ছাড়াও দুই ডিভাইসের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আইফোনে এমন অনেক প্রযুক্তিগত উপাদান থাকে, যা বেশিরভাগ আইপ্যাড মডেলে নেই।
এর মধ্যে রয়েছে সেলুলার কলের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল রেডিও ও অ্যান্টেনা। আইপ্যাডের সেলুলার সংস্করণগুলোতে কেবল মোবাইল ডেটা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সেগুলোর মাধ্যমে প্রচলিত ভয়েস কল করা যায় না।
অন্যদিকে, আইপ্যাডের ক্যামেরার তুলনায় আইফোনের ক্যামেরা উন্নত ও শক্তিশালী। সর্বশেষ আইফোনের ক্যামেরা এম৫-এ রয়েছে ৪৮ রমগাপিক্সেলের সেন্সর, অন্যদিকে আইপ্যাড প্রো-এর সেন্সর ১২ মেগাপিক্সেল।
আইপ্যাডের ক্যামেরায় অপটিক্যাল জুমেরও অভাব রয়েছে, কম আলোতে পারফরম্যান্স দুর্বল ও সিনেমাটিক ভিডিও মোডের মতো প্রিমিয়াম ফিচারগুলো থাকে না।
আইপ্যাডের ক্যামেরা নথি স্ক্যান করা বা জরুরি প্রয়োজনে ছবি তোলার উপযোগী করে তৈরি। ডিসপ্লে প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের তফাত।
আইফোন ১৭ সিরিজের প্রতিটি মডেলে ওএলইডি স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়, যা প্রো লাইনআপের বাইরে থাকা সব আইপ্যাডের এলসিডি স্ক্রিনের তুলনায় বেশ ব্যয়বহুল।
এ ছাড়া, প্রতিটি আইফোনে ১২০ হার্টজ পর্যন্ত রিফ্রেশ রেটওয়ালা প্রোমোশন স্ক্রিন থাকে, অথচ প্রো লাইনআপের বাইরের সব আইপ্যাডে ৬০ হার্টজ স্ক্রিন ব্যবহৃত হয়।
সাশ্রয়ী আইপ্যাডগুলোতে অপেক্ষাকৃত পুরনো চিপ বা প্রসেসর ব্যবহৃত হয়। যেমন, ২০২৫ সালে প্রকাশিত একাদশ প্রজন্মের আইপ্যাডে ব্যবহৃত হয়েছিল ২০২২ সালের আইফোন ১৪ প্রো-তে প্রথম দেখা দেওয়া এ১৬ চিপ।
পাশাপাশি, আইপ্যাডে ম্যাগসেফ চার্জিং, এনএফসি ও পানিরোধী বা আইপি ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্স রেটিংয়ের মতো আধুনিক সুবিধা যোগ করে না অ্যাপল।
বাজার প্রতিযোগিতার ভিন্নতা ও দাম নির্ধারণের কৌশল
আইফোন ও আইপ্যাড প্রায় একই ধরনের অপারেটিং সিস্টেম এবং বহুসংখ্যক অভিন্ন অ্যাপ চালানো গেলেও এরা একই প্রতিযোগিতামূলক মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না।
বর্তমান যুগে যোগাযোগের মাধ্যম, বিনোদন কেন্দ্র, ন্যাভিগেশন বা ক্যামেরা নানা ভূমিকার কারণে স্মার্টফোন বেশিরভাগ মানুষের কাছে অপরিহার্য যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
আইপ্যাড মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঠিক সেভাবে অপরিহার্য নয়। বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর কাছে ট্যাবলেট মূলত ভিডিও স্ট্রিমিং, বই পড়া বা নোট নেওয়ার একটি সহায়ক ডিভাইস মাত্র।
শিক্ষার্থী বা সৃজনশীল পেশার মানুষের কাছে এটা কাজের হলেও ফোনের মতো সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। একই কাজের জন্য ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বড় পর্দার ‘ফ্যাবলেট’ ফোন, ক্রোমবুক বা ম্যাকবুক নিও-এর মতো সাশ্রয়ী ল্যাপটপ বেছে নিতে পারেন।
স্বল্প দামে আইপ্যাড বাজারে রাখার পেছনে অ্যাপলের সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক কৌশল কাজ করছে। আইপ্যাডের প্রারম্ভিক মূল্য যদি বেশি হত তবে সাধারণ ক্রেতারা ট্যাবলেট কেনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত।
এর ফলে অ্যাপল ইকোসিস্টেমে নতুন ব্যবহারকারীদের প্রবেশ ঘটত না ও পরবর্তীতে আইক্লাউড বা অ্যাপল মিউজিকের মতো সেবাগুলোতে তাদের সাবস্ক্রিপশন ফি থেকেও কোম্পানিটি বঞ্চিত হত।
শিক্ষা খাতের বাজারে ক্রোমবুকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য অ্যাপল চায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ডিভাইস বেছে নিক, যাতে খুব অল্প বয়স থেকেই শিক্ষার্থীরা এই ইকোসিস্টেমের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, আইফোন অ্যাপলের আয়ের প্রধান উৎস। সে কারণে এই ডিভাইসের উন্নয়নে কোম্পানিটি সবচেয়ে বেশি সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অ্যাপল আইফোনকে একটি প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে ও ক্রেতারা এর জন্য বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত।
গ্রাহকদের ডিভাইস কেনার পদ্ধতির ওপরও এর দামের বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্রেতাই মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে কিস্তিতে বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল মোবাইল প্ল্যানের সঙ্গে মাসিক বিল ক্রেডিটের বিনিময়ে আইফোন কেনন।
এ কারণেও ডিভাইসের আসল দামটি গ্রাহকের কাছে ততটা প্রকট মনে হয় না। এ ছাড়া, মানুষ সাধারণত ফোনের তুলনায় ট্যাবলেট অনেক কম পরিবর্তন করে।
